ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

দুই কিংবদন্তির কণ্ঠে চিঠির জীবনগাথা

দুই কিংবদন্তির কণ্ঠে চিঠির জীবনগাথা
×

‘লাভ লেটার্স’ নাটকের একটি দৃশ্য। ছবি: দ্রোহী তারা

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ০২:০২

মঞ্চে পাশাপাশি বসে আছেন বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র—রামেন্দু মজুমদার ও ফেরদৌসী মজুমদার। নেই নাটকীয় দৃশ্যান্তর কিংবা বাহুল্যপূর্ণ অভিনয়ভঙ্গি। অথচ তাদের কণ্ঠ, দৃষ্টি আর শব্দের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে দুটো জীবনের গল্প। চিঠির পর চিঠি, স্মৃতির পর স্মৃতি, অনুভূতির পর অনুভূতি পেরিয়ে দর্শক প্রবেশ করেন দুই মানুষের দীর্ঘ জীবনযাপনের অন্তরঙ্গ অধ্যায়ে।

গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় বাংলাদেশ মহিলা সমিতির নীলিমা ইব্রাহিম মিলনায়তনে ‘থিয়েটার’-এর প্রযোজনায় মঞ্চস্থ হয় ‘লাভ লেটার্স’। নাটকটির মূল শক্তি যেমন এর নির্মাণশৈলী, তেমনি এর প্রাণ হয়ে উঠেছেন দুই বরেণ্য অভিনয়শিল্পী।

অনন্ত শাহেদ চৌধুরী চরিত্রে রামেন্দু মজুমদার ছিলেন সংযত অথচ গভীর। জীবনের নানা পর্যায়ে চরিত্রটির মানসিক পরিবর্তন, দায়িত্ববোধ, দ্বিধা ও নীরব ভালোবাসাকে তিনি প্রকাশ করেছেন কেবল কণ্ঠের ওঠানামা এবং অনুভবের সূক্ষ্মতায়। অন্যদিকে মাইশা ইসলাম চরিত্রে ফেরদৌসী মজুমদার ছিলেন স্বতঃস্ফূর্ত, আবেগময় এবং প্রাণবন্ত। শৈশবের উচ্ছ্বাস থেকে শিল্পীজীবন ও জীবনের ক্লান্ত উপলব্ধি—প্রতিটি স্তরে তাঁর কণ্ঠস্বর যেন চরিত্রটির বয়স ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে বদলে গেছে স্বাভাবিক ছন্দে।

মঞ্চে তাদের অভিনয় ছিল না প্রচলিত অর্থে অভিনয়। দুটো মানুষ যেন নিজেদের জীবনের বহুদিনের জমে থাকা স্মৃতিগুলো চিঠি হিসেবে দর্শকের সামনে খুলে পড়ছেন। ফলে নাটকটি একসময় মঞ্চের গণ্ডি পেরিয়ে দর্শকের ব্যক্তিগত স্মৃতি ও অনুভূতির সঙ্গে মিশে যায়।

মূলত দুই বিপরীত মেরুর চিন্তার মানুষের শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত আদান-প্রদান করা চিঠিগুলো ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে নাটকের কাহিনি। সময়ের প্রবাহে তাদের সম্পর্কের রূপ বদলেছে, জীবন বদলেছে, কিন্তু চিঠিগুলোর মধ্যে জমা থাকা অনুভূতিগুলো হারিয়ে যায়নি কখনো। সেই অনুভূতির ধারাবাহিকতাই নাটকের মূল বয়ান।

চিঠির ফাঁকে ফাঁকে বেজে ওঠা ঘণ্টাধ্বনি যেন সময়ের অদৃশ্য পদচারণাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। দর্শক তখন মাইশা ও অনন্তের জীবনের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অতিক্রম করেন—কলেজজীবন, বিশ্ববিদ্যালয়জীবন, কর্মজীবন, সুখ-দুঃখে মিশ্রিত মধ্যবয়সের বাস্তবতা এবং সবশেষে আত্ম-অনুধাবনের গভীর স্তর।

তবে ‘লাভ লেটার্স’-এর গল্প কেবল মঞ্চের গল্প নয়। এর পেছনেও রয়েছে এক আবেগঘন ইতিহাস।

২০১৭ সালের ১৫ অক্টোবর অধ্যাপক আবদুস সেলিম প্রথম নাটকটির বাংলা রূপান্তর পাঠ করেন প্রয়াত অভিনেতা আলী যাকেরের বাসভবনে। সে সময় ক্যানসার রোগের সঙ্গে লড়ছিলেন এই কিংবদন্তি শিল্পী। নাট্যকর্মীদের মনে হয়েছিল এমন একটি প্রযোজনা করা যায় কি না, যেখানে কম শারীরিক পরিশ্রমে আবারও মঞ্চে দেখা যাবে আলী যাকেরকে, আর তাঁর বিপরীতে থাকবেন দীর্ঘদিনের সহশিল্পী ফেরদৌসী মজুমদার।

সেই ভাবনা থেকেই নির্বাচন করা হয় মার্কিন নাট্যকার এ. আর. গার্নির বিখ্যাত এই নাটকটি। আবদুস সেলিমের রূপান্তরও দ্রুত সম্পন্ন হয়। কিন্তু অসুস্থতার কারণে বারবার থমকে যায় মহড়ার আয়োজন। একসময় আলী যাকের নিজেই রামেন্দু মজুমদারকে বলেছিলেন, ‘আপনারা শুরু করুন, I will join.’ 

কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান আর হয়নি। ২০২০ সালের ২৭ নভেম্বর বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গন হারায় তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেতাকে। ফলে ‘লাভ লেটার্স’ পরিণত হয় আলী যাকেরের স্মৃতির প্রতি নিবেদিত এক আবেগঘন শ্রদ্ধাঞ্জলিতে।

বিশ্বের বহু দেশে ও বহু ভাষায় রূপান্তরিত হয়ে মঞ্চস্থ হওয়া নাটকের বাংলাদেশি রূপান্তরটি নির্মিত হয়েছে অত্যন্ত সরল পাঠাভিনয়ের কাঠামোয়। বাহ্যিক আড়ম্বরের পরিবর্তে এখানে গুরুত্ব পেয়েছে শব্দ, স্মৃতি ও অনুভূতি।

ত্রপা মজুমদারের নির্দেশনায় নাটকটি পেয়েছে সংযমী অথচ হৃদয়স্পর্শী একটি ভাষা। মঞ্চ ও আলোক পরিকল্পনায় পলাশ হেন্ড্রি সেন, পোশাক পরিকল্পনায় গুলশান আরা মুন্নী এবং মঞ্চ ও সামগ্রী ব্যবস্থাপনায় সামিয়া মহসীনের কাজও এই আবহ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

অনন্ত চরিত্রে রামেন্দু মজুমদারের সহকারী হিসেবে ছিলেন রবিন বসাক এবং মাইশা চরিত্রে ফেরদৌসী মজুমদারের সহকারী ছিলেন নাজমুন নাহার নাজু।

উল্লেখ্য, ‘লাভ লেটার্স’ নাটকটি ২০২৩ সালের ৫ মে প্রথম মঞ্চস্থ হয় এই একই মিলনায়তনে।

আরও পড়ুন

×