উপকূলের গ্রামীণ জনপদে জনপ্রিয় জ্বালানি ‘গৈঠা’
মুফতী সালাহউদ্দিন, পটুয়াখালী
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ০৮:০৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
পটুয়াখালীর দক্ষিণ উপকূলে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে গবাদি পশুর বিষ্ঠা দিয়ে তৈরি ‘গৈঠা’। এটি এখন গ্রামীণ জনপদে বেশ জনপ্রিয় জ্বালানি। দিন দিন বাড়ছে এর চাহিদা। গ্রামের প্রতিটি বাড়িঘরে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে এটি। কেউ কেউ বাণিজ্যিকভাবে গৈঠা বিক্রি শুরু করেছেন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পরিবেশবান্ধব এ জ্বালানি হতে পারে দক্ষিণ উপকূলের অর্থনৈতিক চালিকা শক্তি।
জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, পটুয়াখালী জেলায় গবাদি পশুর সংখ্যা ১০ লাখ ৮৭ হাজার ১৮৭টি। এর মধ্যে গরু ৯ লাখ ৮৮ হাজার ৮৭টি, মহিষ ৯৯ হাজার ১০০টি। এসব পশুর মধ্যে গড়ে ২৫ শতাংশ রয়েছে বাছুর। গড়ে প্রতিদিন একটি বাছুর ৫ কেজি এবং প্রাপ্তবয়স্ক গবাদি পশু ৮ কেজি বিষ্ঠা ত্যাগ করে। সে হিসাবে ২ লাখ ৭১ হাজার ৭৯৭টি বাছুর প্রতিদিন ১ হাজার ৩৫৯ টন বিষ্ঠা ত্যাগ করে। আর ৮ লাখ ১৫ হাজার ৩৯০টি প্রাপ্তবয়স্ক গবাদি পশু প্রতিদিন বিষ্ঠা ত্যাগ করে ৬ হাজার ৫২৩ টন। সব মিলিয়ে জেলায় প্রতিদিন গোবর আসে ৭ হাজার ৮৮২ টন। প্রতি মাসে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৪৬৩ টন; বছরে ২৮ লাখ ৩৭ হাজার ৫৫৭ টন গোবর উৎপাদন হচ্ছে।
এই দক্ষিণ জনপদে গৈঠা তৈরির পদ্ধতি চালু হয়েছে ১০০ বছর আগে। বাড়ির ঝি-বউরা খড়-পাটকাঠিতে গোবর মিশিয়ে ছোট ছোট গোলাকৃতির গৈঠা তৈরি করে রোদে শুকিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেন। এটি রান্নার কাজে সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য জ্বালানি। এ ছাড়া এই গোবর গ্রামাঞ্চলের মাটির ঘরের দেয়াল লেপন (প্লাস্টার) করার কাজেও লাগে।
গৈঠা তৈরির কারিগররা জানান, গ্রামে বাড়ির রান্নার জন্য পাটকাঠির পাশাপাশি জ্বালানি হিসেবে এর কদর রয়েছে। প্রথম দিকে বাণিজ্যিকভাবে গৈঠা বিক্রি না হলেও স্থানীয়ভাবে এটি বিক্রি করছেন গ্রামের নারীরা। কেউ কেউ রান্নার কাজে ব্যবহারের জন্য নিজেরাই তৈরি করছেন এই জ্বালানি। অগ্রহায়ণের শুরু থেকে গৈঠা বানানো শুরু হয়ে চলে চৈত্র মাস পর্যন্ত।
কলাপাড়ার নীলগঞ্জ এলাকার শিখা রানী বলেন, ‘শীত মৌসুমে গরু-মহিষের গোবর দিয়ে গৈঠা করে রাখি, পরে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করি। এই মৌসুমে যদি গৈঠা তৈরি করতে পারি তাহলে বর্ষায় এটি দিয়ে চুলায় ভালোভাবে রান্না করা যায়। এ ছাড়া গৈঠায় ধোঁয়া বা চোখের ক্ষতি হয় না। এটা রান্নার জন্য পরিবেশবান্ধব জ্বালানি।’
একই উপজেলার পাখিমারা এলাকার অমল চন্দ্র ব্যাপারী বলেন, ‘গৈঠা দিয়ে ঘরের রান্না, ধান সিদ্ধসহ সব কাজ করা যায়। গোবর বস্তাপ্রতি ৩০-৪০ টাকা দরে কিনে গৈঠা তৈরি করে কেউ কেউ বিক্রিও করেন।’ রাঙ্গাবালীর চালিতাবুনিয়া এলাকার মাকসুদা বেগম বলেন, ‘গৈঠা চুলায় গ্যাসের মতো আস্তে আস্তে জ্বলতে থাকে।’
এ ব্যাপারে পটুয়াখালী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘গৈঠা পরিবেশবান্ধব ও খরচ কম।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মোহাম্মদ আমানুল ইসলাম বলেন, ‘এই গোবর দিয়ে জৈব সার করলে আরও লাভবান হতো মানুষ।’
- বিষয় :
- উপকূল
