‘ভাইকিং রো’
বিশ্বকাপে ইতিহাসের অনুরণন
শাহেরীন আরাফাত
প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ | ১২:৪৩ | আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬ | ১২:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
আধুনিক ক্রীড়াঙ্গন শুধু জয়-পরাজয়ের শুষ্ক পরিসংখ্যানে বন্দি থাকে না; অনেক সময় তা হয়ে ওঠে কোনো জাতিসত্তার আত্মপরিচয়, শিকড়ের ইতিহাস আর সামষ্টিক ঐক্যের এক জীবন্ত ক্যানভাস। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে নরওয়ে ফুটবল দল এবং তাদের অগণিত সমর্থক ঠিক এমনই এক অভাবনীয় দৃশ্যের জন্ম দিয়েছেন। দীর্ঘ ২৮ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে পরাশক্তি ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে নরওয়ে যখন প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ আটে পা রাখল, তখন মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়েও বেশি কিছু নজর কাড়ল বিশ্ববাসীর। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম থেকে শুরু করে অসলোর রাজপথ–সবখানে সমর্থকেরা একযোগে বসে দাঁড় টানার অনুকরণে মেতে উঠলেন। চারপাশ প্রকম্পিত হতে থাকল এক আদিম গর্জনে–‘রো...!’। ‘ভাইকিং রো’ নামের অভিনব এই উদযাপন যেন এবারের বিশ্বকাপকে এক ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।
এই ‘ভাইকিং রো’র মর্মার্থ বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হবে ৮০০ থেকে ১০৫০ খ্রিষ্টাব্দের ভাইকিং যুগে। নরওয়ের বিস্তীর্ণ ‘ফিয়র্ড’ বা দুর্গম জলপথই ছিল তাদের সামুদ্রিক সংস্কৃতির প্রধান চালিকাশক্তি। সুড়ঙ্গ আর সেতুর যুগে প্রবেশের বহু আগে যাতায়াত, বাণিজ্য বা যুদ্ধ–সবকিছুর জন্যই নরওয়েজিয়ানদের ভরসা ছিল জলপথ। তাদের তৈরি অত্যাধুনিক দীর্ঘ তরী বা ‘লংশিপ’গুলো পাল এবং দাঁড় উভয় মাধ্যমেই চলতে পারত। যখন বাতাস প্রতিকূলে থাকত কিংবা যুদ্ধে দ্রুতগতির প্রয়োজন হতো, তখন বিশাল নৌকার নাবিকেরা একযোগে ছন্দে ছন্দে দাঁড় টানতেন।
এই একযোগে দাঁড় টানা কেবল নিছক কায়িক শ্রম ছিল না; এটি ছিল পারস্পরিক নির্ভরতা আর ঐক্যের প্রতীক। সবাই একই দিকে মুখ করে, একই ছন্দে, অভিন্ন লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতেন। আজ গ্যালারিতে বসে যখন হাজারো মানুষ সেই একই ভঙ্গিতে শরীর দুলিয়ে দাঁড় টানেন, তখন যেন সেই আদিম সামুদ্রিক ঐক্যের চিত্রটিই নতুন করে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
ঐতিহাসিকভাবে এবারের ‘ভাইকিং রো’ এক অসামান্য কাব্যিক তাৎপর্য বহন করছে। এক হাজার খ্রিষ্টাব্দের দিকে নরওয়েজিয়ান অভিযাত্রী লেইফ এরিকসন আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে উত্তর আমেরিকার ভূখণ্ডে পৌঁছেছিলেন, যার নাম তারা দিয়েছিলেন ‘ভিনল্যান্ড’। ক্রিস্টোফার কলম্বাসেরও প্রায় ৫০০ বছর আগে তারা সেখানে পা রাখেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপটিও অনুষ্ঠিত হচ্ছে সেই উত্তর আমেরিকাতেই। হাজার বছর আগে ভাইকিংরা যেমন আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আমেরিকায় পৌঁছেছিলেন, আজ তাদের উত্তরসূরিরা সেই আমেরিকার মাটিতে বসেই কাল্পনিক দাঁড় টেনে নিজেদের দলকে উদ্দীপ্ত করছেন। ইতিহাসের এই প্রতীকী পুনরাবৃত্তি উদযাপনকে এক মহাকাব্যিক গভীরতা দিয়েছে।
