একবার হারালে আর ফিরে পাওয়া যায় না: যেভাবে সুরক্ষিত রাখবেন আপনার শ্রবণশক্তি
৬০ বছর বয়সের আগেই শ্রবণশক্তি পরীক্ষা করিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও, যেকোনো বয়সেই শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। ছবি: গেটি ইমেজেস
বিবিসি
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ১১:০৬ | আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ১৩:০৫
শ্রবণশক্তি এমন একটি সম্পদ, যা একবার নষ্ট হয়ে গেলে বর্তমান চিকিৎসায় পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তাই বয়স বাড়ার অপেক্ষা না করে এখন থেকেই কান সুরক্ষায় সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শুধু বিস্ফোরণ, কনসার্ট বা অত্যন্ত উচ্চ শব্দই নয়; প্রতিদিনের অনেক সাধারণ অভ্যাসও ধীরে ধীরে শ্রবণশক্তির ক্ষতি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের অডিওলজিস্ট ও শ্রবণশক্তি হ্রাসজনিত সমস্যার বিশেষজ্ঞ ভ্যালেরি পাভলোভিচ রাফ বলেন, একবার যা হারিয়ে যায়, তা আর ফিরে আসে না। তার ভাষায়, মানুষ জন্মের সময় যতগুলো ‘হেয়ার সেল’ বা রোম-কোষ নিয়ে জন্মায়, সারা জীবন সেটিই থাকে। একবার এসব কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা আর নতুন করে তৈরি হয় না। তাই চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, আগে বয়সজনিত কারণে শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার বিষয়টি বেশি দেখা গেলেও এখন কিশোর-কিশোরী, এমনকি ১০ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যেও শ্রবণশক্তি হ্রাসের লক্ষণ মিলছে।
মায়ো ক্লিনিকের অডিওলজিস্ট জেমি বোগল বলেন, কম বয়সে উচ্চ শব্দের ক্ষতিকর প্রভাব অনেক সময় বোঝা যায় না। কিন্তু বছরের পর বছর সেই ক্ষতি জমতে থাকে এবং পরবর্তী জীবনে বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কীভাবে কাজ করে শ্রবণশক্তি?
কানের ভেতরে কোকলিয়া নামে তরলপূর্ণ একটি অংশে হাজার হাজার ক্ষুদ্র ‘হেয়ার সেল’ বা রোম-কোষ থাকে। শব্দ কানে প্রবেশ করলে এসব কোষ নড়াচড়া করে বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করে, যা শ্রবণ স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়। এভাবেই আমরা শব্দ শুনতে পাই।
কিন্তু দীর্ঘ সময় উচ্চমাত্রার শব্দের মধ্যে থাকলে এসব সূক্ষ্ম রোম-কোষ বাঁকিয়ে যায় বা নষ্ট হয়ে যায়। আর মানুষের শরীরে এই কোষগুলো একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা আর পুনরায় তৈরি হয় না। ফলে শ্রবণশক্তির ক্ষতিও স্থায়ী হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট উচ্চমাত্রার শব্দের মধ্যে থাকলেই অন্তঃকর্ণের ক্ষতি শুরু হতে পারে।
শুধু কনসার্ট নয়, ঝুঁকি লুকিয়ে আছে প্রতিদিনের জীবনেও
অনেকেই মনে করেন কেবল রক কনসার্ট বা বিস্ফোরণের মতো তীব্র শব্দই কানের ক্ষতি করে। বাস্তবে জিমের উচ্চস্বরে বাজানো গান, খেলাধুলার স্টেডিয়াম, ঘাস কাটার যন্ত্র, লিফ ব্লোয়ার, করাত, ড্রিল মেশিন কিংবা নির্মাণকাজের যন্ত্রপাতিও দীর্ঘমেয়াদে শ্রবণশক্তির ক্ষতি করতে পারে।
এ ছাড়া মহাসড়কে দীর্ঘ সময় গাড়ির জানালা খুলে চলার সময় বাতাসের তীব্র শব্দও কানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। অনেকেই সেই শব্দ ঢাকতে গাড়ির মিউজিকের ভলিউম আরও বাড়িয়ে দেন, যা ঝুঁকি দ্বিগুণ করে। মোটরসাইকেল চালানোর সময়ও ইঞ্জিনের উচ্চ শব্দ থেকে কানকে সুরক্ষিত রাখা জরুরি।
হেডফোন ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে তরুণরা
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে শ্রবণশক্তি হ্রাসের অন্যতম বড় কারণ দীর্ঘ সময় হেডফোনে উচ্চস্বরে গান শোনা।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত হেডফোন ব্যবহারকারী শিশুদের শ্রবণক্ষমতায় ব্যবহার না করা শিশুদের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। গবেষকদের আশঙ্কা, ব্যক্তিগত অডিও ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে বিশ্বজুড়ে ৩৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ১৩৫ কোটি মানুষ অকালে শ্রবণশক্তি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, মোবাইল বা অন্যান্য ডিভাইসে থাকা ‘ভলিউম লিমিটার’ চালু রাখা উচিত। হেডফোন পরে যদি পাশের মানুষের স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর শোনা না যায়, তাহলে বুঝতে হবে শব্দের মাত্রা নিরাপদ সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
ইয়ারপ্লাগ ব্যবহার কতটা জরুরি?
