যুক্তরাষ্ট্রের চাপে সংস্কারের পথে হাঁটছে কিউবা
ছবি: রয়টার্স
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ০৩:০৭
যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা চাপের মুখে পড়ে নিজেদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সংস্কার করছে কিউবা। গত বৃহস্পতিবার দেশটির আইনপ্রণেতারা প্রায় ২০০ মুক্ত বাণিজ্যসংক্রান্ত সংস্কার সামনে নিয়ে এসেছেন। তাদের প্রত্যাশা, এই সংস্কারগুলো চলমান সংকট কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবে।
আইনসভায় এক বক্তব্যে কিউবার প্রধানমন্ত্রী ম্যানুয়েল মারেরো ১৭৬টি পদক্ষেপের বিষয়ে জানান। মূলত ওই সংস্কার পদক্ষেপগুলোর মধ্য দিয়ে অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ অনেকটাই সীমিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং থেকে শুরু করে পর্যটন, কৃষি খাতে বিনিয়োগ আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
নতুন সংস্কারের অধীনে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আর রাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে ব্যবসায় যেতে হবে না, বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও ব্যবসার অনুমতি দেওয়া হবে এবং কিউবান ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা রাষ্ট্রমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে শেয়ার কিনতে পারবেন।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক চাপের মুখে পড়েছে কিউবা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে প্রকাশ্যেই কিউবা দখলে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে মাত্র ৯০ মাইল দূরে অবস্থিত রাষ্ট্রটি।
লন্ডনভিত্তিক কিউবান অর্থনীতিবিদ ড্যানিয়েল টোরালবাস নতুন পদক্ষেপগুলোকে ১৯৫৯ সালের বিপ্লবের পর হাতে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হিসেবে দেখছেন। দেশটির আইনসভায় গত বৃহস্পতিবার সর্বসম্মতিক্রমেই পদক্ষেপগুলো পাস হয়। অধিবেশন শেষ হয় দেশটির প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল ডিয়াজ-ক্যানেলের কণ্ঠে ‘সমাজতন্ত্র অথবা মৃত্যু’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে।
কিউবান প্রধানমন্ত্রী মারেরো পরিবর্তনগুলো প্রয়োগ করার কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা জানাননি। তবে ডিয়াজ-ক্যানেল গত বুধবার বলেন, অর্থনীতির পতন ঠেকাতে ‘জরুরি পরিবর্তন’ প্রয়োজন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি বছরের জানুয়ারিতে কিউবার ওপর তেল-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা দেন। সে সময় ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকেও অপহরণ করে যুক্তরাষ্ট্র। মাদুরো কিউবার মিত্র বলে পরিচিত ছিলেন। এর পর থেকেই রাষ্ট্রটির অর্থনীতির ওপর চাপ পড়তে থাকে এবং তা পতনের দ্বারপ্রান্তে চলে যায়। এতে করে কমিউনিস্ট পার্টিও এমন ছাড়ের দিকে যেতে বাধ্য হয়েছে, যা তারা আগে হয়তো কল্পনাও করত না।
কিউবা বহু আগে থেকে নিজেদের অর্থনীতির প্রতিকূল অবস্থার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে দোষ দিয়ে আসছিল। তবে দেশটির প্রেসিডেন্ট ডিয়াজ-ক্যানেলের মতে, এমন কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে, যা বাইরে থেকে আসেনি বা অবরোধের কারণেও তৈরি হয়নি।
ইউনিভার্সিটি অব মায়ামির কিউবান স্টাডিজের চেয়ারম্যান মাইকেল বুস্টামান্টে বলেন, ‘এর আগে এভাবে দেয়ালে তাদের পিঠ ঠেকেনি। তারা নিজেদের অর্থনৈতিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনার জন্য অস্বস্তিকর অবস্থানে রয়েছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র তাদের চাপের মুখে ফেলেছে।’
তবে কিউবার প্রেসিডেন্ট ডিয়াজ-ক্যানাল দাবি করেন, এটি তারা যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে নয়, বরং সমাজতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে করছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের বিশ্লেষণ বলছে, বছরের শুরু থেকে কিউবায় রাশিয়া থেকে পাঠানো শুধু একটি তেলের ট্যাংকার পৌঁছেছে।
বর্তমানে কিউবায় অনেক সময় টানা ৩০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। খাবার, জ্বালানি, সুপেয় পানি, ওষুধ– সবকিছুরই তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনার ভলকার তুর্ক সতর্ক করেছেন, কিউবায় শিশুরা চিকিৎসা রসদ ও ওষুধের অভাবে প্রাণ হারাচ্ছে।
কিউবার ৬৩ বছর বয়সী ব্যাংকার ভিক্টর হিরেজুয়েলো গত বৃহস্পতিবার বলেন, ‘সংস্কার ছাড়া বিপ্লব টিকবে না।’ তবে এসব সংস্কারেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন গলবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে প্রশ্ন করা হয়, ইরান যুদ্ধ অবসানের সমঝোতায় স্বাক্ষরের পর এখন ট্রাম্প কিউবা নিয়ে ভাববেন কি না। উত্তরে ভ্যান্স বলেন, ওয়াশিংটন চায় কিউবার জনসাধারণ ‘সুখী ও সফল’ হোক। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আসলে এই মুহূর্তে কিউবার সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছি যে তারা কীভাবে সে পরিবর্তনগুলো নিয়ে আসতে পারে।’
কিউবার নেতৃস্থানীয়দের ওপরও যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক সময়ে চাপ বাড়িয়েছে। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করেছে। তাঁর বিরুদ্ধে ১৯৯৬ সালে মানবাধিকার গোষ্ঠীর দুটি বেসামরিক বিমান গুলি করে ভূপাতিত করার অভিযোগ আনা হয়েছিল। খবর রয়টার্স ও আলজাজিরার।
- বিষয় :
- কিউবা
- যুক্তরাষ্ট্র
