ইউনিলিভারের কালুরঘাট কারখানায় চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ছোঁয়া
কারখানায় এখন ‘কোবট’ (কোলাবরেটিভ রোবট) ব্যবহার করছে ইউনিলিভার বাংলাদেশ
হিল্লোল চৌধুরী
প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬ | ১৮:৫৪
বিশ্বজুড়ে শিল্প উৎপাদনের সংজ্ঞাই বদলে দিচ্ছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বা ‘ইন্ডাস্ট্রি ৪.০’। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস এবং রিয়েল-টাইম ডেটা অ্যানালিটিক্স এখন আর কেবল কল্পবিজ্ঞানের বিষয় বা তাত্ত্বিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং বৈশ্বিক ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে টিকে থাকার অন্যতম প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের লক্ষ্যও এখন এই ডিজিটাল রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করা। দেশের শিল্পখাত যখন ঠিক এমনই এক যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, তখন চট্টগ্রামের কালুরঘাটে অবস্থিত ইউনিলিভার বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কারখানা দেখাচ্ছে আগামীর পথ।
১৯৬৪ সালে যাত্রা শুরু করা এই কারখানাটি কেবল বাংলাদেশের শিল্পায়নের দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষীই নয়, বরং মানের দিক থেকে এটি একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এখানে উৎপাদিত পণ্য বিশ্বজুড়ে ইউনিলিভারের জন্য গুণমানের মানদণ্ড বা ‘গ্লোবাল বেঞ্চমার্ক’ হিসেবেও বিবেচিত হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। তবে বর্তমানের দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাস্তবতায় কালুরঘাট কারখানা আর অতীতের গৌরবেই আটকে নেই; বরং ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে আরও আধুনিক, স্বয়ংক্রিয় ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে।
ইউনিলিভার বাংলাদেশের এই কারখানার পরিচালক এস এম তারেক সাইফুল্লাহর মতে, এই প্রযুক্তিগত রূপান্তর এখন আর কোনো বিলাসী চিন্তা নয়, বরং সময়ের অনিবার্য দাবি। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের শিল্পখাতকে এখন ট্রান্সফরমেশনের মধ্য দিয়েই এগোতে হবে। ভবিষ্যতের ইন্ডাস্ট্রি হবে আরও বেশি ইন্টিগ্রেটেড, ডিজিটালি কানেক্টেড ও সাসটেইনেবল।’
উদাহরণ টানতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন ধরে কালুরঘাট ফ্যাক্টরিতে যে পদ্ধতিতে সাবান উৎপাদন হয়ে আসছিল, তা সফলভাবেই উৎপাদন কার্যক্রম সচল রেখেছে। তবে বর্তমানে বৈশ্বিক উৎপাদন প্রযুক্তিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে, যা উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি মান বৃদ্ধিতে সহায়ক।
তারেক সাইফুল্লাহ আরও বলেন, ‘সাবান এখন আর কোনো বিলাসপণ্য নয়, এটি মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই সাধারণ মানুষের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে সর্বোচ্চ মানের পণ্য পৌঁছে দেওয়াই আমাদের অন্যতম লক্ষ্য।’
এই বাস্তবতায় ইউনিলিভার বাংলাদেশ ফ্যাক্টরি ট্রান্সফরমেশনের মাধ্যমে স্মার্ট উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে।
ইউনিলিভারের বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ কমানোর যে দৃঢ় অঙ্গীকার রয়েছে, নতুন প্রযুক্তি সেই লক্ষ্য অর্জনের সঙ্গেও সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ। এর ফলে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ধাপ কমছে, কারখানার জায়গার আরও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে এবং সেই সঙ্গে জ্বালানি খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসছে। এটি কেবল প্রতিষ্ঠানের জন্য সাশ্রয়ী নয়, পরিবেশের জন্যও অত্যন্ত ইতিবাচক।
ইন্ডাস্ট্রি ৪.০-এর অন্যতম বড় লক্ষ্য হলো উৎপাদন সক্ষমতা বহুগুণে বাড়িয়ে তোলা। জানা গেছে, কালুরঘাট কারখানায় উন্নত অটোমেটেড বা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাটি পুরোপুরি চালু হলে উৎপাদনের চিত্র একেবারেই বদলে যাবে। বর্তমানে যেখানে একটি লাইনে প্রতি মিনিটে ১৮০টি পণ্য তৈরি হয়, নতুন সিস্টেমে তা বেড়ে দাঁড়াবে ৫৫০টিতে! অর্থাৎ, আগের তিনটি লাইনের সমান কাজ এখন একটি লাইন দিয়েই অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
