গরুর দুধে চরবাসীর ঘুরে দাঁড়ানো
পাবনার বেড়া উপজেলার যমুনার দক্ষিণ চরপেঁচাকোলা চরে নিজের খামারে আশকার প্রামাণিক
জালাল উদ্দিন
প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬ | ০৭:১০ | আপডেট: ১৩ জুন ২০২৬ | ১৬:১৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
যমুনার সর্বনাশা ঢেউ একসময় কেড়ে নিয়েছিল বসতভিটা আর ফসলি জমি। প্রমত্ত নদীর করাল গ্রাসে নিঃস্ব হয়ে পাবনার বেড়া উপজেলার দক্ষিণ চরপেঁচাকোলায় ঠাঁই নিয়েছিলেন আশকার প্রামাণিক। দুবেলা দুমুঠো অন্ন জোটাতে যখন দিনরাত হাহাকার, তখন ভাগ্যবদলের হাতিয়ার হয়ে আসে ধারদেনা করে কেনা দুটি বকনা বাছুর। পনেরো বছর আগের সেই নিদারুণ কষ্টের স্মৃতি আজ যেন কেবলই রূপকথা!
বর্তমানে তাঁর খামারে শোভা পাচ্ছে ২৫টি উন্নত জাতের গরু, যার বাজারমূল্য অন্তত ৫০ লাখ টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২৫ লাখ টাকার কৃষিজমি। প্রতিদিন খামার থেকে মিলছে আড়াই মণ তরল সোনাখ্যাত দুধ। বারবার যমুনার ভাঙনে সর্বস্বান্ত হওয়া আশকার আজ এলাকার অন্যতম সচ্ছল ও সম্মানিত ব্যক্তি।
শুধু আশকার প্রামাণিক নন, বেড়া উপজেলার চরাঞ্চলে কান পাতলেই এখন শোনা যায় এমন শত শত ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণাদায়ী আখ্যান। যমুনার বুকে জেগে ওঠা বেড়ার অন্তত ১৫টি চর এখন পরিণত হয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ দুগ্ধ উৎপাদনকারী অঞ্চলে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্যমতে, এসব চর থেকে প্রতিদিন প্রায় ৯৫ হাজার লিটার দুধ উৎপাদিত হচ্ছে। প্রায় ৮০ হাজার মানুষের এই জনপদে নীরবে ঘটে গেছে এক যুগান্তকারী ‘শ্বেত-বিপ্লব’।
এই অভাবনীয় অর্থনৈতিক উত্থানের নেপথ্যে রয়েছে চমৎকার এক ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক হিসাব। সমতলের খামারিদের সারা বছর চড়া দামে কেনা দানাদার খাবার ও খড়ের ওপর নির্ভর করতে হয়। চরের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে বর্ষার চার মাস বাদে বছরের বাকি আট মাস প্রাকৃতিকভাবেই জন্ম নেয় প্রচুর কাঁচা ঘাস। বিজ্ঞান বলছে, বিনামূল্যে পাওয়া এই পুষ্টিকর ঘাস গাভির দুধ উৎপাদন ক্ষমতা, ঘনত্ব ও পুষ্টিগুণ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। একদিকে বিনামূল্যে গোখাদ্যের সহজলভ্যতা, অন্যদিকে দুধের বাড়তি উৎপাদন–সব মিলিয়ে সমতলের চেয়ে চরে গবাদিপশু পালনের খরচ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। মুনাফা হয় দ্বিগুণ। এই সহজ সমীকরণই চরবাসীকে পুরোপুরি গবাদিপশু পালনে ঝুঁকতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই চরের প্রতিটি বাড়িতে শুরু হয় এক অভূতপূর্ব কর্মচাঞ্চল্য। দুধ দোহন শেষে ব্যবসায়ীরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে তা সংগ্রহ করে বড় ধাতব পাত্রে ভরে ছোটেন নদীর ঘাটে। অপেক্ষমাণ যন্ত্রচালিত নৌকায় সেই দুধ যমুনার বুক চিরে পৌঁছে যায় পেঁচাকোলা, মোহনগঞ্জ বা নগরবাড়ীর নৌঘাটগুলোতে। সেখান থেকে দেশের শীর্ষস্থানীয় দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শীতলীকরণ কেন্দ্রে চলে যায় চরের এই খাঁটি দুধ।
বেড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সাইফুল ইসলাম এই রূপান্তরকে বিশাল সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘চরে প্রাকৃতিক খাবারের প্রাচুর্যের কারণে গবাদিপশু পালন অত্যন্ত লাভজনক। বেড়ার চরগুলোয় এখন প্রায় ২১ হাজার গাভি আছে, যার মধ্যে অন্তত ১০ হাজার গাভি নিয়মিত দুধ দিচ্ছে। আমরা নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দিয়ে খামারিদের পাশে আছি।’
তীব্র অভাব আর অনিশ্চয়তার অন্ধকার দিন পেরিয়ে চরবাসী আজ সচ্ছলতার আলোয় উদ্ভাসিত। যমুনা একসময় তাদের যা কেড়ে নিয়েছিল, আজ যেন তার চেয়েও অনেক বেশি দুহাত ভরে ফিরিয়ে দিচ্ছে।
