ঢাকা শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬

স্মৃতির জাদুঘরে ফুটবল রূপকথা

স্মৃতির জাদুঘরে ফুটবল রূপকথা
×

সংগ্রাহক নাজমুল হক মন্টু

 শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

নাজমুল হক মন্টু। শৈশবের দেশলাই বাক্স থেকে শুরু করে প্রাচীনকালের মুদ্রা–সবখানেই তাঁর অবাধ বিচরণ। তবে তাঁর এই বিশাল সংগ্রহশালার একটি বিশেষ অংশজুড়ে রয়েছে ফুটবল। তাঁর সংগ্রহশালা যেন বাংলাদেশের বুকে বিশ্ব ফুটবলের এক জীবন্ত জাদুঘর...

সময়টা সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের। বাজারে তখনও বাংলাদেশি মুদ্রার পাশাপাশি পাকিস্তানি ও ভারতীয় মুদ্রা সচল। ৮-৯ বছরের ছোট্ট নাজমুল হক মন্টুর কাছে এই ভিন্ন ভিন্ন দেশের ধাতব চাকতিগুলো মনে হতো দারুণ বিস্ময়ের। ভালো লাগা থেকেই শুরু হলো জমানো। কেবল মুদ্রা নয়, খেলা শেষে দেশলাইয়ের নকশা করা বাক্স কিংবা ধূমপানের শলাকার খালি মোড়ক– সবই তিনি জমিয়ে রাখতেন। ১৯৭৭ সাল। পাবনায় আয়োজিত এক প্রদর্শনী বদলে দিল তাঁর জীবনের গতিপথ। সেখানে দুর্লভ মুদ্রা ও ডাকটিকিটের বিশাল সমাহার দেখে তরুণ নাজমুল হকের মনে হলো–তাঁর কাছেও তো এমন অমূল্য রত্ন আছে! ভাইয়ের উৎসাহে মনোযোগ দিলেন মুদ্রাতত্ত্বে। ১৯৮৯ সালে ঢাকায় থিতু হওয়ার পর তাঁর এই শখ পরিণত হলো এক অনন্য সাধনায়। ঢাকায় তখন ডাকটিকিট ও মুদ্রার বড় বড় সংগ্রাহকের ছড়াছড়ি। নিজেকে আলাদাভাবে চেনাতে তিনি বেছে নিলেন ‘ফিলুমেনি’ বা দেশলাই বাক্স সংগ্রহের পথ। তবে তাঁর নেশা কেবল সেখানেই থেমে থাকেনি। প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ডাকটিকিট, মুদ্রা এবং দেশলাই বাক্স–সংগ্রহের এই ত্রিমুখী ধারায় তিনি হয়ে উঠলেন দেশের অন্যতম পথিকৃৎ।

ধুলোপড়া চৌকির নিচে ফুটবলের প্রাণভোমরা
ফুটবল নিয়ে নাজমুল হকের কোনো একক বা সুনির্দিষ্ট সংগ্রহশালা না থাকলেও, তাঁর কাছে থাকা বিক্ষিপ্ত সামগ্রীগুলো যেকোনো ক্রীড়াপ্রেমীর চোখ কপালে তোলার জন্য যথেষ্ট। এর মধ্যে সবচেয়ে দুষ্প্রাপ্য বস্তুগুলোর একটি হলো পঞ্চাশ থেকে সত্তর দশকের ফুটবলের ভেতরে থাকা রাবারের ব্লাডার বা বায়ুথলি।
আধুনিক যুগে ফুটবল তৈরি হয় তাপীয় প্রযুক্তিতে। সেকালে চামড়ার প্যানেলগুলো ফিতা বা লেস দিয়ে সেলাই করা হতো আর ভেতরে থাকত রাবারের একটি বায়ুথলি; যার নলের ভেতর যন্ত্র ঢুকিয়ে বাতাস ভরে সেলাই আটকে দেওয়া হতো। পাকিস্তান, চীন বা ভারত থেকে আসা সেই বিলুপ্তপ্রায় বায়ুথলিগুলো এখন আর চোখে পড়ে না।
আশির দশকের শেষ বা নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকের কথা। ঢাকার চকবাজারে এক পুরোনো খেলনার দোকানে ধুলোয় ঢাকা কাঠের চৌকির নিচে এই বায়ুথলিগুলোর সন্ধান পান তিনি। এক বয়োজ্যেষ্ঠ দোকানি প্রথম দিন তা বিক্রি করতে নারাজ হলেও, নাজমুল হকের অদম্য আগ্রহের কাছে হার মানেন। ৫ টাকা দরে ১৪-১৫টি ব্লাডার কিনে নেন তিনি। দীর্ঘ ৩৫ বছরের ব্যবধানে পলিথিনে মোড়ানো সেই সংগ্রহগুলোর বেশ কয়েকটি আজ নষ্ট হয়ে গেলেও, অক্ষত থাকা দু-চারটি বায়ুথলি বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসের এক বিরল নিদর্শন।

