ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

গারো পাহাড়ের ‘বুনো বন্ধু’

গারো পাহাড়ের ‘বুনো বন্ধু’
×

কোনো রকম আঘাত ছাড়াই শুধু নির্দিষ্ট মাত্রার শব্দ বা আগুন দেখিয়ে হাতিকে নিরাপদে বনে ফেরানো সম্ভব। ইনসেটে কাঞ্চন মারাক

আশরাফুল ইসলাম আকাশ

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ | ০৭:২১ | আপডেট: ১০ মে ২০২৬ | ১৬:৫২

| প্রিন্ট সংস্করণ

শেরপুরের সীমান্তঘেঁষা গারো পাহাড়। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে মাঝে মাঝেই এখানে নেমে আসে বুনো হাতির পাল। একদিকে মানুষের ফসল ও ঘরবাড়ি বাঁচানোর তাগিদ, অন্যদিকে আবাসস্থল হারানো ক্ষুধার্ত হাতির টিকে থাকার সংগ্রাম–সব মিলিয়ে এই অঞ্চলে মানুষ আর হাতির দ্বন্দ্ব এখন এক নিত্যনৈমিত্তিক ট্র্যাজেডি। তবে সংঘাতের এই বারুদে এক পশলা শান্তির বৃষ্টির মতো কাজ করে যাচ্ছেন কাঞ্চন মারাক–শেরপুর সীমান্তের এক অদম্য গারো তরুণ।

গারো পাহাড়ের এই অংশে হাতির আনাগোনা চিরকাল ছিল না। কাঞ্চন মারাকের স্মৃতি এবং স্থানীয় প্রবীণদের বয়ান অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি, বিশেষ করে ১৯৯৫-৯৭ সালের দিকে এই অঞ্চলে হাতির উপস্থিতি দৃশ্যমান হতে শুরু করে। তাঁর আগের প্রজন্মের কাছে এই এলাকায় হাতির স্থায়ী বসবাসের কোনো স্পষ্ট স্মৃতি নেই।

সেই ছোটবেলা থেকেই হাতির চলাচল, আচরণ এবং হাতির প্রতি মানুষের তীব্র প্রতিক্রিয়া খুব কাছ থেকে দেখেছেন কাঞ্চন। সময়ের পরিক্রমায় বনভূমি উজাড় এবং হাতির চলাচলের পথ (এলিফ্যান্ট করিডোর) সংকুচিত হওয়ায় তা ব্যাপক রূপ নিয়েছে। দীর্ঘ দুই দশকের এই দ্বন্দ্বে যেমন বহু মানুষের প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি হয়েছে, তেমনি নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছে বহু হাতি। এই বাস্তবতায় ২০২৩ সালে তিনি গড়ে তোলেন ‘হাতির খবর ও সচেতনতা’ নামে একটি ফেসবুক মেসেঞ্জার গ্রুপ।

ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সচেতনতার কাজ আগে থেকেই চলছিল। তবে এই গ্রুপের মাধ্যমে তাঁর উদ্যোগ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা চষে বেড়িয়ে তিনি তৈরি করেছেন এক দারুণ নেটওয়ার্ক। এতে যুক্ত করেছেন ইতিবাচক ও সচেতন চিন্তার মানুষদের। পাহাড়ের কোথায় হাতির পাল অবস্থান করছে, কোন দিকে যাচ্ছে এবং কোথায় সংঘাতের শঙ্কা রয়েছে–এই তথ্যগুলো দ্রুত সংগ্রহ করে তারা স্থানীয়দের সতর্ক করে দেন। এতে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হচ্ছে।

কাঞ্চনের কাজের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ও গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। তাঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন, সীমান্তবর্তী অধিকাংশ মানুষ হাতিকে নিছক এক ‘শত্রু’ বা ‘দানব’ হিসেবে বিবেচনা করে। কাঞ্চন মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করেন–হাতি কোনো শত্রু নয়; বরং তারা বাস্তুচ্যুত এক অসহায় প্রাণী। মানুষের মতোই হাতিরও পরিবার আছে, তাদেরও ক্ষুধা ও কষ্টবোধ আছে।

এই মানবিক উপলব্ধি মানুষের মনে গেঁথে দেওয়া মোটেও সহজ কাজ ছিল না। তবে কাঞ্চন হাল ছাড়েননি। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় এখন অনেকেই বুঝতে শিখেছেন হাতির কষ্ট। একসময় যারা হাতি দেখলেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতেন, তাদের অনেকেই আজ কাঞ্চনের এই প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষার লড়াইয়ের সহযোগী।

কাঞ্চন লক্ষ্য করেছেন, হাতি যখন লোকালয়ে ঢুকে পড়ে, তখন তারা নিজেরাই চরম ভয় ও বিভ্রান্তির মধ্যে থাকে। এ সময় মানুষের চিৎকার, টিনের আওয়াজ, মশাল আর টর্চলাইটের তীব্র আলো তাদের আরও উন্মত্ত করে তোলে। কাঞ্চন জানান, হাতি অত্যন্ত বুদ্ধিমান প্রাণী। মানুষ তাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করছে, তা তারা দ্রুত শিখে নেয় এবং সেই অনুযায়ী পাল্টা আক্রমণ করে। অনেক ক্ষেত্রে কোনো রকম আঘাত ছাড়াই শুধু নির্দিষ্ট মাত্রার শব্দ বা আগুন দেখিয়ে হাতিকে নিরাপদে বনে ফেরানো সম্ভব।

তাঁর সংগঠনের মাধ্যমে নিয়মিত উঠান বৈঠক ও সচেতনতামূলক আলোচনা করা হয়। নিজস্ব অর্থায়নে তিনি পাহাড়ের বিভিন্ন পয়েন্টে অন্তত ২০টি শক্তিশালী লাইট বিতরণ করেছেন। তবে তিনি গ্রামবাসীকে কঠোরভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন, এই লাইট যেন হাতিকে অন্ধ করার বা ভয় দেখানোর জন্য ব্যবহৃত না হয়; বরং দূর থেকে হাতির অবস্থান বুঝে নিজেদের নিরাপদ রাখার কাজেই এটি ব্যবহার করতে হবে।

বন্ধুদের নিয়ে বনে ঘোরার সময় কাঞ্চন নানা দেশীয় ফল খান এবং বীজগুলো যত্রতত্র ছড়িয়ে দেন। খান থেকে জন্ম নেওয়া কিছু চারা গাছও যদি বেঁচে যায়, তবে তা ভবিষ্যতে বন্যপ্রাণীর খাদ্যের জোগান দেবে– এটাই তাঁর সহজ অথচ সুদূরপ্রসারী ‘বৃক্ষরোপণ’ দর্শন। পাশাপাশি, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ যেন সরকারের কাছ থেকে দ্রুত ক্ষতিপূরণ পায়, সেজন্য তিনি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষ ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পেলে হাতির প্রতি তাদের ক্ষোভ ও প্রতিহিংসা অনেকটাই কমে আসবে।

কোনো বড় প্রাতিষ্ঠানিক ফান্ডিং, সরকারি অনুদান ছাড়াই এগিয়ে চলছে কাঞ্চনের এই নিঃশব্দ সংগ্রাম। তিনি মনে করেন, অপরিকল্পিত বনায়ন ও খাদ্যাভাবই হাতি-মানুষ দ্বন্দ্বের মূল কারণ। পাহাড়ে হাতির উপযোগী খাদ্য নিশ্চিত করতে পারলে এবং মানুষের মধ্যে সহনশীলতা তৈরি হলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। 

আরও পড়ুন

×