ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

সাফল্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে আপনার অনুপ্রেরণার ধরনে, যা বলছেন মনোবিজ্ঞানীরা

সাফল্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে আপনার অনুপ্রেরণার ধরনে, যা বলছেন মনোবিজ্ঞানীরা
×

ছবি: বিবিসি

বিবিসি

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ১২:১৭ | আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ১৩:০৮

কোনো লক্ষ্য অর্জনের পথ অনেকটা পাহাড়ে ওঠার মতো। যাত্রার শুরুতে চূড়াটি খুব কাছেই মনে হয়। কিন্তু পথ যত এগোয়, সামনে আসে ক্লান্তি, বাধা, ক্ষুধা, তৃষ্ণা আর হাল ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছা। তখন মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায় একটাই শক্তি-অনুপ্রেরণা বা মোটিভেশন।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অনুপ্রেরণা এমন একটি মানসিক চালিকাশক্তি, যা মানুষের আচরণকে নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যের দিকে পরিচালিত করে। কেউ নতুন কিছু শেখার আনন্দে কাজ করেন, কেউ স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য, কেউ অর্থ উপার্জনের জন্য, আবার কেউ সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার তাগিদে। অর্থাৎ, সবার অনুপ্রেরণার উৎস এক নয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিজের অনুপ্রেরণার ধরন সম্পর্কে সচেতন হওয়া শুধু কর্মক্ষেত্রেই নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কী আপনাকে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করে, তা জানা থাকলে লক্ষ্য অর্জনের পথও অনেক সহজ হয়ে যায়।

অনুপ্রেরণা কীভাবে মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে

একজন শিক্ষার্থী পদার্থবিজ্ঞানের বই পড়ছে। সে হয়তো বিষয়টি জানার কৌতূহল থেকেই পড়ছে। আবার এমনও হতে পারে, শিক্ষক শাস্তি দেবেন বলে বাধ্য হয়ে বই খুলেছে। একইভাবে একজন টেনিস খেলোয়াড় নিজের ভালোবাসা থেকে খেলতে পারেন, আবার পরিবারের প্রত্যাশা পূরণের চাপেও খেলতে পারেন।

অনেক সময় আমাদের লক্ষ্য সমাজের প্রত্যাশার কারণেও বদলে যায়। কেউ পদোন্নতি চান কারণ সমাজে উচ্চপদকে মর্যাদার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ম্যাগাজিনে নিখুঁত শরীরের ছবি দেখে নিজের শরীর পরিবর্তনের লক্ষ্য ঠিক করেন। অর্থাৎ, সব সিদ্ধান্তই নিজের ইচ্ছা থেকে আসে না।

দুই ধরনের অনুপ্রেরণা

মনোবিজ্ঞানে অনুপ্রেরণাকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয়-অন্তর্নিহিত এবং বহিঃস্থ 

অন্তর্নিহিত অনুপ্রেরণায় মানুষ কোনো কাজ করেন কারণ কাজটি করতে তার ভালো লাগে। শেখার আনন্দ, নতুন কিছু আবিষ্কার, নিজের দক্ষতা বাড়ানো কিংবা ব্যক্তিগত সন্তুষ্টি এখানে সবচেয়ে বড় প্রেরণা।

অন্যদিকে বহিঃস্থ অনুপ্রেরণায় কাজের পেছনে থাকে বাহ্যিক কোনো লাভ বা চাপ। যেমন-বেতন, বোনাস, পদোন্নতি, সামাজিক মর্যাদা, পুরস্কার কিংবা অন্যের প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।

মনোবিজ্ঞানের বহুল আলোচিত সেলফ-ডিটারমিনেশন থিওরি বলছে, মানুষ যখন নিজের ইচ্ছা ও মূল্যবোধ থেকে কাজ করে, তখন সেই কাজে তার সাফল্যের সম্ভাবনা বেশি থাকে। অন্যদিকে শুধু চাপ বা বাধ্যবাধকতা থেকে করা কাজ দীর্ঘমেয়াদে আগ্রহ কমিয়ে দেয়।

গবেষণায় যা উঠে এসেছে

কানাডার কার্লটন ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক মারিনা মিলিয়াভস্কায়া ও তাঁর সহকর্মীরা ৩৪৪ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর ওপর একটি গবেষণা চালান। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের পরবর্তী সেমিস্টারের ব্যক্তিগত লক্ষ্য সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। এসব লক্ষ্যের মধ্যে ছিল ভালো ফলাফল করা, চাকরি পাওয়া, ওজন কমানো কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে নতুনভাবে জীবন শুরু করা। গবেষণায় দেখা যায়, যারা নিজের ইচ্ছা ও ব্যক্তিগত মূল্যবোধ থেকে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন, তারা অন্যের প্রত্যাশা বা সামাজিক চাপ থেকে লক্ষ্য নির্ধারণকারীদের তুলনায় বেশি সফল হন।

