পরিবেশ রক্ষায় নাগরিককে সরাসরি মামলার অধিকার দেওয়ার দাবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ০৮:০৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
মাটির উর্বরাশক্তি কমে যাচ্ছে, নদী-নালা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্য। এর পাশাপাশি বায়ু ও শব্দদূষণের কারণে মানুষের পাশাপাশি অন্যান্য প্রাণীরও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, পরিবেশ দূষণ এখন শুধু প্রকৃতির নয়, মানুষেরও অস্তিত্ব সংকট তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে পরিবেশ রক্ষায় সাধারণ নাগরিককে সরাসরি মামলা করার অধিকার দেওয়া এবং বিদ্যমান আইন যুগোপযোগী করার দাবি জানিয়েছেন গবেষক ও পরিবেশবিদরা। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত ‘অস্তিত্বের সংকটে প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ: উত্তরণের উপায় অনুসন্ধান’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়। আয়োজন করে প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষা জাতীয় কমিটি।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, নগর এলাকায় জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ ও অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে গ্রামীণ এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার, নদীভাঙন ও লবণাক্ততা বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে নদ-নদীর সংখ্যা, আয়তন, গভীরতা ও সীমানা-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ এবং জলাশয় দখল ও দূষণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের তালিকা জনসমক্ষে আনার দাবি জানান তিনি।
লেখক ও নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, বাংলাদেশে নদীর প্রকৃত সংখ্যা নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে। তাঁর গবেষণায় নদী পাওয়া গেছে ২ হাজার ৪২০টি, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের হিসাবে যা ১ হাজার ৮টি এবং অন্য এক প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ১ হাজার ৪১৩টি। তিনি বলেন, নদীর সুনির্দিষ্ট তালিকা না থাকায় দখলদাররা সুযোগ পাচ্ছে। এমনকি প্রভাব খাটিয়ে নদী নিজের নামে করে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
প্রাকৃতিক কৃষিগবেষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, দেশের ৫৬ শতাংশ মাটি অম্লীয় হয়ে গেছে। মাটিতে জিংক, ক্যালসিয়ামসহ প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদানের ঘাটতি রয়েছে। প্রতি বছর প্রায় ৬০ লাখ টন রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে মাটির ওপরের উর্বর স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব খাদ্যশস্যের পুষ্টিমানেও পড়ছে। মাটিতে পুষ্টি না থাকায় ফল ও সবজির স্বাদ কমে যাচ্ছে।
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, বায়ু ও শব্দদূষণের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। দূষণের কারণে মানুষের গড় আয়ু প্রায় ছয় বছর পর্যন্ত কমে যাচ্ছে। বর্তমান মাত্রার শব্দদূষণ অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বিপুলসংখ্যক মানুষ শ্রবণপ্রতিবন্ধিতার ঝুঁকিতে পড়বে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ আলী বলেন, ইলিশের অভয়াশ্রমসংলগ্ন এলাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প গড়ে তোলার ফলে মাছের প্রজননক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নদীতে শিল্পবর্জ্য ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য ফেলায় পানির গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে, কমে যাচ্ছে মাছের খাদ্য। ফলে ইলিশসহ দেশীয় মাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির অধ্যাপক সবুর আহমেদ বলেন, খাদ্য ও মাটিতে ভারী ধাতুর উপস্থিতি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরিয়ে নেওয়ার পরও দূষণের বোঝা বহন করছে দেশের বিভিন্ন নদী।
এ সময় বক্তারা আরও বলেন, দেশে পরিবেশ সুরক্ষায় প্রায় ২০০ আইন ও বিধান থাকলেও সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগ নেই। শিল্পবর্জ্য, রাসায়নিক দূষণ, নদী দখল ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে পরিবেশগত সংকট আরও গভীর হবে। এজন্য পরিবেশ আইন সংস্কার, নাগরিকদের মামলা করার অধিকার নিশ্চিত করা এবং পরিবেশবিষয়ক আইনের কঠোর বাস্তবায়ন করতে হবে।
এতে সভাপতিত্ব করেন প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষা জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর ৫৫ বছরে দেশের প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশ ক্রমেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অথচ কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও বড় মূল্য দিতে হবে।
- বিষয় :
- পরিবেশ