তবে এই অটোমেশন বা ডিজিটালাইজেশন কেবল উৎপাদন বাড়ানোর প্রতিযোগিতাই নয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ভোক্তার জন্য বিশ্বমানের পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করা। তারেক সাইফুল্লাহ জানান, ‘হাই-লেভেল অটোমেশনের মাধ্যমে অনেক কম রিসোর্স ব্যবহার করে পণ্যের সেরা গুণগত মান নিশ্চিত করা যাবে।’
এই লক্ষ্য অর্জনে ইউনিলিভার বাংলাদেশ তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ইতোমধ্যেই যুক্ত করেছে ‘কোবট’ বা কোলাবোরেটিভ রোবট। কারখানার প্যাকিং, প্যালেটাইজিং এবং মান নিয়ন্ত্রণের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোতে এই স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়াকে করেছে আরও গতিশীল ও নির্ভুল। এই কোবট মানুষের পাশাপাশি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কাজ সম্পন্ন করে, যা বছরে প্রায় ৫০ হাজারেরও বেশি শ্রমঘণ্টা সাশ্রয় করতে সক্ষম।
ভবিষ্যতের স্মার্ট কারখানাগুলোর মূল শক্তি হবে তথ্য বা ডেটা ম্যানেজমেন্ট। অতীতে কোনো একটি প্রোডাকশন লাইনের ত্রুটি বা উৎপাদন ঘাটতি শনাক্ত করতে কয়েক দিন পর্যন্ত সময় লেগে যেত। তথ্য আদান-প্রদান আর যাচাই-বাছাইয়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণকে মন্থর করে দিত, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ত পুরো উৎপাদন ব্যবস্থায়। কিন্তু কালুরঘাটের বর্তমান ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেমে এই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডে এখন সরাসরি দেখা যায় মেশিনের পারফরম্যান্স এবং গুণগত মান।
এ প্রসঙ্গে তারেক সাইফুল্লাহ বলেন, ‘এখন আমরা লাইনে দাঁড়িয়ে লাইভ দেখতে পারছি কোথায় সিস্টেম লস হচ্ছে। ফলে যে কোনো সমস্যা সমাধানে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে।’
এই আধুনিক সিস্টেমের মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের ইউনিলিভার ফ্যাক্টরির সঙ্গে কালুরঘাটের দক্ষতার সরাসরি তুলনা বা ‘গ্লোবাল বেঞ্চমার্কিং’ করা সম্ভব হচ্ছে। এটি কেবল বর্তমানের উৎপাদনকেই গতিশীল করছে না; বরং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়নেও দারুণভাবে সহায়তা করছে।
তবে প্রযুক্তির এই দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে কিছুটা বাস্তবসম্মত সংশয় প্রকাশ করেন তারেক সাইফুল্লাহ। তাঁর মতে, টেলকো বা ইলেকট্রনিক্স খাতের মতো নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্র আধুনিক হলেও দেশের নিত্যব্যবহার্য ও ভোগ্যপণ্য (এফএমসিজি) উৎপাদন খাত এখনো পুরোপুরি সমন্বিত কার্যক্রমে পৌঁছাতে পারেনি।
শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের বর্তমান ব্যবধান কমিয়ে আনাকেই তিনি এই পরিবর্তনের প্রধান নিয়ামক হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি। ভবিষ্যতের কারখানায় মানুষের ভূমিকা আর কেবল কায়িক শ্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা হবে আরও বেশি বিশ্লেষণধর্মী, জ্ঞানভিত্তিক এবং সমস্যা সমাধানে পারদর্শী।’ বাংলাদেশে এখনো এ ধরনের প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ জনবলের বড় চাহিদারই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
তরুণ প্রকৌশলীদের উদ্দেশ্যে তারেক সাইফুল্লাহর বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট– মৌলিক জ্ঞানের কোনো বিকল্প নেই। অটোমেশন কিংবা ডেটা অ্যানালিটিক্স যাই হোক না কেন, প্রকৌশলবিদ্যার বেসিক জ্ঞান ছাড়া এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো সম্ভব নয়। তাঁর মতে, একজন প্রকৌশলীর জন্য কারখানা হলো এমন একটি জায়গা, যেখানে তাত্ত্বিক জ্ঞান বাস্তব অভিজ্ঞতায় রূপ নেয় এবং দক্ষতা শানিত হয়।
বাংলাদেশের শিল্পখাত যদি আধুনিক প্রযুক্তি, পেশাগত দক্ষতা এবং টেকসই উন্নয়নকে একসূত্রে গাঁথতে পারে, তবেই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুফল ঘরে তোলা সম্ভব হবে। আগামীর শিল্পব্যবস্থা হবে বুদ্ধিদীপ্ত প্রযুক্তি ও দক্ষ মানুষের এক অসাধারণ সমন্বয়ে গড়ে ওঠা নতুন বাস্তবতা। আর কালুরঘাট কারখানার এই চলমান রূপান্তর সেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনেরই এক উজ্জ্বল প্রতিফলন।
- বিষয় :
- হিল্লোল চৌধুরী
- ইউনিলিভার বাংলাদেশ