কালির দোয়াতে ম্যারাডোনা
১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ। রঙিন টেলিভিশনের কল্যাণে দিয়েগো ম্যারাডোনা নামের এক জাদুকর যেন ঢুকে পড়লেন বাংলাদেশের প্রতিটি ড্রয়িংরুমে। ম্যারাডোনার সেই বিশ্বকাপ জয় এ দেশের মানুষের মনে এতটাই প্রভাব ফেলেছিল, বাণিজ্যিক সামগ্রীতেও তা রূপ নিতে শুরু করে। যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ নাজমুল হকের সংগ্রহে থাকা একটি কালির দোয়াত। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে কেরানীগঞ্জের ফুটপাত থেকে তাঁর এক পরিচিত ছেলে মাত্র ১০ টাকার বিনিময়ে কাচের দুটি দোয়াত কিনে আনেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দোয়াতের মোড়কে জ্বলজ্বল করছিল কিংবদন্তি ম্যারাডোনার ছবি! ঢাকার ‘ছাত্তার কেমিক্যাল ওয়ার্কস’ থেকে উৎপাদিত এই দোয়াতের গায়ে লেখা–‘ম্যারাডনা কালি, পার্মানেন্ট ব্লাক’। দোয়াতের কাগজের বাক্স থেকে শুরু করে ভেতরের ছিপি–সবখানেই বাংলায় লেখা ম্যারাডোনার নাম। নাজমুল হক জানান, বিশ্বে ফুটবলারদের নিয়ে ডাকটিকিট বা মুদ্রা হলেও, কালির দোয়াতে ম্যারাডোনার ছবি ব্যবহার–সম্ভবত বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও ঘটেনি!
এর আগে ১৯৮৩ সালে পাবনার এক প্রদর্শনীতে নাজমুল হক ব্রিটিশ আমলের সিরামিকের দুটি বিরল দোয়াত প্রদর্শন করেছিলেন, যা উল্টে গেলেও কালি পড়ত না। সেই দোয়াত সংগ্রহের নেশাই তাঁকে ম্যারাডোনা-দোয়াতের মতো এই অদ্ভুত সুন্দর জিনিসটির সন্ধান দেয়।
রহস্যময় রৌপ্যমুদ্রা
১৯৯১-৯৩ সালের দিকে সমমনাদের নিয়ে নাজমুল হক গড়ে তোলেন ‘নিউমিসম্যাটিক সোসাইটি’ কিন্তু তারা কেউই ঘুণাক্ষরেও জানতেন না, বাংলাদেশ থেকে ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে কোনো স্মারক মুদ্রা তৈরি হয়েছে।
একদিন চাঁদনীচক মার্কেটের এক সোনা-রুপার দোকানে পুরোনো মুদ্রার সন্ধানে গিয়ে তাঁর চোখ আটকে যায় একটি ধাতব চাকতিতে। সামনের অংশে বাংলাদেশের জাতীয় প্রতীক শাপলা আর নিচে লেখা ‘১৯৯৩’। সন্দেহ দূর করতে পেছনের অংশ দেখতেই তিনি চমকে ওঠেন। সেখানে ফুটবল খেলার নকশা এবং লেখা–‘ফুটবল ওয়ার্ল্ড কাপ ১৯৯৪, ওয়ান টাকা, বাংলাদেশ’। সাধারণ মেডেল বা পদকের সঙ্গে মুদ্রার মূল পার্থক্য হলো–এর চারধারের খাঁজকাটা দাগ। সেই দাগ দেখেই তিনি নিশ্চিত হন, এটি একটি আনুষ্ঠানিক মুদ্রা।
০.৯২৫ রৌপ্য দিয়ে তৈরি, ৩১.৪৭ গ্রাম ওজনের এবং ৩৮.৬১ মিলিমিটার ব্যাসের এ মুদ্রাটি দোকানির কাছ থেকে সে সময় ৬০০ টাকায় কিনে নেন তিনি। যদিও সে সময়ের সরকারি মূল্যমান অনুযায়ী এর দাম হওয়ার কথা ছিল এক হাজার ২৫০ টাকা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপ উপলক্ষে বাংলাদেশ সরকার এক বছর আগেই এ মুদ্রাটি প্রস্তুত করেছিল। সম্ভবত জার্মানিতে তৈরি হওয়া এ মুদ্রাটি অজানা কোনো কারণে শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয় বা দেশে ইস্যু করা হয়নি। বিদেশফেরত কারও হাত ঘুরে হয়তো সেটি সেই সোনার দোকানে এসে ঠেকেছিল। ২০০০ সালে ঢাকা জাদুঘরে আয়োজিত এক প্রদর্শনীতে নাজমুল হক এই বাতিল হওয়া ইতিহাসকে প্রথম দর্শকদের সামনে উন্মুক্ত করেন।

