ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

৩১৬ একর জমি প্রভাবশালীদের দখলে

৩১৬ একর জমি প্রভাবশালীদের দখলে
×

পীরগঞ্জের শাগুনি মৌজায় শালবনের জমিতে গড়ে তোলা হযরত আলীর খামার- সমকাল

মোকাদ্দেস হায়াত মিলন, পীরগঞ্জ (ঠাকুরগাঁও)

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ০৭:৫৪ | আপডেট: ২০ জুন ২০২৬ | ০৭:৫৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

বনভূমি রক্ষা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার হলেও ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ বিট এলাকায় বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সামাজিক বন বিভাগের আওতাধীন এক হাজার ৪৪১ দশমিক ৭৮ একর বনভূমির মধ্যে ৩১৫ দশমিক ৯৫ একরই চলে গেছে অবৈধ দখলে। কোথাও ধান ক্ষেত, কোথাও আমবাগান, কোথাও আবার গড়ে উঠেছে দোকান ও গবাদি পশুর খামার। দীর্ঘদিন ধরে দখল চললেও বনভূমি উদ্ধারে 
দৃশ্যমান উদ্যোগ ছিল না। সম্প্রতি প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়ে চিঠি দিয়েছে বন বিভাগ। এরপর বিষয়টি উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায়ও আলোচনা হয়েছে।

তিন দশকে দখল বনভূমি
বন বিভাগের নথি অনুযায়ী, ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ ও রানীশংকৈল এবং দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলায় মোট এক হাজার ৪৪১ দশমিক ৭৮ একর বনভূমি রয়েছে। এর মধ্যে ৩১৫ দশমিক ৯৫ একর বর্তমানে বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সবচেয়ে বেশি জমি দখল হয়েছে পীরগঞ্জের বাঁশগাড়া এবং রানীশংকৈলের কাশীপুর ও ফরিঙ্গাদীঘি মৌজায়। বাঁশগাড়ায় ৮৯ একরের মধ্যে ৭৪ দশমিক ৯২ একর, কাশীপুরে ১৩৭ দশমিক ৩০ একরের পুরোটা এবং ফরিঙ্গাদীঘিতে ৫৮ একরের মধ্যে ৩৫ একর জমি দখল হয়েছে। 
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক জায়গায় ২৫ থেকে ৩৫ বছর ধরে বন বিভাগের জমি দখলে রয়েছে। পীরগঞ্জের পূর্ব হাজিপুর মৌজায় সংরক্ষিত শালবাগানের চার দশমিক ৫৩ একরের মধ্যে দুই দশমিক ১২ একর জমি এখন দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে। সেখানে ধান চাষ, আমবাগান, চাতাল, অস্থায়ী দোকান ও খামার গড়ে তোলা হয়েছে।
হাজিপুর ও সাগুনি গ্রামের রুস্তম আলীসহ কয়েকজন বলেন, বন বিভাগের জমিতে এখনও কয়েক ডজন বড় শালগাছ রয়েছে। তবে দখল হওয়া অংশে বনজ পরিবেশ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এসব জমি দ্রুত দখলমুক্ত করা প্রয়োজন। তা না হলে ভবিষ্যতে জীববৈচিত্র্য আরও হুমকির মুখে পড়বে।
ঠাকুরগাঁও পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক তারেক হোসেন বলেন, বনভূমি ধ্বংসের ফলে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি, মাটির উর্বরতা হ্রাস, বন্যা-খরা এবং বায়ুদূষণের মতো নানা সমস্যা সৃষ্টি হয়। তিনি বলেন, বনভূমি কমে যাওয়া মানে মানবসভ্যতাকে বড় ধরনের বিপদের দিকে ঠেলে দেওয়া। কেননা শালবন শুধু গাছের সমষ্টি নয়, এটি একটি স্বতন্ত্র বাস্তুতন্ত্র। 

