ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

ক্ষতিকর বাতাসে বাড়ছে নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি

ক্ষতিকর বাতাসে বাড়ছে নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি
×

ছবি: গেটি ইমেজেস

বিবিসি

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ১০:৫৩ | আপডেট: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ১১:০৯

প্রতিদিন আমরা যে বাতাসে শ্বাস নিই, সেটিই অজান্তেই নানা রোগের কারণ হয়ে উঠতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষ এমন বাতাসে বসবাস করেন, যেখানে দূষণের মাত্রা নিরাপদ সীমার চেয়ে বেশি। বাংলাদেশেও যানবাহনের ধোঁয়া, ইটভাটা, শিল্পকারখানার নির্গমন, নির্মাণকাজের ধুলাবালি ও জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বায়ুদূষণকে জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় হুমকিতে পরিণত করেছে।

পিএম ২.৫ কেন এত বিপজ্জনক?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়ুদূষণের সবচেয়ে ক্ষতিকর উপাদানগুলোর একটি হলো পিএম ২.৫ । এটি ২ দশমিক ৫ মাইক্রোমিটার বা তারও ছোট ব্যাসের সূক্ষ্ম কণা, যা মানুষের চুলের প্রস্থের তুলনায় প্রায় ৩০ গুণ ছোট। এত ছোট হওয়ায় এই কণাগুলো সহজেই ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করে রক্তপ্রবাহে মিশে যেতে পারে। এরপর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে প্রদাহ সৃষ্টি করে এবং দীর্ঘমেয়াদে নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

শুধু ফুসফুস নয়, পুরো শরীরই ঝুঁকিতে

গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে থাকার ফলে হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগ, হৃদ্‌রোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। সাম্প্রতিক গবেষণায় আরও দেখা যাচ্ছে, বায়ুদূষণের প্রভাব শুধু শারীরিক নয়; এটি মস্তিষ্কের কার্যকারিতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি দূষণের সঙ্গে স্মৃতিশক্তি হ্রাস, মনোযোগ কমে যাওয়া, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা দুর্বল হওয়া এবং মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির সম্পর্কও পাওয়া গেছে।

ওজন বৃদ্ধি ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বাড়তে পারে

বিভিন্ন গবেষণায় বায়ুদূষণ ও স্থূলতার মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, দূষণের কারণে শরীরে যে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি হয়, তা বিপাকক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। এতে ইনসুলিনের কার্যকারিতা ব্যাহত হতে পারে এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে। দূষিত পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুদের মধ্যেও স্থূলতার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে।

ঘ্রাণশক্তিও হতে পারে ক্ষতিগ্রস্ত

বায়ুদূষণের আরেকটি কম আলোচিত প্রভাব হলো ঘ্রাণশক্তি দুর্বল হয়ে যাওয়া। গবেষকদের মতে, দূষণজনিত সূক্ষ্ম কণা নাক থেকে মস্তিষ্কে গন্ধের তথ্য বহনকারী স্নায়ুকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ফলে ধীরে ধীরে গন্ধ শনাক্ত করার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়ুদূষণকে কেবল শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাতাসে থাকা সূক্ষ্ম দূষণকণা ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করে রক্তপ্রবাহে মিশে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে পৌঁছে যায়। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ সৃষ্টি হয়, যা হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, স্নায়বিক জটিলতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বায়ুর মান খারাপ থাকলে অপ্রয়োজনীয় বাইরে যাওয়া কমানো, প্রয়োজন অনুযায়ী মানসম্মত মাস্ক ব্যবহার এবং শিশু, বয়স্ক ও দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে অতিরিক্ত সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

বায়ুমণ্ডলীয় রসায়নবিদদের মতে, বাতাসে দীর্ঘ সময় ভেসে থাকা সূক্ষ্ম দূষণকণার ক্ষতিকর প্রভাব সময়ের সঙ্গে আরও বাড়তে পারে। দূষণের উৎস থেকে অনেক দূরে থাকলেও বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই অতিক্ষুদ্র কণা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই বায়ুদূষণকে শুধু স্থানীয় সমস্যা হিসেবে নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের একটি বিস্তৃত হুমকি হিসেবে বিবেচনা করার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?

বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন শিশু, নবজাতক, বয়স্ক ব্যক্তি, হাঁপানি ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোগী, হৃদ্‌রোগী এবং গর্ভবতী নারীরা। এসব ব্যক্তির ক্ষেত্রে দূষিত বাতাস গুরুতর স্বাস্থ্য জটিলতা তৈরি করতে পারে।

নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন যেভাবে

বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়ুদূষণের ক্ষতি পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব না হলেও কিছু সতর্কতা ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারে। বায়ুর মান খারাপ থাকলে অপ্রয়োজনে বাইরে যাওয়া কমানো, প্রয়োজন হলে N95 বা সমমানের মাস্ক ব্যবহার, ব্যস্ত সড়ক ও ধোঁয়াযুক্ত এলাকা এড়িয়ে চলা, ঘরের ভেতর পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখা এবং শ্বাসকষ্ট বা অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। পাশাপাশি গাছ লাগানো, দূষণ কমাতে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনও দীর্ঘমেয়াদে বায়ুদূষণ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাতাসের দূষণ সবসময় চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এর ক্ষতি নীরবে শরীরে জমতে থাকে। তাই সুস্থ থাকতে শুধু স্বাস্থ্যকর খাবার বা নিয়মিত ব্যায়াম করলেই যথেষ্ট নয়; নির্মল বাতাস নিশ্চিত করা, দূষণের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা মেনে চলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগেই কেবল বায়ুদূষণের এই নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো সম্ভব।
 

আরও পড়ুন

×