স্বল্পদৈর্ঘ্যের আলোছায়া
যুক্তরাষ্ট্রের চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গ্রাভিটাস ভেঞ্চার অনেক দৃশ্য ধারণ করতে ক্যামেরার বদলে স্মার্টফোন ব্যবহার করছে
বিধান রিবেরু
প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬ | ০৬:৫৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রতিদিন স্মার্টফোনে আমাদের সামনে হাজির হয় শত শত ভিডিও, রিলস আর শর্টস। এই দৃশ্যগুলোর গতি, প্রকৃতি নিয়ে লিখেছেন বিধান রিবেরু
সারাদিনমান ‘অর্বুদ’ দৃশ্যমালা আসছে ক্রমাগত, অনবরত, সুনামির ঢেউয়ের মতো, আমাদের প্লাবিত করছে, আপ্লুত করছে, ক্লান্ত করছে, বিরক্ত করছে। অর্বুদ হলো প্রাচীন ভারতীয় ও বাংলা গণনা পদ্ধতি অনুযায়ী, দশ কোটি (১০,০০,০০,০০০) সংখ্যাটিকে একক হিসেবে ধরা। এতসব দৃশ্য কোথা থেকে আসছে, সেটি প্রশ্ন নয়, প্রশ্ন হলো এসব দৃশ্যের ‘জঞ্জাল’ বা ‘স্তূপ’ নিয়ে আমরা কী করব? এটি বলার অপেক্ষা রাখে না, হাতের মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় দৃশ্যধারণ ও সম্পাদনার সুযোগ তৈরির পর থেকে এই জোয়ার শুরু হয়েছে। জোয়ারের পূর্বাভাস পেয়ে সামাজিক মাধ্যমগুলো মঞ্চ প্রস্তুত করেছে। পুঁজিবাদ নিয়ন্ত্রিত সেই মঞ্চে নির্মাতা হয়েছেন ভোক্তা, ভোক্তাই বনে গেছেন নির্মাতা। ছোট ছোট ক্লিপ বা রিলস বানাতে বানাতে এখন দেখা যাচ্ছে লোকজন মাইক্রো ড্রামাও বানাতে শুরু করেছে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের জন্য।
ক্ষুদ্র নাটিকার সঙ্গে মোবাইল ফোন দিয়ে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের কিছুটা মিল আছে। দুটোই শিল্পকে বিবেচনা করে বানানো হয়। এর বাইরে যেসব ধ্বনিচিত্র আমরা দেখি সেগুলো কিন্তু শিল্পের ধার ধারে না, মার্জিত ও পরিশীলিত রুচির তোয়াক্কা করে না। এমনকি অন্যের কাছ থেকে চুরি করা দৃশ্য নির্দ্বিধায় জুড়ে দিতেও দ্বিধা করে না। তাদের লক্ষ্য হলো ভিউ বাড়ানো, ভিউ বাড়লে টাকা আসবে। সে জন্য দেখবেন অনেক দম্পতি বা লোকজন এমন সব আধেয় (কনটেন্ট) নির্মাণ করছে, যা আপনি একা দেখতেও লজ্জা পাবেন। যৌনগন্ধী ও নোংরা আধেয় ছাড়াও আরও যেসব আধেয় প্রতিদিন ছাড়া হচ্ছে বিভিন্ন মাধ্যমে সেগুলো গুণে ও মানে অত্যন্ত দরিদ্র। তাতে কী, সেসবেরও তো ভোক্তা আছে!
তবে মজার বিষয়, আজকালকার ভাষায় যাকে বলে ‘ট্রেন্ডিং’, তার ধাক্কায় ধনী ও গরিব সবাই যেন একই ঘাটে জল খেতে চলে আসে। যে যেমন পারছে একই জিনিস বানিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে। অবশ্য এখানে শ্রেণিভেদে ট্রেন্ডিংয়ের বিষয় কিছুটা হেরফের হয়। আবার কখনও বা সবকিছু ভেঙেচুরে সব সমানও হয়ে যায়। যেমন কিছুদিন আগে দেখা গেল এক অখ্যাত অভিনেতা, খুবই প্রান্তিক পর্যায়ের নাটক বানাতে গিয়ে ভাইরাল করে ফেললেন ‘রাগ করলা?’ বলে এক প্রশ্ন। সেই সংলাপ মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ল, এমনকি মূলধারার গণমাধ্যমও সেটি নিয়ে প্রতিবেদন করতে বাধ্য হলো। কারণ, সবাই যে একই সংলাপ আওড়ে হাজার হাজার ভিডিও বানিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে বিবিধ মাধ্যমে! বিশ্বখ্যাত নির্মাতা ভেরনার হেরজগ সে জন্যই বলেছিলেন, ‘আমরা ছেঁড়াফাটা দৃশ্য দ্বারা পরিবেষ্টিত। মানে একই কাপড় পরিধান করলে যেমন তার তন্তু আর আস্ত থাকে না, সে রকম আর কী! ট্রেন্ডিং মানেই অতিব্যবহৃত উপাদান।’