কারা দখলে রেখেছেন জমি
সাগুনি পেট্রল পোস্টের দায়িত্বপ্রাপ্ত বনপ্রহরী (এফজি) আবদুস সামাদ মণ্ডল জানান, বন বিভাগের তালিকা অনুযায়ী, পীরগঞ্জের বাঁশগাড়া মৌজার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বনভূমি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ব্যক্তি দখলে রেখেছেন। এর মধ্যে ইউসুফ আলী ও তাঁর আত্মীয়স্বজনের দখলে রয়েছে প্রায় ৪০ একর জমি। দৌলতপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সনাতন রায়ের দখলে প্রায় দুই একর, বাঁশগাড়া গ্রামের মজিবর রহমান প্রায় পৌনে চার একর, আব্দুল বাছেদ তিন একর, কবির উদ্দীন আড়াই একর, চাপোড় গ্রামের প্রফুল্ল চন্দ্র রায় সোয়া চার একর, লক্ষ্মীরাম প্রায় ১২ একর, আব্দুস ছালাম সাড়ে ১৫ একর, মো. চান মিয়া ১০ একর, লক্ষ্মীকান্ত সোয়া তিন একর এবং বিনু রাম বর্মণ সাড়ে চার একর বনভূমি দখল করে রেখেছেন। 

একইভাবে সাগুনী মৌজাতেও বনভূমি দখলের চিত্র পাওয়া গেছে। সেখানে হজরত আলীর দখলে রয়েছে প্রায় পাঁচ একর, মহেশ চন্দ্র রায়ের দুই একর, দুলাল ওরফে বাবুলের প্রায় আড়াই একর, দবির উদ্দীনের দেড় একর এবং নারায়ণ চন্দ্র রায়ের কাছে প্রায় পৌনে দুই একর বনভূমি রয়েছে বলে বন বিভাগের তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে দৌলতপুর ইউপি চেয়ারম্যান সনাতন রায় বলেন, ‘আমার কেনা জমির সঙ্গে বন বিভাগের জমি থাকলে ছেড়ে দেওয়া হবে।’ ইউসুফ আলী ও হজরত আলীর দাবি, ক্রয়সূত্রে পাওয়া জমিতে তারা চাষাবাদ করছেন। এসব জমি নিয়ে মামলা উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
সাগুনি গ্রামের বিমল চন্দ্র ও বংশীরাম রায় জানান, তাঁদের পূর্বপুরুষদের নামে এ জমি সিএস ও এসএ রেকর্ড রয়েছে। ক্ষতিপূরণ ছাড়াই বন বিভাগের আওতায় জমি নেওয়া হয়েছে বলে তারা শুনেছেন।

প্রশাসনের দ্বারস্থ বন বিভাগ
এভাবে দখল অব্যাহত থাকলে  জীববৈচিত্র্য ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়বে। এ কারণে গত ১১ মে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা, রেঞ্জ কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং থানার  ওসির কাছে বনভূমি উদ্ধারে সহযোগিতা চেয়ে চিঠি পাঠায় পীরগঞ্জ বিট অফিস। বিষয়টি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় আলোচনা হয়েছে। বনভূমি উদ্ধারে ব্যবস্থা গ্রহণে ঐকমত্য হয়েছে। এরই মধ্যে উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছে। 

পীরগঞ্জ বিট কর্মকর্তা মহসিন আলী বলেন, ‘আপিল মামলার রায় বন বিভাগের পক্ষে এসেছে। দায়িত্ব গ্রহণের পরই অবৈধ দখলে থাকা জমি উদ্ধারে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিয়েছি।’
ঠাকুরগাঁও রেঞ্জ কর্মকর্তা তসলিমা খাতুন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তালিকা থাকলেও জনবল সংকটের কারণে জমি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রশাসনের সহায়তায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দিনাজপুরের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) ফাহিম মাসউদ জানান, অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। উদ্ধার জমিতে নতুন করে দখল ঠেকাতে নজরদারি ও পুনঃবনায়নের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে সব দখলকৃত জমি উদ্ধার করে সামাজিক বনায়ন করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গোলাম রব্বানী সরদার বলেন, ‘প্রশাসন ও বন বিভাগ যৌথভাবে জনগণকে সম্পৃক্ত করে বনভূমি উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।’ সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান জাহিদ বলেন, ‘অবৈধ দখলদার যতই প্রভাবশালী হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। বন বিভাগের জমি উদ্ধারে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।’

আরও পড়ুন

×