ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

খমকের সুরে ও রঙের আঁচড়ে গড়া

মানবিক বিদ্যাপীঠ ‘প্রকৃতির পাঠশালা’

মানবিক বিদ্যাপীঠ ‘প্রকৃতির পাঠশালা’
×

সাধু নাজমুল তুহিনের গড়া এই ‘প্রকৃতির পাঠশালা’ যেন ভাষা ও মানবিকতা বিনিময়ের এক উন্মুক্ত ক্ষেত্র

লাবণী মণ্ডল

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬ | ০৭:১৩ | আপডেট: ১৯ মে ২০২৬ | ১৭:৪৩

শহুরে কোলাহল আর ইট-পাথরের যান্ত্রিকতা থেকে যোজন যোজন দূরে এক সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ি জনপদ; যেখানে পাহাড়ের গাঘেঁষে মেঘেরা খেলা করে, পাখির ডাকে ভাঙে সকালের ঘুম। ঠিক এমন একটি নিসর্গেই গড়ে উঠেছে এক অন্যরকম বিদ্যাপীঠ– ‘প্রকৃতির পাঠশালা’। চার দেয়ালের বদ্ধ গণ্ডি বা গতানুগতিক সিলেবাসের ভারে এখানকার শৈশব কুঁকড়ে যায় না। বরং খমকের মায়াবী সুরে, মাটির সোঁদা গন্ধে আর ভালোবাসার আদরে এখানে বেড়ে ওঠে আগামীর মানুষ।

ঘটনার শুরুটা হয়েছিল ২০১৮ সালের ডিসেম্বর। সাধু নাজমুল তুহিন তখন নেত্রকোনার দুর্গাপুরের চণ্ডীগড় আশ্রমে থাকতেন। খমকের প্রতি প্রবল অনুরাগ থেকে পরিচয় হয় দুর্গাপুরের কীর্তন দলের প্রধান ও খমকশিল্পী পুলক শুক্লার সঙ্গে। সেই সূত্র ধরেই আদিবাসী অধ্যুষিত এ সীমান্তবর্তী গ্রামে তাঁর প্রথম আগমন। তবে শুরুতে এখানে পাঠশালা খোলার কোনো পরিকল্পনাই তাঁর ছিল না। ২০১৯ সালের শেষের দিকে তিনি যখন পাকাপাকিভাবে এখানে থাকতে শুরু করেন, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল নিভৃতে নিজেকে চেনার সাধনায় মগ্ন থাকা। কিন্তু সুরের শক্তি যে অমোঘ! নাজমুল তুহিন যখন ভোরে বা গোধূলি লগ্নে খমক বাজিয়ে সাধনা করতেন, সেই অদ্ভুত মায়াবী সুর শিশুদের চুম্বকের মতো আকর্ষণ করত। খমকের আওয়াজ আর গান শুনে প্রথমে একজন-দুজন, এরপর দলবেঁধে ছুটে আসতে শুরু করে আদিবাসী শিশুরা।

‘প্রকৃতির পাঠশালা’র প্রতিষ্ঠাতা সাধু নাজমুল তুহিন সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে বলেন, ‘আমি স্কুল বা পাঠশালা করতে চাইনি। আমি আমার মতো সাধন-ভজন করতাম। কিন্তু শিশুদের এই দুর্নিবার টান দেখে মনে হলো, এদের জন্য যদি আমি সামান্য কিছু করতে পারি, একটু জ্ঞানের আলো দিতে পারি; তবেই হয়তো আমার সাধনা পূর্ণতা পাবে।’

এরপর ২০২০ সাল। বিশ্বজুড়ে যখন মহামারি কভিডের আতঙ্ক আর স্থবিরতা, ঠিক তখনই এই অবহেলিত জনপদে নীরবে জ্বলে ওঠে শিক্ষার আলো। কিন্তু শুরুতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় ভাষা। এখানকার অধিকাংশ শিশুই গারো ও হাজং জনগোষ্ঠীর। তারা কথা বলে মাতৃভাষায় আর মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থা বাংলায়। 

এই ভাষাগত দেয়াল ভাঙার জন্য নাজমুল তুহিন হাতে নিলেন বই-খাতা। শিশুদের বললেন, ‘তোমরা বই-খাতা নিয়ে এসো, আমি তোমাদের পড়াব।’ এভাবেই খেলার ছলে শুরু হলো এক গভীর সম্পর্কের যাত্রা। চালু হলো এক অভিনব ‘বিনিময় প্রথা’। নাজমুল তুহিন শিশুদের সঙ্গে শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতেন, যাতে তারা শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলা ভাষাটা ভালোভাবে রপ্ত করতে পারে। বিনিময়ে, শিশুদের সঙ্গে মিশে তিনি নিজেও শিখতে শুরু করলেন গারো ও হাজং ভাষা। শিক্ষক ও ছাত্রের এই পারস্পরিক ভাষা শিক্ষার মধ্য দিয়েই মজবুত হলো প্রেম ও বিশ্বাসের ভিত।