এমন রোমাঞ্চকর উদযাপন রাতারাতি তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে সুপরিকল্পিত ভাবনা। নরওয়ে দলের ‘সুপারফ্যান’ ওলে ফ্রেইস্তা, যিনি নেট দুনিয়ায় ‘মিস্টার রো রো’ নামে পরিচিত, এই উদযাপনের মূল রূপকার। হেভি মেটাল সংগীতের জগতে, বিশেষ করে সুইডিশ ভাইকিং মেটাল ব্যান্ড ‘অ্যামন আমার্থ’-এর কনসার্টে দর্শকরা এভাবেই বসে দাঁড় টানার অনুকরণ করত। ফ্রেইস্তা এ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নরওয়ের একটি পুরোনো গর্জনের সঙ্গে এর মেলবন্ধন ঘটান।
একটি ঐতিহ্যবাহী ভাইকিং শিঙা (ভাইকিং হর্ন) বাজানোর মধ্য দিয়ে এই উদযাপনের শুরু হয়। শিঙার শব্দ শুনে স্টেডিয়ামের হাজার হাজার সমর্থক বসে পড়েন। এরপর একটি ড্রামের তালে ধীরে ধীরে শুরু হয় দাঁড় টানা। ড্রামের প্রতিটি বিটের সঙ্গে দর্শকরা শরীর সামনে-পেছনে দুলিয়ে কাল্পনিক দাঁড় টানেন এবং একযোগে ‘রো!’ বলে চিৎকার করেন। ড্রামের গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্যালারির গর্জন এমন উচ্চমাত্রায় পৌঁছায়, যা প্রতিপক্ষের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
‘ভাইকিং রো’-এর এই বিশাল জনপ্রিয়তা ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখেইমের ‘কালেকটিভ এফারভেসেন্স’ বা সামষ্টিক উচ্ছ্বাস তত্ত্বের এক নিখুঁত বাস্তব উদাহরণ। ডুরখেইমের মতে, যখন একদল মানুষ একসঙ্গে সমবেত হয়ে একই কাজে অংশগ্রহণ করে, তখন তাদের মধ্যে তীব্র আবেগীয় শক্তির সঞ্চার হয়, যা ব্যক্তিসত্তাকে ছাপিয়ে তাদের এক অখণ্ড শক্তিতে পরিণত করে। ক্রীড়া মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘পরিচয়ের একীভূতকরণ’ বলা যায়। গ্যালারিতে যখন হাজার হাজার মানুষ এক ছন্দে দাঁড় টানেন, তখন স্নায়ুতন্ত্রে এক গভীর ঐক্যের অনুভূতি সম্প্রচারিত হয়। এটি শুধু আর নিছক খেলা থাকে না, হয়ে ওঠে জাতীয় ঐক্যের এক নিখাদ প্রদর্শনী।
এই উদযাপন আজ কেবল নরওয়েজিয়ানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ার থেকে শুরু করে বোস্টনের সাবওয়ে, অসলোর রাজপথ থেকে সুদূর সিঙ্গাপুরের লন–সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে এই উন্মাদনা। নরওয়ের পার্লামেন্টের স্পিকার থেকে শুরু করে রাজপরিবারের সদস্য, এমনকি সামরিক বাহিনীর সদস্যরাও যোগ দিয়েছেন এই ‘ভাইকিং রো’-তে। যুদ্ধবিমানের ককপিট থেকে পাইলটরাও কাল্পনিক দাঁড় টানার ভিডিও প্রকাশ করেছেন।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপে নরওয়ের ‘ভাইকিং রো’ প্রমাণ করেছে, ফুটবল শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়। এটি এমন এক জাদুকরী মঞ্চ, যেখানে হাজার বছরের পুরোনো ইতিহাস চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে। আর্লিং হালান্ডরা সবুজগালিচায় যেমন প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করছেন, গ্যালারিতে তাদের সমর্থকরা তেমনি গোটা বিশ্বকে এক সুতোয় বাঁধছেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে ফল যা-ই হোক না কেন, এটি নিশ্চিত নরওয়ের সমর্থকরা এতে ক্লান্ত হবেন না।
- বিষয় :
- বিশ্বকাপ ফুটবল