ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

মেক্সিকোতে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যুরাল

তুলির আঁচড়ে ফুটবলের মহাকাব্য

তুলির আঁচড়ে ফুটবলের মহাকাব্য
×

মেক্সিকো সিটির উত্তরাঞ্চলীয় ডিসট্রিক্ট ‘আলকালদিয়া গুস্তাভো এ. মাদেরো’র একটি ব্যস্ত সড়কের পাশের বিশাল প্রাচীর এখন পরিণত হয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ হস্তনির্মিত ম্যুরাল বা দেয়ালচিত্রে

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪৬ | আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ২০:১১

| প্রিন্ট সংস্করণ

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের উন্মাদনায় মেতেছে পুরো বিশ্ব। ১৯৮৬ সালের পর আবারও ফুটবলের এই বিশ্বমঞ্চের অন্যতম আয়োজক হিসেবে মেক্সিকো আক্ষরিক অর্থেই উৎসবের দেশ। বিশ্বকাপের সময় মেক্সিকো সিটি, গুয়াদালাজারা এবং মন্টেরের মতো শহরগুলোতে ছিল লাখো ফুটবলপ্রেমীর ঢল। তবে স্টেডিয়ামের সবুজগালিচার বাইরের উন্মাদনাকেও যে শিল্পের ক্যানভাসে চিরস্থায়ী রূপ দেওয়া যায়, মেক্সিকো সিটি যেন তারই এক অনবদ্য উদাহরণ তৈরি করল।

শহরের উত্তরাঞ্চলীয় ডিসট্রিক্ট ‘আলকালদিয়া গুস্তাভো এ. মাদেরো’র একটি ব্যস্ত সড়কের পাশের বিশাল প্রাচীর এখন আর শুধু ইট-পাথরের দেয়াল নেই; তা পরিণত হয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ হস্তনির্মিত ম্যুরাল বা দেয়ালচিত্রে। তুলির আঁচড়ে ফুটে ওঠা শিল্পকর্মটি শুধু বিশ্বকাপের উদযাপন নয়; বরং এটি ফুটবল, সংস্কৃতি ও হাজার বছরের মানবেতিহাসের এক অপূর্ব মেলবন্ধন।

রেকর্ডের পাতায় রঙের ছোঁয়া
গত ২৪ মে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচিত হওয়া ম্যুরালটি এরই মধ্যে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নিজের নাম লিখিয়েছে। ২০৩.৪৬ বর্গমিটার (প্রায় ৬৬৭.৫১ বর্গফুট) জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই সুবিশাল চিত্রকর্মটি এখন ‘বিশ্বের বৃহত্তম ব্রাশ-পেইন্টেড ম্যুরাল’।

দেয়ালজুড়ে ছড়িয়ে আছে চোখ ধাঁধানো রং, ৪৮টি অংশগ্রহণকারী দেশের উড়ন্ত পতাকা এবং ফুটবলের প্রতি বিশ্ববাসীর শর্তহীন ভালোবাসার নানা প্রতীক। শিল্পকর্মটির একটি অংশে দেখা যায়, সবুজ জার্সি পরা এক নারী খেলোয়াড় বল পায়ে ড্রিবলিং করে এগিয়ে যাচ্ছেন, আর তাঁর ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন এক প্রাচীন মেসোআমেরিকান যোদ্ধা। অন্যপাশে একদল ফরোয়ার্ড আক্রমণ শানাচ্ছেন এমন একটি বলের দিকে, যার আকৃতি ঠিক আমাদের এই পৃথিবীর মতো। 

হাজার বছরের বল-সংস্কৃতি 
ফুটবল কেবল আধুনিক যুগের কোনো আবিষ্কার নয়; এর শিকড় প্রোথিত আছে হাজার বছরের সভ্যতায়। ম্যুরালটিতে সেই ঐতিহাসিক বিবর্তনকেও চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। 

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, প্রাচীনকাল থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বল খেলার প্রচলন ছিল। চীনের ‘কুজু’, জাপানের ‘কেমারি’, হোমারের মহাকাব্য ‘ওডিসি’-তে উল্লিখিত বল খেলা কিংবা সেন্ট্রাল আমেরিকার রোমাঞ্চকর ‘ফায়ারবল’–সবই যেন আজকের ফুটবলেরই আদি রূপ। 

