রক্তে গড়া সম্পর্ক
শাহেরীন আরাফাত
প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬ | ০৭:১১ | আপডেট: ১৩ জুন ২০২৬ | ১৬:০৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক সাধারণত জন্মসূত্র, রক্তের ধাতরা, বন্ধুত্ব কিংবা বৈবাহিক কারণে তৈরি হয়। তবে পৃথিবীতে এমন এক অদ্ভুত ও পবিত্র সম্পর্ক রয়েছে, যার ভিত্তি কেবলই মানবিকতা। সম্পূর্ণ অচেনা ও অপরিচিত একজন মানুষের ধমনিতে যখন আরেকজনের রক্ত প্রবাহিত হয়, তখন সৃষ্টি হয় এক অদৃশ্য আত্মিক বন্ধন। ১৪ জুন বিশ্ব রক্তদাতা দিবস। এদিনটি সেসব নীরব প্রাণরক্ষাকারীর প্রতি সম্মান জানানোর দিন, যাদের নিঃস্বার্থ দানে বেঁচে যায় অসংখ্য মুমূর্ষু প্রাণ।
কয়েকদিন আগের কথা। রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে প্রসবকালীন জটিলতায় এক মায়ের জীবন সংকটাপন্ন। জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন ‘এ নেগেটিভ’ রক্ত। এই গ্রুপের রক্ত পাওয়া যাচ্ছিল না। পরিচিত যিনি রক্ত দিতে পারতেন, তিনি ঈদের ছুটিতে ঢাকার বাইরে রয়েছেন। আত্মীয়স্বজন দিশেহারা হয়ে পড়েন। ঠিক সেই মুহূর্তে মুষলধারে বৃষ্টি উপেক্ষা করে ছুটে এলেন ২২ বছরের তরুণ জাহিদ। তিনি জানেন না ওই নারীর পরিচয়, ফেসবুকে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি রক্তদাতা গ্রুপের মাধ্যমে জানতে পেরে তিনি ফোনে যোগাযোগ করেন এবং দ্রুততার সঙ্গে হাসপাতালে উপস্থিত হন। নারীটিও কখনও দেখেননি তাঁকে। অথচ জাহিদের দেওয়া রক্তই সেদিন এক মা ও সন্তানের প্রাণ বাঁচাতে প্রধান ভূমিকা রেখেছিল। বাংলাদেশে এমন ঘটনা এখন আর বিরল নয়। প্রতিদিন সামাজিক মাধ্যম বা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর আহ্বানে সাড়া দিয়ে অসংখ্য মানুষ এভাবেই অন্যের জীবন বাঁচাতে ছুটে যান।
আরেকটি গল্পের দিকে তাকানো যাক। সাত বছরের ছোট্ট শিশু মারিসা। বংশগত রক্তস্বল্পতা বা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ায় প্রতি মাসে তার শরীরে নতুন রক্ত দিতে হয়। তার বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা রক্তদাতারা। মারিসার মা-বাবার কাছে ওই নিয়মিত রক্তদাতারা এখন আর কেউ অচেনা নন, তারা যেন পরিবারেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। রক্তের এই আদান-প্রদান যেন এক অলৌকিক সুতোয় বেঁধে দিয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কয়েকটি পরিবারকে। এটি কেবল চিকিৎসা পদ্ধতি নয়, এটি আত্মার আত্মীয় হয়ে ওঠার এক অনন্য উদাহরণ।
তেমনি এক ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলেন ময়মনসিংহের ব্যবসায়ী সাদেকুর রহমান। অসুস্থ মেয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ‘ও নেগেটিভ’ রক্তের। অপরিচিত এক রিকশাচালক হামিদের রক্তে তাঁর আদরের সন্তান সুস্থ হয়ে ওঠে। সেদিন এই রক্তদাতা গ্রুপের ফোন পেয়েই হাসপাতালে উপস্থিত হন হামিদ। তিনি জানান, এবারই প্রথম নয়, এর আগে অন্তত ২০ বার তিনি রক্তদান করেছেন। সারাদিন রিকশা চালিয়ে ক্লান্ত শরীরেও তিনি রক্ত দিতে দ্বিধা করেন না। বিনিময়ে কেউ টাকা দিতে চাইলে তিনি বিনয়ের সঙ্গে তা ফিরিয়ে দেন। তিনি বলেন, ‘আমারও ছোট একটা মেয়ে আছে। সবার বাচ্চাই নিজের কাছে দামি আর আমি গতর খাটাই। রক্ত বেচা পাপ। টাকা নেওয়া যাইব না।’
তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমাদের দেশে প্রতিবছর প্রায় আট থেকে দশ লাখ মানুষের রক্তের প্রয়োজন হয়। একসময় এ চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হতো। এখন স্বেচ্ছায় রক্তদানের মাধ্যমে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এগিয়ে আসছেন। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগেও সাধারণ মানুষকে রক্তদানে উৎসাহিত করা হচ্ছে; যার ফলে দেশে স্বেচ্ছায় রক্তদানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।
