ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

লেবাননে হামলায় থমকে গেল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা

ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতিতে রাজি

লেবাননে হামলায় থমকে গেল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা
×

ফাইল ছবি

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ০৮:৩১ | আপডেট: ২০ জুন ২০২৬ | ০৯:০৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পূর্বনির্ধারিত আলোচনা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয় তথ্যটি। শুরু থেকেই অনিশ্চয়তা ছিল আলোচনা হওয়ার সম্ভাব্যতা নিয়ে। আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ এক দিন আগে থেকেই দেশটিতে সফরের পরিকল্পনা বাতিল করতে শুরু করেছিল।

এদিকে লেবাননে গতকাল শুক্রবার হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের সংঘাত তীব্র হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতার তোয়াক্কা না করে সেখানে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। গতকাল হিজবুল্লাহর হামলায় ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীরও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা গতকাল দাবি করেছেন, ইসরায়েল ও লেবানন দুই পক্ষই রাজি হয়েছে যুদ্ধবিরতিতে।

আলজাজিরার খবর বলছে, লেবাননে ইসরায়েলের চালানো সর্বশেষ বিমান হামলায় ৪৭ জন নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে ৯৭ জন। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত থেকেই লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে আঘাত হানতে শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ সদস্যদের হামলায় নিহত হয়েছে চার ইসরায়েলি সেনা। 

ইসরায়েলের জাতীয় সুরক্ষামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির সামাজিক মাধ্যমে সেনাদের মৃত্যুর প্রতিক্রিয়ায় লেখেন, পুরো লেবানন জ্বালিয়ে দেওয়া উচিত। 

পুরো বিষয়টি ঘিরে নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সমঝোতা এবং চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা ঘিরেও সংশয় বাড়ছে। এর আগেও ওয়াশিংটনে বৈঠকের পর যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছিল ইসরায়েল ও লেবাননের প্রতিনিধি দল। শেষ পর্যন্ত আর সে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়নি। লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখেছিল ইসরায়েল। দেশটির কট্টর ডানপন্থি মন্ত্রীরা লেবাননে আক্রমণ চালানো থেকে বিরত থাকতে রাজি হননি সেবার। 

হিজবুল্লাহর এক জ্যেষ্ঠ সদস্যের দেওয়া তথ্যানুসারে, ইরান তাদের জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চলতে পারে না। পাশাপাশি তেহরান আরও জানিয়েছে, ইসরায়েলের আক্রমণ থামানোর দায়িত্ব ওয়াশিংটনের। 

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমায়েল বাঘায়ি গতকাল লেবাননে ইসরায়েলি হামলার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ইসরায়েলের এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ‘গুরুতর ও তাৎক্ষণিক পরিণতি’ রয়েছে। বাঘায়ি সমঝোতা স্মারকের বরাত দিয়ে বলেছেন, লেবাননসহ সব যুদ্ধক্ষেত্রেই হামলা থামাতে হবে। ইরান নিজের ও মিত্রদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। 
পরে মার্কিন এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে যা স্থানীয় সময় বিকেল ৪টার দিকে কার্যকর হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা জেনেছি যে আজ (শুক্রবার) পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছে। ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ এখন যুদ্ধবিরতিতে রয়েছে।’

আলোচনা স্থগিত
গত বুধবার সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান। এতে বলা হয়েছে, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও অন্যান্য জটিল বিষয়গুলো নিয়ে আগামী দিনগুলোতে আলাপ হবে। দুইপক্ষ ৬০ দিন সময় পেয়েছে চূড়ান্ত চুক্তিতে আসার জন্য। তারা চাইলে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে বর্তমান সমঝোতার মেয়াদও বৃদ্ধি করতে পারবে।  

সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে গতকাল শুক্রবার থেকেই আলোচনা শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে গত বৃহস্পতিবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানান, তিনি ওই আলোচনায় যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করেছেন। এর আগে একই দিন তেহরানের এক সূত্র জানায়, ইরানের প্রধান আলোচক বাঘের গালিবাফ আলোচনায় অংশ নেবেন না। আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী পক্ষ হিসেবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের উপস্থিত থাকার কথা ছিল। তিনিও বৃহস্পতিবার সফর বাতিল করেন।

পরে সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, আলোচনা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে তারা যে কোনো সময় বৈঠক আয়োজনে প্রস্তুত। ইরানের নেতৃস্থানীয়রা আলোচনা পিছিয়ে যাওয়ার ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি।
 
যুক্তরাষ্ট্রে সমালোচনা
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে ইরানের সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। ওয়াশিংটনে খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির আইনপ্রণেতাদের অনেকে নানা প্রশ্ন তুলছেন। অনেকেই জানতে চাইছেন, সংঘাত অবসানে ট্রাম্প অনেক ছাড় দিয়ে ফেলেছেন কিনা। বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনেও প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। চলতি বছরের নভেম্বরেই হওয়ার কথা রয়েছে নির্বাচনটি।

গত মার্চে ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, এ যুদ্ধের অবসান হবে শুধু ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে। তবে ইরানের সঙ্গে গত বুধবার স্বাক্ষর হওয়া সমঝোতা স্মারকে দেখা গেছে, তেহরান অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পাচ্ছে, তাদের তহবিল ছাড় দেওয়া হচ্ছে এবং তেলও বিক্রি করতে পারবে তারা। পাশাপাশি ইরান নিজেদের অর্থনীতি ও দেশ পুনর্গঠনে ৩০০ বিলিয়ন ডলার পাবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই চুক্তিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের অনেকে।

তাদের জবাব দিতেই হয়তো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইরান মরিয়া ছিল চুক্তির জন্য। 
চূড়ান্ত চুক্তি আলোচনার সময়সীমার দিকে নির্দেশ করে তিনি আরও লিখেছেন, ‘আমরা ৬০ দিন দেখব। তারা কোনো অর্থ পাবে না, দশ পয়সাও না।’

সমঝোতার কোথাও যুক্তরাষ্ট্র অর্থ দেবে এমনটা বলা হয়নি। বরং উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। ট্রাম্প এর আগে সাংবাদিকদের একই কথা বলেছিলেন। সেবারও তিনি অর্থ দেবেন না বলে জানিয়েছিলেন।

ট্রাম্প গতকাল শুক্রবার আরও দাবি করেন, এই যুদ্ধে ইরান শেষ হয়ে গেছে। ইরানের নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও গতানুগতিক সামরিক সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের মুখে সেভাবে দাঁড়াতে পারেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।  

ডেমোক্র‍্যাটদেরও এক হাত নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, ডেমোক্র‍্যাটরা এসবের পরই বলছে ইরান চার মাস আগের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। এগুলো বলেও পার পেয়ে যাওয়ার কথা চিন্তা করা যায়? কিছু মানুষ কতটা নির্বোধ হতে পারে? 
এদিকে, গত বৃহস্পতিবার অ্যাক্সিওস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর ‘সম্ভবত নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’।
 

আরও পড়ুন

×