এখানে শুধু পুঁথিগত বিদ্যা শেখানো হয় না। চেষ্টা করা হয় নৈতিকতা, মানবিকতা, নিজস্ব সংস্কৃতি এবং নিজেকে চেনার শিক্ষা দিতে। সাঁইজির অমোঘ বাণী–সব জাতের সব ধর্মের মানুষ আসলে এক। এখানে প্রতিনিয়ত চর্চা করা হয়। ফলে আদিবাসী গারো ও হাজং শিশুদের পাশাপাশি বাঙালি মুসলিম পরিবারের শিশুরাও আজ এক ছাদের নিচে পাঠ গ্রহণ করছে। বর্তমানে প্রায় ৬০-৬৫ জন শিশু এই পাঠশালার শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের আওতায় রয়েছে।

‘প্রকৃতির পাঠশালা’র অবকাঠামো নির্মাণেরও আছে এক ভিন্ন গল্প। কোনো বড় দাতা সংস্থার মোটা অঙ্কের ফান্ড বা এনজিওর অনুদানে নয়; বরং এই পাঠশালা দাঁড়িয়ে আছে শিশুদেরই আঁকা ছবির ওপর ভিত্তি করে!

এই কর্মযজ্ঞের নেপথ্যে রয়েছে এক নারীর অবদান। তিনি সুলতানা রাজিয়া, যাকে পাঠশালার সবাই ভালোবেসে ডাকে ‘মা জননী’। ২০২০ সাল থেকে তিনি এই উদ্যোগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন। শিশুরা পাঠশালায় বসে মনের আনন্দে যেসব ছবি আঁকে, সুলতানা রাজিয়া সেগুলো সংগ্রহ করে ঢাকায় চিত্র প্রদর্শনী ও আর্ট ক্যাম্পের আয়োজন করেন। দেশের হৃদয়বান ও গুণীজনরা সে ছবিগুলো কিনে নেন। শিশুদের রংতুলিতে আঁকা সেই স্বপ্নের বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়েই গড়ে উঠেছে পাঠশালার ঘর ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো।

এ ছাড়া স্থানীয়দের ভালোবাসার অবদানও অনস্বীকার্য। যে জমিতে এই পাঠশালা দাঁড়িয়ে আছে, তা আদিবাসী গ্রামবাসী ভালোবেসে দান করেছেন। শুরুর দিকে বাঁশ কেটে এনে তারাই বানিয়ে দিয়েছিলেন প্রথম কুঁড়েঘরটি।

এখানে শিক্ষার বিনিময়ে কোনো অর্থ নেওয়া হয় না। প্রতিষ্ঠাতা বিশ্বাস করেন–‘প্রেম বিনিময় করা সেবার অংশ।’ তাই গ্রামবাসী তাদের সাধ্যমতো ধান, চাল, ফল বা সবজি দিয়ে পাঠশালায় সহযোগিতা করেন। তাদের এই অকৃত্রিম ভালোবাসাই পাঠশালার সবচেয়ে বড় মূলধন।

প্রকৃতির পাঠশালা আজ অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সম্প্রীতির এক মূর্ত প্রতীক। স্থানীয় আদিবাসীরা তাদের যে কোনো ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবে পাঠশালার সবাইকে আপন করে নেন। যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে দাঁড়িয়ে সাধু নাজমুল তুহিন, সুলতানা রাজিয়া ও তাদের সহযোগীরা প্রমাণ করেছেন–বড় অট্টালিকা বা কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নয়, কেবল সদিচ্ছা আর ভালোবাসা থাকলেই মানুষ গড়া সম্ভব।

পাহাড়ের পাদদেশে, খমকের সুরে আর শিশুদের কলকাকলিতে যে পৃথিবী এখানে রচিত হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে এক মানবিক আগামীর স্বপ্ন দেখায়। এখানে শিশুরা শুধু ছাত্র নয়, তারা প্রকৃতির সন্তান আর এই পাঠশালা হলো তাদের শিকড়ের সন্ধান।

আরও পড়ুন

×