উদাহরণ হিসেবে গবেষকরা বলেন, যারা নিজের সিদ্ধান্তে ওজন কমাতে চেয়েছিলেন, তারা ফাস্টফুডের প্রলোভন সহজে এড়িয়ে যেতে পেরেছেন। কিন্তু যারা সমাজের চাপ অনুভব করে ওজন কমাতে চেয়েছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে সেই লক্ষ্য ধরে রাখা কঠিন হয়েছে। একইভাবে কর্মক্ষেত্রেও যেসব মানুষ অন্তর্নিহিত অনুপ্রেরণায় কাজ করেন, তাদের মানসিক সুস্থতা, কাজের প্রতি সন্তুষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের হার তুলনামূলক বেশি।

মানুষের অনুপ্রেরণার ছয় ধরন

মনোবিজ্ঞানী ইয়ান ম্যাকরে, ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান ফার্নহাম এবং গ্রিনউইচ ইউনিভার্সিটির গবেষক জেসিকা টেচনার ৭৫০ জনের বেশি পেশাজীবীর ওপর গবেষণা চালিয়ে কর্মক্ষেত্রে মানুষের অনুপ্রেরণার ছয়টি প্রধান ধরন শনাক্ত করেছেন।

১. স্বায়ত্তশাসন 

এ ধরনের মানুষ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পছন্দ করেন। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে চান, নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসেন এবং নিজের দক্ষতা বিকাশের সুযোগ খোঁজেন। সৃজনশীল পেশায় থাকা মানুষের মধ্যে এই অনুপ্রেরণা বেশি দেখা যায়।

২. স্বীকৃতি

এই ধরনের মানুষের কাছে পদোন্নতি, সম্মান, পুরস্কার, পদবি এবং নিজের অর্জনের সামাজিক স্বীকৃতি সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। তারা চান তাদের কাজের মূল্যায়ন হোক এবং অন্যরা তাদের সাফল্যকে স্বীকার করুক।

৩. সম্পৃক্ততা বা সম্পর্ক

এরা দলগতভাবে কাজ করতে ভালোবাসেন। সহকর্মীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক, সহযোগিতা, মেন্টরশিপ, পারস্পরিক যোগাযোগ এবং একটি ইতিবাচক কর্মপরিবেশ তাদের সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করে।

৪. পারিশ্রমিক

যাদের প্রধান অনুপ্রেরণা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, তাদের কাছে ভালো বেতন, বোনাস, বিমা, বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

৫. কাজের পরিবেশ 

এই শ্রেণির মানুষ নমনীয় কর্মঘণ্টা, কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য, আরামদায়ক পরিবেশ এবং কাজের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। তাদের কাছে শুধু বেতন নয়, কাজের পরিবেশও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

৬. নিরাপত্তা

যারা চাকরির স্থায়িত্ব, ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা, মানসিক নিরাপত্তা এবং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাকে সবচেয়ে বেশি মূল্য দেন, তাদের অনুপ্রেরণার মূল উৎস নিরাপত্তা।

গবেষকদের মতে, একজন মানুষের মধ্যে এই ছয়টি বৈশিষ্ট্যই থাকতে পারে। তবে ব্যক্তি ভেদে কোনো একটি বা দুটি বিষয় অন্যগুলোর তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আর নিজের সেই অগ্রাধিকারটি বুঝতে পারলেই কাজের প্রতি আগ্রহ ধরে রাখা, সঠিক ক্যারিয়ার বেছে নেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদে সফল হওয়া অনেক সহজ হয়।

বয়স ও আয়ের সঙ্গে কীভাবে বদলে যায় অনুপ্রেরণা

গবেষকদের মতে, মানুষের অনুপ্রেরণা সারাজীবন এক রকম থাকে না। বয়স, অভিজ্ঞতা, আর্থিক অবস্থা এবং জীবনযাপনের পরিবর্তনের সঙ্গে এর ধরনও বদলে যায়।

কম বয়সীদের ক্ষেত্রে সাধারণত বেতন, বোনাস, পদোন্নতি ও আর্থিক সুবিধার মতো বাহ্যিক বিষয়গুলো বেশি প্রভাব ফেলে। কারণ, এই সময় তারা ক্যারিয়ার গঠন, আর্থিক স্থিতি অর্জন এবং ভবিষ্যৎ নিরাপদ করার দিকে বেশি মনোযোগী থাকেন।

