ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

ঢাকার রেস্তোরাঁয় হরেক রকম খাবার

ঢাকার রেস্তোরাঁয় হরেক রকম খাবার
×

কোলাজ :: বোরহান আজাদ

আশরাফুল ইসলাম আকাশ

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬ | ০৭:১৬ | আপডেট: ১৩ জুন ২০২৬ | ১৬:০৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

সময়ের সঙ্গে পাল্টে যাচ্ছে ঢাকার ভোজনবিলাসীদের রুচি ও পছন্দ। ইন্টারনেট ও প্রযুক্তির কল্যাণে তারা চাইছেন ভিন্ন দেশের সংস্কৃতি ও খাবারের পেছনের প্রাচীন গল্পকে নিজেদের অভিজ্ঞতার অংশ করে নিতে। লিখেছেন আশরাফুল ইসলাম আকাশ
------------------------------------------------

একটা সময় ছিল, যখন বন্ধুদের জমজমাট আড্ডা বা পারিবারিক উৎসব মানেই অবধারিতভাবে ছিল কোনো চায়নিজ বা থাই রেস্তোরাঁ। ফ্রাইড রাইস আর থাই স্যুপের সেই একঘেয়েমি কাটিয়ে নগরবাসী এখন প্রতিনিয়ত খুঁজছেন নতুন কিছু। এ চাহিদার ওপর ভর করেই রাজধানীর আনাচে-কানাচে, বিশেষ করে অভিজাত এলাকাগুলোয় সগর্বে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে কোরিয়ান, জাপানিজ কিংবা আফ্রিকান খাবারের বিশেষায়িত সব রেস্তোরাঁ। 

কোরিয়ান স্বাদের খোঁজ
বনানীর-১১ নম্বর সড়কের ৩২ নম্বর বাড়ি, চন্ডিওয়ালা ম্যানশনের দ্বিতীয় তলায় গড়ে উঠেছে ‘কিমবাপ হাউস বাই কোরিয়ানা রেস্টুরেন্ট’। বাইরে থেকে ভবনটিকে অতি সাধারণ মনে হলেও সন্ধ্যা নামতেই এখানকার চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। ঢাকার অসংখ্য রেস্তোরাঁর ভিড়ে কোরিয়ান খাবারের জন্য মানুষের এই উপচে পড়া ভিড় প্রথমে যে কারও মনে বিস্ময় জাগাতে পারে। তবে ভেতরে ঢুকতেই মেলে সেই বিস্ময়ের কাঙ্ক্ষিত উত্তর। টেবিলের পর টেবিলে বসে থাকা অতিথিদের বেশির ভাগই তরুণ–বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী কিংবা নবদম্পতি।

তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশ এখন ‘হাল্যু’ বা কোরিয়ান ওয়েভের জাদুতে মুগ্ধ। নেটফ্লিক্সের কে-ড্রামা আর কে-পপের তুমুল জনপ্রিয়তার হাত ধরে কোরিয়ান সংস্কৃতি এ দেশের তরুণদের যাপিত জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, তাদের মোট গ্রাহকের প্রায় ৮০ শতাংশই এখন বাংলাদেশি। এর পেছনের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তারা জানান, কোরিয়ান খাবারের ঝাল স্বাদ এবং মসলার ব্যবহার অনেকটাই বাঙালিদের রুচির সঙ্গে চমৎকারভাবে মিলে যায়। ফলে এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে।

প্রায় দুই দশকের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন কোরিয়ান শেফ এখানে রান্নার দায়িত্বে রয়েছেন। ফলে খাবারের স্বাদে স্থানীয়করণের চেয়ে মৌলিকত্ব বা ‘অথেনটিসিটি’ বজায় রাখার দিকেই বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। মেন্যুতে থাকা চিজ বিফ কিমবাপ, টুনা মায়ো কিমবাপ, বিফ বুলগগি বিবিমবাপের মতো জিভে জল আনা পদগুলো মিলবে ৫৫০ থেকে ৭৫০ টাকার মধ্যে। এখানে কথা হয় শিক্ষার্থী তানজিলা রহমান এমার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কোরিয়ান ড্রামা দেখতে দেখতে এই খাবারগুলোর নাম শুনতাম। আগে মনে হতো এগুলো হয়তো শুধু পর্দাতেই ভালো লাগে। এখানে এসে খাওয়ার পর বুঝলাম, ভিন্ন সংস্কৃতির হলেও স্বাদটা আমাদের রসনার সঙ্গে দারুণভাবে মানিয়ে যায়।’