একদিকে বেশ সাজানো-গোছানো আধেয়–চিকিৎসকদের পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, মুভি ও বুক রিভিউ, ট্রাভেলগ, জনসচেতনতামূলক ভিডিও ইত্যাদি। অন্যদিকে দুনিয়ার হাবিজাবি, ক্রিঞ্জ, জঘন্য হাস্যকর এবং এক ধরনের ছোটলোকী সস্তা ভিডিও দিয়ে সামাজিক মাধ্যম সয়লাব। কিশোর থেকে উঠতি বয়সী তরুণরাই এসব ভিডিও বেশি বানায় এবং এটিকে যদি শ্রেণির বিচারে বলি, তবে দেখা যাবে নিম্নমধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানরাই এসব ভিডিও বানাচ্ছে এবং তারা ভালোই আয়-রোজগার করছে। হিরো আলম, মামুন-লায়লা, রিপন ভিডিও প্রমুখ প্রণিধানযোগ্য। তাদের তৈরি করা ভিডিওকে এক কথায় বলা যায় টোকানো, জোড়াতালি মারা নিম্নমানের আধেয়। অনেকে অবশ্য তাদের অবজ্ঞা করে ‘ছাপড়িদের কনটেন্ট’ বলেন। কিন্তু তাই বলে নয়াউদারবাদী এই সমাজে নিম্নবিত্ত শ্রেণির যে অস্তিত্ব সেটি উবে যায় না, বরং ভিন্ন বাস্তবতায় উদ্ভাসিত হয়। বলা যায়, একেবারে আপনার হাতের মুঠোয় এসে হাজির হয়।
এ ধরনের আধেয় নিয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন জার্মান চলচ্চিত্র নির্মাতা, গণমাধ্যম তাত্ত্বিক হিটো স্টেয়ার্ল। তিনি বলছেন, এসব গরিবি আধেয় হলো অধুনার হতভাগা মানুষের মতো। অর্থাৎ তাদের চেহারায় অপুষ্টির ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু তারা সংখ্যায় অনেক বেশি। তারা এলিট নয়। তাদের স্থান তাই হয় নাকো কভু হাই-অ্যান্ড রেজুলেশনের কোনো বড় পর্দায়। সেসব জায়গার দামি পর্দায় চলে অনেক বড় বড় তারকার চকচকে ছবি। নিম্নবিত্ত দর্শক কয়েকশ টাকার টিকিট কেটে সেসব ছবি দেখতে যায় না। তাদের মোবাইলে থাকা শাকিব খানের চোরাই ছবিই যথেষ্ট বিনোদনের জন্য। এটিও ঠিক, চলচ্চিত্র তথা দৃশ্যমাধ্যমের জন্য ক্ষুধা এখন অধিকাংশই মিটিয়ে দিচ্ছে তাদেরই তৈরি করা সব ‘গরিবি ভিডিও’।
পুঁজির বাজারে কনটেন্ট বা আধেয়ের আনাগোনা অবাধ। তবে তারা একেক শ্রেণির কাছে ধরা পড়ে একেক রূপে। যেমন উচ্চবিত্ত অনন্ত জলিল অনেক পয়সা খরচ করে ছবি বানান, সেসব ছবির ভোক্তা শেষ পর্যন্ত বিত্তশালীরা হন না। মধ্যবিত্তরা জলিলকে বানিয়ে ছাড়েন হাসির পাত্র! উচ্চবিত্তের কাছে হয় তো বেশি আদর পায় বিদেশি কোনো আধেয়। গ্রামাঞ্চলের নাটিকা অথবা ওয়াজ মাহফিলের আধেয় হয়তো তাদের এলগরিদমে ঠাঁই পায় না। যেমন গ্রামের দর্শকের এলগরিদমে স্থান পায় না ক্রিস্টোফার নোলানের ইন্টারভিউ। তবে ভাইরাল হলে কিছু দৃশ্যাবলি এসব শ্রেণি-সীমান্তরেখা মুছে ফেলে, সেটিই দৃশ্যের শক্তির জায়গা। এই ঝড়তোলা ভাইরাল দৃশ্যগুলোর জীবনচক্র কিন্তু ক্ষণস্থায়ী। কিছুদিন খুব হইচই হয়, তারপর হাওয়া।
হারিয়ে যাওয়ার আগে এসব ক্ষণস্থায়ী আপাত ‘গরিব’ আধেয় যে একটি শ্রেণির কণ্ঠস্বরে পরিণত হয় তা অস্বীকার করার জো নেই। আবার একটি জাতির মেধা ও মননের অবস্থানকেও চিহ্নিত করে এসব বেনোজলের মতো তৈরি হওয়া আধেয়। এখন প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে এতসব আধেয় তৈরি হচ্ছে, সেই জায়গায় আমরা সবাই কি গড্ডলের মতো গা ভাসাব? নাকি আমাদের উচিত হবে এই দৃশ্যস্রোতকে একটি নির্দিষ্ট দিকে প্রবাহিত করা, তাকে অর্থবহ করে তোলা? যদি সে রকমটা করতে চাই, তাহলে আমাদের দরকার দৃশ্য-সংক্রান্ত শিক্ষা। স্কুল-কলেজে যদি স্বল্প পরিসরেও যে কোনো ক্যামেরা দিয়ে ছোট ছবি বা আধেয় নির্মাণের তরিকা ও বিষয় নিয়ে নিয়মিত কর্মশালা করা যায়, তাহলে যে ধরনের বাজে আধেয় আমরা দেখি, তার পরিমাণ কমে আসতে পারে। কে জানে, আমরাও হয় তো নাইজেরিয়ার নলিউডের মতো দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ফেলতে পারব। তারাও প্রথমে ছোট ছোট নাটিকা নির্মাণ দিয়ে শুরু করেছিল, এখন তারা রাজত্ব করছে গোটা আফ্রিকায়। আমাদের বাঙালি ভাষাভাষীর বাজারটাও তো কম বড় নয়! আমাদের মেধা আছে, মেধাবীদের হাতে মোবাইল ফোনও আছে। এখন শুধু দরকার একটু যথাযথ দিকনির্দেশনা এবং সেটি দেওয়া অসম্ভব কোনো কাজ নয় বলেই আমার বিশ্বাস।
লেখক: চলচ্চিত্র গবেষক
- বিষয় :
- চলচ্চিত্র
