‘প্রতিবেশীকে ফাঁসাতে’ হত্যা করা হয় শিশু জায়ানকে
জায়ান
পটিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ০২:৫২
চট্টগ্রামের পটিয়ায় পাঁচ বছরের শিশু জায়ানকে অপহরণের পর হত্যার ঘটনায় একই পরিবারের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, অপহরণের প্রায় দেড় ঘণ্টার মধ্যেই শিশুটিকে হত্যা করা হয়। তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রাথমিক ধারণা, প্রতিবেশী একটি পরিবারকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন–পটিয়া পৌরসভার দক্ষিণ গোবিন্দরখীল পূর্বপাড়া এলাকার বাসিন্দা সাইফুদ্দিন (৩৯), তাঁর স্ত্রী শাহানুর আক্তার (৩৫) এবং মেয়ে সাদিয়া সুলতানা নিহা (১৯)। নিহত শিশুর বাবা শাহজাহান পটিয়া থানায় হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় গ্রেপ্তার তিনজন ছাড়াও অজ্ঞাতনামা ২-৩ জনকে আসামি করা হয়েছে।
জানা গেছে, গত মঙ্গলবার দুপুরে বাড়ির সামনে খেলছিল জায়ান। সে স্থানীয় গ্যারেজ মালিক শাহজাহানের একমাত্র ছেলে। কিছুক্ষণ পর তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রথমে পরিবারের ধারণা ছিল, হয়তো আশপাশে কোথাও চলে গেছে কিংবা কোনো দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। শিশুটিকে খুঁজতে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় লোকজন মাঠে নামেন। বিকেলের দিকে পরিস্থিতি ভিন্ন মোড় নেয়। পরিবারের ঘরের বিছানায় পাওয়া যায় একটি হাতে লেখা চিরকুট। সেখানে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। একই সঙ্গে পরিবারের একটি মোবাইল ফোন আনলক অবস্থায় নির্দিষ্ট স্থানে রেখে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
চিরকুটে হুমকি দিয়ে লেখা হয়, পুলিশকে জানালে শিশুটিকে আর জীবিত পাওয়া যাবে না। এতে পরিবারের উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। স্বজনরা জানান, সন্তানের জীবন বাঁচাতে তারা মুক্তিপণের টাকা দিতেও প্রস্তুত ছিলেন।
পুলিশ সুপার মাসুদ আলম জানান, চিরকুটে যে ধরনের প্যাড ব্যবহার করা হয়েছিল, তল্লাশি চালিয়ে একই ধরনের প্যাড ও লেখার নমুনা নিহার বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়। পরে যাচাই করে চিরকুটের লেখার সঙ্গে তাঁর লেখার মিল পাওয়া যায়।
পুলিশের ভাষ্য, নিহা প্রথমে দাবি করেছিলেন, প্রতিবেশী এক ব্যক্তির নির্দেশে তিনি চিরকুট লিখেছেন। পরে ওই ব্যক্তিকে আটক করে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তাঁর সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একপর্যায়ে নিহা চিরকুট লেখা এবং শিশুটিকে হত্যার কথা স্বীকার করেন। মঙ্গলবার দুপুরে শিশুটিকে কৌশলে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান নিহা। সেখানে তাকে হত্যা করে মরদেহ বস্তায় ভরে বাড়ির পেছনের ময়লার স্তূপে লুকিয়ে রাখা হয়।
গত বুধবার রাতে নিহাকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি হত্যার বিষয়টি স্বীকার করেন বলে জানায় পুলিশ। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার ভোরে বাড়ির পেছনের আবর্জনার স্তূপের নিচ থেকে বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিহান ও ওয়াসিফা নামে আরও দুজনকে আটক করা হয়েছিল। তবে তাদের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়ায় পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পরিবারের সঙ্গে প্রতিবেশী অপর একটি পরিবারের জমিসংক্রান্ত বিরোধ ছিল। সেই বিরোধের জেরে ওই পরিবারকে ফাঁসানোর পরিকল্পনা থেকে হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে।
পটিয়া থানার ওসি জিয়াউল হক বলেন, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, প্রতিবেশী একজনকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। কারণ, জিজ্ঞাসাবাদের সময় নিহা বারবার ওই ব্যক্তির নাম বলেছেন। পরে তদন্তে তাঁর সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে হত্যার পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র ও স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার পর অভিযুক্ত পরিবারের সদস্যরাও খোঁজাখুঁজিতে অংশ নিয়েছিলেন। তারা বিভিন্ন স্থানে গিয়ে জায়ানকে খুঁজেছেন, পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিয়েছেন এবং অনুসন্ধান কার্যক্রমে সক্রিয় ছিলেন।
ঘটনার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল হয়। নিহতের স্বজন ও এলাকাবাসী দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলার বিচার এবং জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
- বিষয় :
- শিশু হত্যা
- চট্টগ্রাম
- পটিয়া