বিশেষ করে প্রাচীন মেসোআমেরিকায় (বর্তমান মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকা) এই খেলাটির ছিল এক গভীর সামাজিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য। সে সময় রাবারের তৈরি বল পা দিয়ে নয়, বরং খেলোয়াড়রা তাদের কোমর বা নিতম্ব দিয়ে আঘাত করে জাল বা রিংয়ের ভেতর পাঠানোর চেষ্টা করতেন। শুরুতে শুধু রাজনৈতিক বা ধর্মীয় অভিজাত শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে এই খেলার মাঠ বা কোর্ট পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ষোলো শতকে স্প্যানিশ কনকুইস্তাদররা এই খেলা নিষিদ্ধ করলেও স্থানীয়রা গোপনে নিজেদের সংস্কৃতির এই অমূল্য অনুষঙ্গ বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। ম্যুরালটিতে সেই প্রাচীন যোদ্ধা ও আধুনিক নারী ফুটবলারের পাশাপাশি অবস্থান মূলত অতীত ও বর্তমানের সেই অবিচ্ছেদ্য যোগসূত্রকেই নির্দেশ করে।

ফুটবলের দর্শনে মানবতা ও ঐক্য
শিল্পকর্মটি শুধু চোখের আনন্দ দেওয়ার জন্য তৈরি হয়নি, এর পেছনে রয়েছে এক গভীর দর্শন। আয়োজকদের মতে, ‘এই রেকর্ড মূলত মানবসভ্যতার গতিশীল ইতিহাসের একটি প্রামাণ্য দলিল, যা কালের পরিক্রমায় সংস্কৃতির রূপ ধারণ করেছে।’

ম্যুরালের পেছনের রূপকার বা শিল্পীরা প্রকল্পটিকে দেখছেন একটি ‘নিরবচ্ছিন্ন দৃশ্যমান ভ্রমণ’ হিসেবে। তাদের ভাষায়, ‘এখানে সময় কোনো সরলরেখায় চলে না; বরং এটি বিভিন্ন সভ্যতা, আবেগ এবং মানবিক বিবর্তনের মধ্যকার এক অন্তহীন কথোপকথন। ফুটবলকে এখানে শুধু একটি প্রতিযোগিতামূলক খেলা হিসেবে দেখা হয়নি; বরং একে একটি সর্বজনীন মানবিক অভিজ্ঞতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে– যার শক্তি আছে ভিন্ন ভিন্ন গল্প, সংস্কৃতি ও প্রজন্মকে এক সুতোয় গাঁথার।’

শিল্পের ফ্রেমে আগামীর উত্তরাধিকার
একটি শহরের সৌন্দর্যবর্ধন এবং স্থানীয়দের মধ্যে সাংস্কৃতিক গর্ববোধ জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে জনপরিসরের শিল্পকর্ম বা ‘পাবলিক আর্ট’-এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপকে সামনে রেখে মেক্সিকো সিটি প্রশাসন এমন একটি শিল্পকর্মই উপহার দিতে চেয়েছে, যা টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পরও যুগের পর যুগ শহরের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে। 

আয়োজকরা যথার্থই বলেছেন, ‘এই শিল্পকর্মের বিশালতা কেবল এর আকারের জন্য নয়; বরং চারপাশকে সাংস্কৃতিকভাবে বদলে দেওয়ার প্রতীকী ক্ষমতার জন্যও প্রশংসিত হবে। এটি স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের জন্য রেখে যাবে এক স্থায়ী সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।’

ফুটবল মাঠে গোল হয়, রেকর্ড ভাঙে, নতুন চ্যাম্পিয়ন জন্ম নেয়। কিন্তু মেক্সিকো সিটির এই সুবিশাল ম্যুরালটি যেন নিঃশব্দে বলে যাচ্ছে– ফুটবলের আসল জয়টা লুকিয়ে আছে মানুষকে মেলাতে পারার জাদুতে। রঙের এই মহাকাব্যের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক মানুষ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার; গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের ভাষায় তারা আজ ‘অফিসিয়ালি অ্যামেজিং’! 

তথ্যসূত্র: গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ওয়েবসাইট

আরও পড়ুন

×