উত্তরায় এক টুকরো জাপান
উত্তরার রূপায়ণ সিটি কমপ্লেক্সের চতুর্থ তলায় পা রাখলেই মনে হবে এক লহমায় পৌঁছে গেছেন জাপানের কোনো এক ঐতিহ্যবাহী খাবার ঘরে! আলো, আসবাব আর নান্দনিক সাজসজ্জায় এটি যেন এক বিশাল জাপানি অন্দরমহল। চলতি বছরের শুরুতে যাত্রা শুরু করা ‘তেপ্পান তোরা’ খুব অল্প সময়েই জাপানি খাবারপ্রেমীদের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে।

জাপানি খাবার মানেই একসময় এ দেশের মানুষের কাছে কেবল ‘কাঁচা মাছ’ বা সুশির ধারণা ছিল, যা অনেকেই সহজে গ্রহণ করতে পারতেন না। রেস্তোরাঁটির ব্যবস্থাপক এনামুল হাওলাদার জানান, বাংলাদেশিদের মধ্যেও জাপানি খাবারের প্রতি আগ্রহ অভাবনীয়ভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে সুশি, স্টেক এবং তাদের সিগনেচার ‘তেপ্পান তোরা সালাদ’ এখন নিয়মিত অর্ডারের তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করে আছে।

এখানকার সবচেয়ে আলোচিত আইটেম হলো ‘ওয়াগু বিফ’। জাপান থেকে আমদানি করা এই বিশেষ জাতের গরুর মাংসের বিশ্বজোড়া খ্যাতি রয়েছে। প্রতি কেজি ওয়াগু বিফের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা এবং এই মাংস দিয়ে তৈরি একটি স্টেকের দাম ধরা হয়েছে ৭ হাজার ৯৯৯ টাকা। এ ছাড়া সুশিপ্রেমীদের জন্য ৮৯৯ থেকে এক হাজার ৪৯৯ টাকার মধ্যে রয়েছে দারুণ সব আয়োজন। এখানকার লাইভ কিচেনে বসে শেফের শৈল্পিক রান্না দেখার সুযোগ ভোজনরসিকদের এক অনন্য অভিজ্ঞতা দেয়।

আফ্রিকান ঝালের ঝাঁজ
বাঙালির ঝালপ্রীতির ইতিহাস অনেক পুরোনো। সেই সুযোগই কাজে লাগিয়েছে আফ্রিকান রন্ধনশৈলী। আফ্রিকান খাবারের কথা উঠলেই একসময় মনে পড়ে যেত জনপ্রিয় গ্রিল চেইন ‘নান্দোস’-এর নাম। তাদের বিদায়ের পর সেই শূন্যতা এখন অনেকটাই পূরণ করছে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ‘গ্রিন অ্যান্ড পেপার’।

এই রেস্তোরাঁটি মূলত আফ্রিকান আদলে তৈরি ফ্লেম-গ্রিলড চিকেন ও বিভিন্ন গ্রিল আইটেমের জন্য ভোজনরসিকদের কাছে সুপরিচিত। এখানকার সবচেয়ে জনপ্রিয় আইটেম হলো ‘পেরি-পেরি ফ্লেম-গ্রিলড চিকেন’। আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চল, বিশেষ করে মোজাম্বিক ও দক্ষিণ আফ্রিকায় অত্যন্ত জনপ্রিয় পেরি-পেরি মরিচের তীব্র ঝাল সস ব্যবহার করেই তৈরি হয় এখানকার সিগনেচার পদগুলো। একটি আস্ত ফ্লেম-গ্রিলড চিকেনের দাম দুই হাজার ১৯০ টাকা। ব্যাংকার রিফাত কবিরের ভাষায়, ‘আমরা তো এমনিতে একটু ঝাল খেতে পছন্দ করি। তাই পেরি-পেরি সসের ঝাঁজালো স্বাদটা দ্রুতই আপন করে নিয়েছি।’

ঢাকার রেস্তোরাঁ শিল্প এখন এক যুগান্তকারী পালাবদলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একসময় যা নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল, আজ তা ছড়িয়ে পড়েছে মানচিত্রের নানা প্রান্তে। নাগরিক জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে ঢাকার মানুষ এখন সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়ছেন এক অন্যরকম বিশ্বভ্রমণে। যার টিকিট মেলে এ শহরের বুকেই থাকা নানা রেস্তোরাঁর মেন্যু কার্ডে। ঢাকার পাতে এখন আক্ষরিক অর্থেই চলছে এক সুস্বাদু ও অবিরাম বিশ্বভ্রমণ।

আরও পড়ুন

×