আকাশের ‘নীরব ঘাতক’ বজ্রপাত
ছবি: মীর সাদি
লাবণী মণ্ডল
প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬ | ০৭:২৮ | আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ১৯:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের দুর্যোগের ইতিহাসে বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের কথা যতটা গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হয়, ‘বজ্রপাত’ ঠিক ততটাই অবহেলিত থেকে গেছে দীর্ঘকাল। অথচ পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। বর্তমানে দেশের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগের নাম বজ্রপাত। বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের চেয়েও প্রতিবছর এই ‘নীরব ঘাতকে’র আঘাতে বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। বিশেষ করে উন্মুক্ত স্থানে কাজ করা গ্রামীণ কৃষক ও মৎস্যজীবীদের জন্য এটি এখন এক আতঙ্কের নাম।
গত ২১ ডিসেম্বর ঢাকায় আয়োজিত প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের (বিএমডি) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক গবেষণার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এই ভয়াবহ চিত্র এবং তা মোকাবিলায় করণীয় বিষয়গুলো উঠে এসেছে। অনুষ্ঠানে নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়েছেন এমন এক সতর্কবার্তা ব্যবস্থার ওপর, যা শুধু বিজ্ঞানের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পৌঁছে যাবে গ্রামের শেষ প্রান্তের মানুষটির কাছে।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল–এই দেড় দশকে বাংলাদেশে বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় দুই হাজার মানুষ, আর আহত হয়েছেন এক হাজার তিনশরও বেশি। যদিও ২০১৬ সালে সরকার বজ্রপাতকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, তবুও মৃত্যুর মিছিল থামানো যাচ্ছে না। গবেষণায় দেখা গেছে, বজ্রপাতের সবচেয়ে বড় শিকার সুনামগঞ্জের মতো হাওর অঞ্চলের মানুষ। বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ, জলাভূমি এবং আশ্রয়ের অভাব এই অঞ্চলগুলোকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছে। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, এই দুর্যোগের শিকার মূলত সেই খেটে খাওয়া মানুষগুলো, যারা দেশের খাদ্যের জোগান দেন। কিন্তু দুর্বল অবকাঠামো, শিক্ষার অভাব এবং সঠিক সময়ে তথ্য না পাওয়ার কারণে তারা অরক্ষিত থেকে যাচ্ছেন। নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বহুগুণ বেশি।
বজ্রপাত মোকাবিলায় বড় বাধাটি হলো ‘তথ্যের ঘাটতি’ এবং ‘যোগাযোগের বিচ্ছিন্নতা’। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর স্যাটেলাইট তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পূর্বাভাস দেয় ঠিকই, কিন্তু মাঠ পর্যায়ে সেই তথ্যের বাস্তবিক প্রয়োগ নগণ্য।
জরিপকৃত পরিবারগুলোর অর্ধেকেরও বেশি মানুষের বজ্রপাতে স্বজন হারানো বা আহত হওয়ার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে। অথচ ৫৪.৮ শতাংশ মানুষ স্থানীয় আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে শুনেছেন। আরও ভয়ের তথ্য হলো, প্রায় ৭৭ শতাংশ মানুষ জানেই না যে সতর্কবার্তা পাওয়ার পর তাদের হাতে কতটুকু সময় আছে। ৯৬ শতাংশ উত্তরদাতা জীবনে কখনও বজ্রপাত-বিষয়ক কোনো মহড়ায় অংশ নেননি।
বর্তমানে সতর্কবার্তাগুলো যেভাবে প্রচার করা হয়, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয়। প্রমিত বাংলা বা ইংরেজিতে দেওয়া যান্ত্রিক বার্তা, অতিরিক্ত প্রযুক্তিগত ভাষা এবং সুনির্দিষ্ট এলাকার বদলে সাধারণ ঝড়ের সতর্কতার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ায় মানুষ বিভ্রান্ত হয়। ফলে আকাশের কালো মেঘ দেখে তারা যতটা না ভয় পান, আবহাওয়া অফিসের বার্তায় ততটা আস্থা পান না। এই সংকট মোকাবিলায় গবেষণায় যে সমাধানের কথা বলা হয়েছে তা হলো, ‘কমিউনিটিবেজড লাইটনিং আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’ (সিবি-লিউজ) বা সমাজভিত্তিক বজ্রপাত আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা। এর মূল দর্শন হলো, শুধু উচ্চতর বিজ্ঞান দিয়ে মানুষের প্রাণ বাঁচানো যাবে না, যদি না সেই বিজ্ঞানকে স্থানীয় মানুষের জ্ঞান ও অভ্যাসের সঙ্গে যুক্ত করা যায়। সিবি-লিউজ মডেলটি মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে–
১. প্রযুক্তিগত উন্নয়ন: বর্তমানে স্যাটেলাইট নির্ভরতার পাশাপাশি ভূমিতে অবস্থিত ‘রিয়েল-টাইম লাইটনিং ডিটেকশন নেটওয়ার্ক’ স্থাপন করা। এর ফলে ২০-৩০ মিনিট আগেই সুনির্দিষ্ট এলাকার জন্য সতর্কবার্তা দেওয়া সম্ভব হবে।
২. সহজ ও স্থানীয় যোগাযোগ: সতর্কবার্তা হতে হবে স্থানীয় ভাষায় এবং সহজবোধ্য। সাইরেন, মসজিদের মাইক এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে এই বার্তা প্রচার করতে হবে। মোবাইলের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে স্কুল, বাজার বা জনসমাগমস্থলে ভিজুয়াল বোর্ড বা পতাকার ব্যবহার কার্যকর হতে পারে।
৩. কমিউনিটি প্রস্তুতি: স্থানীয় জ্ঞান (যেমন আকাশের রং বা বাতাসের ধরন বোঝা) এবং বৈজ্ঞানিক তথ্যের সমন্বয় ঘটানো। নিয়মিত মহড়া আয়োজন এবং স্কুল পাঠ্যক্রমে বজ্রপাত নিরাপত্তার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা।
বজ্রপাত শুধু বাংলাদেশের একার সমস্যা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের সঙ্গে সম্পর্কিত। অনুষ্ঠানে নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হ্যাকন অ্যারাল্ড গুলব্র্যান্ডসেন এবং ইউরোপীয় সিভিল প্রটেকশন অ্যান্ড হিউম্যানিটারিয়ান এইড অপারেশনসের (ইকো) প্রতিনিধি মোকিত বিল্লাহ দুর্যোগ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও টেকসই বিনিয়োগের ওপর জোর দেন। তাদের মতে, আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা তখনই সফল হবে, যখন তা সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া বা ঝুঁকিপূর্ণ মানুষটির কাছে পৌঁছাবে।
- বিষয় :
- বজ্রপাত
- লাবণী মণ্ডল
