ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

মানবিকতার তরে...

মানবিকতার তরে...
×

বানভাসীদের জন্য ছুটে গিয়েছেন কনটেন্ট ক্রিয়েটররাও; ওপরের ছবিতে শামীম আহমেদ, যিনি ভার্চুয়াল জগতে ‘মনা’ নামে বেশি পরিচিত; নিচের (বামে) ছবিতে ‘কল্লাক মিয়া’খ্যাত জয় এবং (ডানে) পিংকি মামা

আশরাফুল ইসলাম আকাশ

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪৫ | আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ২০:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

বুকসমান ঘোলা জলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি আধা-ডোবা চালাঘর। বারান্দায় নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধা, টানা দুদিন যার চুলায় আগুন জ্বলেনি। পাশেই পাঁচ দিনের নবজাতক বুকে আঁকড়ে বসে আছেন এক উদভ্রান্ত মা। এটি কোনো সিনেমার চিত্রনাট্য নয়, বরং সম্প্রতি চট্টগ্রামের ভয়াবহ বন্যার এক রূঢ় বাস্তব চিত্র। এ ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেই দেখা মিলেছে এমন কিছু মানুষের, যাদের এ দেশের মানুষ সাধারণত চেনে মোবাইলের আলোকিত পর্দায়।

কেউ নিখাদ বিনোদন দিয়ে মানুষকে হাসিয়েছেন, কেউবা তুলে ধরেছেন জীবনযাপনের নানা বৈচিত্র্যময় গল্প। দুর্যোগের দিনে এই ‘কনটেন্ট ক্রিয়েটর’ বা ‘ইনফ্লুয়েন্সার’রা অবতীর্ণ হয়েছেন সম্মুখসারির স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে। তাদেরই একজন শামীম আহমেদ, যিনি ভার্চুয়াল জগতে ‘মনা’ নামেই বেশি পরিচিত। ফেসবুকে প্রায় ৩৬ লাখ অনুসারীর এ ক্রিয়েটর যখন ব্যবসার কাজে চূড়ান্ত ব্যস্ত, তখন নিজ জেলার মানুষের এমন অবর্ণনীয় কষ্ট তাঁকে স্থির থাকতে দেয়নি। বন্যার সময় দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট থাকে। শুকনো খাবার পানির তৃষ্ণা আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই তিনি বড় বড় ডেকচি ভর্তি খিচুড়ির বন্দোবস্ত করেন; যা খেয়ে একজন বিপন্ন মানুষ অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা স্বস্তিতে কাটাতে পারেন। প্রথম দিনেই প্রায় ৩০-৩৫ জনের একটি দল চকরিয়ার হারবাং ও আশপাশের প্রত্যন্ত এলাকায় এ খাবার পৌঁছে দেয়।

পরদিন মনা নিজেই নেমে পড়েন কাদাপানির মাঠে। সঙ্গী হন সামাজিক মাধ্যমের আরেক পরিচিত মুখ ‘কল্লাক মিয়া’খ্যাত জয়। দ্বিতীয় দিনে তারা প্রায় ৮০০ মানুষের হাতে খাবার ও বিশুদ্ধ পানি তুলে দেন। তৃতীয় দিনে যা হাজার ছাড়িয়ে যায়। দিনভর হাড়ভাঙা খাটুনির পর ক্লান্ত স্বেচ্ছাসেবকদের গল্প আর হাসি-ঠাট্টায় উজ্জীবিত রাখতেন মনা। কারণ তিনি জানতেন, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এ লড়াইটা দীর্ঘ।

ত্রাণের প্যাকেটে চাল-ডাল থাকলেও গ্রামীণ নারীদের অতিপ্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসামগ্রী বা স্যানিটারি ন্যাপকিনের বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়। এই নীরব কষ্ট দূর করতে চিকিৎসক বন্ধু রবিনের সহযোগিতায় তারা ৭০০টির বেশি স্যানিটারি ন্যাপকিন দুর্গত নারীদের হাতে পৌঁছে দেন। মনা মনে করেন, প্রতিবছর বন্যা হবে আর আমরা ত্রাণ নিয়ে ছুটব–এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং পরিবেশ ধ্বংসের দায় সমাজ ও রাষ্ট্রকে নিতে হবে। প্রকৃতিকে ক্ষতবিক্ষত করে এ ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি ঠেকানো সম্ভব নয়।

চট্টগ্রামের এই মানবিক জাগরণে মনা একা ছিলেন না। হাজার কিলোমিটার দূরে শ্রীলঙ্কায় বসেও মাতৃভূমির দুর্দশায় স্থির থাকতে পারেননি চাঁদপুরের জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর আপন খান। রাতারাতি নিজের টিমকে সাতকানিয়ার উদ্দেশে রওনা হওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। নিজস্ব অর্থায়নে মাত্র দুদিনের মধ্যে কয়েকশ পরিবারের হাতে তারা পৌঁছে দেন শুকনো খাবার, ওরস্যালাইন, ওষুধ ও বিশুদ্ধ পানি। 

পিংকি মামা, জেকে শান্ত, ভাইডি পেজের ক্রিয়েটরসহ নানা প্রান্তের পরিচিত মুখও ছুটে গিয়েছিলেন চট্টগ্রামের মানুষের কাছে। নারী কনটেন্ট ক্রিয়েটর ‘পিংকি মামা’ বন্যাকবলিত নারীদের গোপনীয়তা ও সুরক্ষার কথা বিবেচনায় রেখে স্যানিটারি ন্যাপকিন, স্যালাইন ও ওষুধ নিয়ে ছুটে যান ডোমখালীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে। কোমরপানি পেরিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নারীদের হাতে পৌঁছে দেন এই সুরক্ষা সামগ্রী।

আরও পড়ুন

×