রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের আপিল আবেদন শুনানির অপেক্ষায়
হলি আর্টিসানে হামলার ১০ বছর
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিসান বেকারিতে জঙ্গি হামলার ১০ বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে নৃশংস হামলা চালায় সশস্ত্র উগ্রপন্থিরা। তারা প্রথমে দেশি-বিদেশি অতিথি ও কর্মচারীদের জিম্মি করে। পরে কুপিয়ে ও গুলি করে ২০ জনকে হত্যা করা হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন তিনজন বাংলাদেশের, ৯ জন ইতালির, সাতজন জাপানের ও একজন ভারতের নাগরিক।
এ ঘটনায় গুলশান থানার তৎকালীন এসআই রিপন কুমার দাস বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করেন। গুলশান থানায় করা মামলাটির তদন্ত করেন ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) তৎকালীন পরিদর্শক হুমায়ুন কবির। ২০১৮ সালের ১ জুলাই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তিনি।
২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর সাত আসামির মৃত্যুদণ্ড দেন ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। এর পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের শুনানি শুরু হয় হাইকোর্টে। শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর হাইকোর্ট বেঞ্চ বিচারিক আদালতের দণ্ড কমিয়ে সাত আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে। আসামি পক্ষও সাজা কমাতে আপিল করেছে। এসব আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
হাইকোর্টের রায়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন– রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান, আসলাম হোসেন, জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, হাদিসুর রহমান ওরফে সাগর, আবদুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ, শরিফুল ইসলাম খালেদ এবং মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন। তাদের মধ্যে আসলাম হোসেন ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট কাশিমপুর কারাগার থেকে পালানোর সময় গুলিতে নিহত হন।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়, তদন্তকালে প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, ফরেনসিক, ব্যালিস্টিক, ডিএনএ ও ইমিগ্রেশন রিপোর্ট এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিকতায় জানা যায়, নিষিদ্ধ ঘোষিত জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) নেতৃত্বে অতি উগ্র অংশ নব্য জেএমবি পরিচয়ে হলি আর্টিসানে জঙ্গি হামলা চালায়।
সেই হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া পাঁচজন সেনা কমান্ডোদের অভিযানে নিহত হন। তারা হলেন– রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, মীর সামেহ মোবাশ্বের, নিবরাস ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল।
এ ছাড়া জিম্মিদের উদ্ধার করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালানোর সময় বোমা হামলায় নিহত হন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের তৎকালীন সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম এবং বনানী থানার তৎকালীন ওসি সালাহউদ্দিন খান। বোমার স্প্লিন্টারে পুলিশের অন্তত ৫০ কর্মকর্তা আহত হন।
হামলার ১০ বছর উপলক্ষে ইতালি দূতাবাস একটি ঘরোয়া অনুষ্ঠান করবে আজ বুধবার। এ ছাড়া বৃহস্পতিবার হলি আর্টিসান বেকারিতে যাবেন বাংলাদেশ সফররত জাইকার প্রেসিডেন্ট ড. তানাকা আকিহিকো। তবে এ উপলক্ষে পুলিশের কোনো কর্মসূচি নেই এবার। এর আগে বিভিন্ন সময় এই দিবসে পুলিশ কর্মসূচি পালন করেছে।
নিহত পুলিশ কর্মকর্তা রবিউল ইসলামের ছোট ভাই শামসুজ্জামান শামস্ সমকালকে বলেন, ‘আমার ভাই দায়িত্ববোধ ও মানবিকতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সেদিন জিম্মিদের উদ্ধার করতে গিয়েছিলেন। জঙ্গি হামলায় শহীদ হন। এ বিরোচিত আত্মোৎসর্গের মধ্য দিয়ে শুধু পুলিশ বাহিনী নয়; দেশ-বিদেশে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বাংলাদের অবস্থান এবং পদক্ষেপের একটি ইতিবাচক ধারণ জোরালো হয়েছিল। এ ঘটনায় সারাবিশ্ব শহীদদের প্রতি সমবেদনা যেমন দেখিয়েছে, তেমনি পুলিশ বাহিনীর প্রসংশা করেছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘শুধু রবিউলের ভাই হিসেবেই নয়, এ দেশের মানুষ হিসেবে আমার কষ্ট হয়, যখন দেখি হলি আর্টিসান হামলায় পুলিশ সদস্যদের দেশ ও মানবপ্রেমে বীরোচিত আত্মোৎসর্গের ইতিহাস পরবর্তী প্রজন্মকে জানানো। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের লক্ষ্যে গুলশান থানার সামনে নির্মিত ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী সেটি ভেঙে ফেলে। সেখানে তারা নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহ্রীরের পোস্টার টাঙিয়ে দিয়েছিল। ভীষণভাবে মর্মামত হয়েছি, যখন দেখলাম সেখানে পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো ধরনের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এর পর থেকে সেখানে শ্রদ্ধাও জানানো হয়নি। আদালতের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, দোষী ব্যক্তির যেন সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।’
এদিকে রবিউল করিমের স্মরণে ঢাকার মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ের প্রধান ফটকের নামকরণ করা হয়েছিল ‘রবিউল গেইট’। অজ্ঞাত কারণে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কয়েক মাস পর রবিউল গেট নাম ফলকটি সরিয়ে ফেলা হয়।
২০১৬ সালের ১ জুলাই রাত সাড়ে ৮টার দিকে ‘নব্য জেএমবি’র পাঁচ জঙ্গি গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কের হলি আর্টিসান বেকারিতে ঢুকে সেখানকার কর্মচারীসহ অতিথিদের জিম্মি করে। পরে ১৭ বিদেশি ও তিন বাংলাদেশি নাগরিককে বেকারির মধ্যেই হত্যা করে জঙ্গিরা। রাতভর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলি চলে। পরদিন ভোরে সেনাবাহিনীর ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ নামক কমান্ডো অভিযানে পাঁচ জঙ্গি নিহত হয়।
হামলার দায় স্বীকার করে ঘটনার রাতেই বিবৃতি দিয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)। তৎকালীন সরকার আইএসের এই দাবি নাকচ করে দিয়ে বলেছিল, দেশীয় জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবি এই হামলার জন্য দায়ী।
- বিষয় :
- হলি আর্টিসান
