পরিবেশবান্ধব পাঠশালা
পাহাড়িয়াপাড়া গ্রামের শিশুদের মাঝে ‘আগামীর স্কুল’ যেন এক বাতিঘর
ইমতিয়াজ আহমেদ
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ০৬:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার একেবারে প্রান্তিক একটি অজপাড়াগাঁ পাহাড়িয়াপাড়া। সারি সারি তালগাছ আর দিগন্তবিস্তৃত সবুজের প্রান্তর পেরিয়ে এই গ্রামে পা রাখলেই মনে হবে, গ্রামীণ মানুষের দৈনন্দিন যাপিত জীবনের চিরচেনা রূপ এখানে স্পষ্ট। কয়েকদিনের টানা বর্ষণে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাজার থেকে গ্রাম পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার পথ সম্পূর্ণ কাঁচা। বৃষ্টির পানিতে ভিজে সেই লাল মাটির মেঠোপথ এতটাই কর্দমাক্ত হয়ে উঠেছে, কোনো যানবাহন তো দূর, হেঁটে পথ চলাও একরকম দুঃসাধ্য ব্যাপার। কিছুটা পথ পেরোতেই চোখে পড়ল একটি সরু জলাশয়। পথেই দেখা মিলল এক মধ্যবয়সী কৃষকের। মাথায় কাঁঠালের ভারী বোঝা নিয়ে তিনি হাটের দিকে ছুটে চলেছেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করতেই জানালেন–‘এই গেরামে তো কুনো ইস্কুল নাই, তয় মাটির ইস্কুল আছে একটা আখালিয়া বিলের ওই পারে। তাও এক থেইকা দেড় মাইলের রাস্তা।’ বাঁশঝাড় আর বিলের ধার ধরে এগোতেই আচমকা দূর থেকে ভেসে এলো সমবেত শিশুকণ্ঠ। কাছে যেতেই স্পষ্ট হলো, পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের ‘মামার বাড়ি’ কবিতার সুমধুর আবৃত্তি চলছে। কবিতার ছন্দ ধরে এগোতেই চোখের সামনে ফুটে উঠল এক মায়াময় দৃশ্য। খোলা মাঠে কানামাছিসহ বিভিন্ন গ্রামীণ খেলায় আনন্দে মেতেছে একঝাঁক শিশু, যেন একঝাঁক লাল প্রজাপতি উড়ছে। চারপাশ সবুজে ঘেরা, ছায়াসুনিবিড় কয়েকটি মাটির ঘর। জানলাম, এ মাটির ঘরটিই পাহাড়িয়াপাড়া গ্রামের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান–‘আগামীর স্কুল’।
শ্রেণিকক্ষে বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার কোনো দুশ্চিন্তা নেই। সূর্যের স্নিগ্ধ আলো আর আখালিয়া নদীর বুক চিরে আসা হিমেল হাওয়ার পরশে মাটির ঘরে বসে গভীর মনোযোগে পাঠ নিচ্ছে শিশুরা। তাদেরই একজন তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদিয়া আক্তার। আশপাশের প্রায় দুই থেকে আড়াই কিলোমিটারের মধ্যে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় সাদিয়ার মতো অনেক শিশুরই শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। বিশেষ করে ছোট শিশু ও মেয়েদের বড় একটি অংশ দেরিতে বিদ্যালয়ে ভর্তি হতো বা একেবারেই যেত না। ফলে গ্রামের সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ৩ শতাংশের কাছাকাছি। সেই গ্রামে ‘গ্রো ইয়োর রিডার
ফাউন্ডেশন’–একদল স্থানীয় তরুণ এবং গ্রামবাসীর যৌথ উদ্যোগে ২০২৪ সালে জোনাকির মতো আলো জ্বেলেছে এই বিদ্যালয়।
ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাদিয়া জাফরিন জানান, পাহাড়িয়াপাড়ার মতো নদী-তীরবর্তী গ্রামে গ্রামবাসীর নিজস্ব উদ্যোগে নির্মিত এই মাটির বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিনের শিক্ষাগত বাধা দূর করেছে। এটি এখন জলবায়ুসহনশীল ও স্থানীয় সংস্কৃতিনির্ভর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠছে। তিনি জানান, প্রায় দুই বছর আগে গ্রামবাসীরা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষা নিয়ে কাজ করা এই সংস্থাটির সঙ্গে যোগাযোগ করে। বাইরে থেকে কোনো সমাধান না চাপিয়ে, সংস্থাটি প্রথমে স্থানীয়দের অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্য বোঝার চেষ্টা করে। আধুনিকতার মোহে টিন ও ইটের ঘরের দিকে ঝুঁকতে গিয়ে মাটির ঘরকে অনেকেই দারিদ্র্যের প্রতীক ভাবতেন। ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে তারা উপলব্ধি করেন, মাটির নির্মাণ পদ্ধতি পরিবেশবান্ধব, আবহাওয়া-উপযোগী এবং স্থানীয় ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
গ্রামের তরুণ শিক্ষক সেলিম আহমেদ, সুমন মিয়া ও রেহানা আক্তার পড়াশোনার পাশাপাশি একসময় বিভিন্ন জায়গায় চাকরি করতেন। নাড়ির টানে তাদের মন পড়ে থাকত নিজ গ্রামে। অনলাইনে একটি বেসরকারি সংস্থার স্কুল দেখে তারা অনুপ্রাণিত হন এবং পাহাড়িয়াপাড়ায় এমন একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। শিক্ষক সেলিম বলেন, ‘সবার সঙ্গে আলোচনা করে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে। ফলে শিশুদের আর শিক্ষার আলো থেকে ঝরে পড়তে হয় না। স্বল্প বেতনে ঘরের কাছে প্রাকৃতিক পরিবেশে বাচ্চাদের পড়তে দিয়ে অভিভাবকরাও আজ অনেকটা নিশ্চিন্ত।’
স্থপতি সংস্থা ‘পারসিভড’-এর নকশায় স্থানীয় সহজলভ্য মাটি, বাঁশ ও গ্রামবাসীর দেওয়া জমিতে সম্মিলিত শ্রমে নির্মিত হয়েছে এ বিদ্যালয়। এর নেতৃত্বে ছিলেন ৮০ বছর বয়সী প্রবীণ কারিগর গফুর মিয়া। তাঁর তত্ত্বাবধানে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী নির্মাণশৈলী শিখে তরুণরাও কাজে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। শুধু ভবন নয়, ইউনেস্কোর ‘পরিবেশবান্ধব শিক্ষা নির্দেশিকা’ অনুযায়ী এখানে একটি জলবায়ুকেন্দ্রিক পাঠ্যক্রম তৈরি করা হয়েছে।
আনন্দময় শিক্ষার জন্য শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে বলে জানান ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ কর্মসূচি সহযোগী নুসরাত জাহান প্রিয়া। দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদিয়া, মনিরা ও ছোটন জানায়, এই স্কুলে গরম লাগে না এবং ছুটির পর খোলা মাঠে তারা খুব আনন্দে খেলে। ৭৫ জন শিক্ষার্থীর এই বিদ্যালয়ে রয়েছে চার শতাধিক বইসমৃদ্ধ ‘স্কোয়াড্রন লিডার শাফায়াত স্মৃতি গ্রন্থাগার’, যেখানে গল্প-কবিতার বই পড়ে শিশুদের সময় কাটে।
উদ্যোক্তারা জানান, এই উদ্যোগে নির্মাণ ব্যয় কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ। এড়ানো গেছে প্রায় দুই হাজার টন কার্বন নিঃসরণ। এ ছাড়া ভেতরের তাপমাত্রা বাইরের চেয়ে প্রায় তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস কম থাকে এবং আর্দ্রতাও তুলনামূলক কম। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে সংস্থাটি পাহাড়িয়াপাড়ায় পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময় সফরেরও আয়োজন করছে; যার মাধ্যমে আগ্রহীরা স্থানীয়দের শক্তি ও ঐতিহ্য গভীরভাবে জানার সুযোগ পাচ্ছেন।
- বিষয় :
- পরিবেশ