লাইভ কনসার্ট, স্টেডিয়াম বা উচ্চ শব্দের পরিবেশে সাধারণ ফোমের ইয়ারপ্লাগের বদলে ‘হাই-ফিডেলিটি’ ইয়ারপ্লাগ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এতে শব্দের তীব্রতা কমে, কিন্তু সঙ্গীতের মান নষ্ট হয় না।
কটন বাড ব্যবহারে হতে পারে বিপদ
বিশেষজ্ঞদের মতে, কান নিজেই স্বাভাবিকভাবে পরিষ্কার হওয়ার ক্ষমতা রাখে। নিয়মিত কটন বাড বা অন্য কিছু দিয়ে কান পরিষ্কার করতে গেলে কানের খইল আরও ভেতরে ঢুকে যেতে পারে। এতে কানে চাপ অনুভব হওয়া, সংক্রমণ এবং সাময়িক শ্রবণ সমস্যা দেখা দিতে পারে।
যদি কানে অতিরিক্ত খইল জমে যায়, তাহলে নিজে পরিষ্কার করার চেষ্টা না করে চিকিৎসক বা অডিওলজিস্টের সাহায্য নেওয়াই নিরাপদ।
শ্রবণশক্তি হারানোর প্রভাব শুধু কানে সীমাবদ্ধ নয়
শ্রবণশক্তি কমে গেলে শুধু শুনতেই সমস্যা হয় না, সামাজিক জীবনও ব্যাহত হতে পারে। ভুল শোনার ভয়ে অনেকেই আড্ডা বা সামাজিক যোগাযোগ এড়িয়ে চলেন। বিভিন্ন গবেষণায় বয়সজনিত শ্রবণশক্তি হ্রাসের সঙ্গে ডিমেনশিয়ার সম্পর্কও পাওয়া গেছে। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি সরাসরি কারণ কি না, তা নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে।
কখন পরীক্ষা করাবেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ৬০ বছর বয়স হওয়ার আগেই অন্তত একবার শ্রবণশক্তি পরীক্ষা করানো ভালো। তবে যেকোনো বয়সেই যদি কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে অন্যের কথা বুঝতে সমস্যা হয়, বারবার কথা পুনরায় বলতে হয় বা কানে নিয়মিত ভোঁ-ভোঁ (টিনিটাস) শব্দ শোনা যায়, তাহলে দেরি না করে শ্রবণশক্তি পরীক্ষা করানো উচিত।
সমাধান ও করণীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি সহজ অভ্যাস মেনে চললেই শ্রবণশক্তির ক্ষতির ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
- হেডফোনে দীর্ঘ সময় সর্বোচ্চ ভলিউমে গান শুনবেন না।
- কনসার্ট, স্টেডিয়াম বা উচ্চ শব্দের পরিবেশে ইয়ারপ্লাগ ব্যবহার করুন।
- ঘাস কাটার যন্ত্র, করাত, ড্রিল মেশিন বা অন্যান্য উচ্চ শব্দের যন্ত্র ব্যবহারের সময় ইয়ারমাফ বা কানের সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করুন।
- মহাসড়কে দীর্ঘ সময় গাড়ির জানালা খুলে চলার সময় সতর্ক থাকুন।
- মোটরসাইকেল চালানোর সময় মানসম্মত ইয়ারপ্লাগ ব্যবহার করুন।
- কটন বাড বা ধারালো কিছু দিয়ে কান পরিষ্কার করবেন না।
- কানে ভোঁ-ভোঁ শব্দ, শুনতে অসুবিধা বা কথোপকথন বুঝতে সমস্যা হলে দ্রুত নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ বা অডিওলজিস্টের পরামর্শ নিন।
- নিয়মিত উচ্চ শব্দের মধ্যে কাজ করলে নির্দিষ্ট সময় পরপর শ্রবণশক্তি পরীক্ষা করান।
বর্তমানে বিজ্ঞানীরা জিন থেরাপির মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হেয়ার সেল পুনরায় তৈরি করার উপায় নিয়ে গবেষণা করছেন। তবে সেই প্রযুক্তি এখনও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রবণশক্তি রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো শুরু থেকেই সচেতন থাকা এবং প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসে কানকে সুরক্ষিত রাখা।
- বিষয় :
- স্বাস্থ্য
- কানের সমস্যা
- সুরক্ষা