অন্যদিকে বয়স ও অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই কাজের স্বাধীনতা, অর্থবহ দায়িত্ব, ব্যক্তিগত বিকাশ এবং নিজের সিদ্ধান্তে কাজ করার সুযোগকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। গবেষকদের মতে, আর্থিক স্বচ্ছলতা তৈরি হলে মানুষের অনুপ্রেরণাও ধীরে ধীরে বাহ্যিক অর্জন থেকে ব্যক্তিগত সন্তুষ্টির দিকে সরে আসে।

কর্মক্ষেত্র ও ব্যক্তিগত জীবনে অনুপ্রেরণার প্রভাব

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিজের অনুপ্রেরণার উৎস সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকলে কর্মক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়া, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং দীর্ঘ সময় উদ্যম ধরে রাখা সহজ হয়।

যারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পছন্দ করেন, তারা নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পেলে বেশি ভালো ফল করেন। আবার যাদের কাছে স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ, তারা প্রশংসা বা পদোন্নতির সম্ভাবনা থাকলে আরও বেশি মনোযোগ দিয়ে কাজ করেন।

যাদের অনুপ্রেরণার মূল উৎস সম্পর্ক ও দলগত কাজ, তারা সহযোগিতামূলক পরিবেশে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। অন্যদিকে নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া মানুষ স্থায়ী ও ঝুঁকিহীন কর্মপরিবেশে বেশি আত্মবিশ্বাসী থাকেন।

এই বিষয়গুলো শুধু চাকরিজীবনেই নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও প্রভাব ফেলে। যেমন, কেউ যদি সামাজিক সম্পর্ক থেকে অনুপ্রেরণা পান, তাহলে একা ব্যায়াম করার চেয়ে বন্ধু বা দলের সঙ্গে ব্যায়াম করলে তিনি লক্ষ্য ধরে রাখতে বেশি সফল হতে পারেন। আবার যাদের স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ, তারা নির্দিষ্ট কোনো চ্যালেঞ্জ বা অর্জনের লক্ষ্য ঠিক করলে বেশি অনুপ্রাণিত হন।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

মনোবিজ্ঞানী ইয়ান ম্যাকরে ও তাঁর সহকর্মীদের মতে, মানুষকে সবার জন্য একই ধরনের অনুপ্রেরণার কৌশলে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। প্রত্যেকের মূল্যবোধ ও চালিকাশক্তি আলাদা।

তাদের মতে, প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত কর্মীদের শুধু বেতন বাড়ানোর দিকে নয়, বরং কাজের স্বাধীনতা, শেখার সুযোগ, নিরাপদ পরিবেশ, ইতিবাচক কর্মসংস্কৃতি এবং স্বীকৃতির দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া।

এদিকে 'সেলফ-ডিটারমিনেশন থিওরি' অনুযায়ী, যেসব মানুষ নিজের ইচ্ছা ও মূল্যবোধ থেকে কাজ করেন, তারা সাধারণত বেশি সন্তুষ্ট থাকেন, বাধা সহজে অতিক্রম করতে পারেন এবং দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফল অর্জন করেন।

কীভাবে নিজের অনুপ্রেরণাকে কাজে লাগাবেন

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজের অনুপ্রেরণার ধরন বুঝে জীবন ও কর্মপরিকল্পনা সাজালে সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। যা করতে পারেন-

  •  নিজের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণার উৎসটি চিহ্নিত করুন।
  •  ব্যক্তিগত মূল্যবোধের সঙ্গে মিল রেখে লক্ষ্য নির্ধারণ করুন।
  •  শুধু বাহ্যিক পুরস্কারের ওপর নির্ভর না করে কাজের অর্থপূর্ণ দিক খুঁজে বের করুন।
  •  নতুন দক্ষতা অর্জন ও ব্যক্তিগত বিকাশের সুযোগ তৈরি করুন।
  •  সম্পর্কভিত্তিক অনুপ্রেরণা থাকলে দলগত কাজ ও নেটওয়ার্কিং বাড়ান।
  •  কাজের প্রতি আগ্রহ কমে গেলে নিজের লক্ষ্য ও অগ্রাধিকার নতুন করে মূল্যায়ন করুন।
  •  প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে থাকলে কর্মীদের অনুপ্রেরণার ভিন্নতা বুঝে দায়িত্ব ও সুযোগ দিন।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অনুপ্রেরণা শুধু লক্ষ্য পূরণের শক্তি নয়; এটি মানুষের সিদ্ধান্ত, অধ্যবসায় এবং সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি। তাই কী আপনাকে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দেয়, সেটি জানা আত্ম-সচেতনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিজের অনুপ্রেরণার উৎসকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা যেমন বাড়ে, তেমনি ব্যক্তিগত জীবনেও লক্ষ্য অর্জনের পথ হয়ে ওঠে আরও স্পষ্ট, স্থির ও অর্থবহ।
 

আরও পড়ুন

×