ডাকটিকিট, দেশলাই ও স্যুভেনিয়র শিটের গল্প
নাজমুল হকের সংগ্রহশালায় ফুটবলের উপস্থিতি কেবল মুদ্রা বা বায়ুথলিতেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশলাইয়ের বাক্সেও তিনি ধরে রেখেছেন ফুটবলের স্মৃতি। তাঁর সংগ্রহে রয়েছে যমুনা ম্যাচ ফ্যাক্টরির ‘সুপার স্টিক’, হিমালয়া কোম্পানির ‘স্পোর্টস বল’, ভাইয়া ম্যাচ কোম্পানির ‘ফুটবল নিরাপদ দেশলাই’ এবং আর. কে. ইন্ডাস্ট্রিজের ‘সুপার গোল্ড’ (যাতে বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফির ছবি রয়েছে)। নব্বইয়ের দশক থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত উৎপাদিত এই বাক্সগুলো এ দেশে ফুটবলের জনপ্রিয়তার এক নীরব প্রামাণ্যচিত্র।
অন্যদিকে ডাকটিকিটের সংগ্রহেও তিনি দারুণ সমৃদ্ধ। ১৯৭৬ সালের মন্ট্রিয়ল অলিম্পিকের ফুটবল ডাকটিকিট থেকে শুরু করে ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো, ১৯৯০ সালের ইতালি এবং ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপের বিশেষ ডাকটিকিট ও স্মারকপত্র তাঁর ভান্ডারে সযত্নে রক্ষিত।

১৯৯৪ সালে ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে যে ‘ফার্স্ট ডে কভার’ খাম বের করা হয়েছিল, সেটিও রয়েছে নাজমুল হকের সংগ্রহে। এ সংগ্রাহক জানান, বেশ কয়েকটি বিশ্বকাপের ডাকটিকিট এবং ফার্স্ট ডে কভার তাঁর কাছে রয়েছে। এগুলোর জন্য একটি স্পেশাল ক্যানসেলার বা বিশেষ সিল ব্যবহার করা হয়। এগুলো গাজীপুরের কাশিমপুরে অবস্থিত পোস্টাল প্রিন্টিং প্রেসে মুদ্রিত হয়। ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপ থেকে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা-মেক্সিকো বিশ্বকাপের স্যুভেনিয়র শিটও নাজমুল হকের সংগ্রহে রয়েছে। ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ উপলক্ষে রোনালদো, ম্যারাডোনা, নেইমারদের মতো কিংবদন্তিদের ছবিযুক্ত একটি বিশেষ ডাকটিকিট তিনি সংগ্রহ করেন ঢাকা জিপিও থেকে।
নাজমুল হক মন্টুর এই সংগ্রহশালা কেবল কিছু পুরোনো বস্তুর স্তূপ নয়; এটি এক গভীর আবেগ, অধ্যবসায় ও শিকড়ের প্রতি ভালোবাসার প্রতীক। যে সময়গুলো আমরা পার করে এসেছি, যে উন্মাদনায় একসময় কেঁপেছে গোটা দেশ–সেই ইতিহাসের পাতাগুলোই যেন পরম মমতায় মলাটবদ্ধ করে রেখেছেন এই সংগ্রাহক। তাঁর সংগ্রহে থাকা প্রতিটি বায়ুথলি, প্রতিটি মুদ্রা কিংবা কালির দোয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়–সময় ফুরিয়ে গেলেও, স্মৃতি হারিয়ে যায় না।

আরও পড়ুন

×