ঐতিহ্যে বুননে টাঙ্গাইল শাড়ি
নকশার পাশাপাশি টাঙ্গাইল শাড়ির রঙেও রয়েছে বৈচিত্র্য। ছবি: রঙ বাংলাদেশ
রিক্তা রিচি
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৪:৪৭
টাঙ্গাইল শাড়ি নির্দিষ্ট একটি ভৌগোলিক অঞ্চল ও দীর্ঘদিনের বয়নঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। এর নকশা, বুনন, পাড়, বুটি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য অন্য শাড়ি থেকে একে আলাদা পরিচয় দিয়েছে। আটপৌরে দিন হোক কিংবা উৎসবের আয়োজন, বাঙালি নারীর পোশাকে টাঙ্গাইল শাড়ির উপস্থিতি বেশ পুরোনো ও আপন। লিখেছেন রিক্তা রিচি
বাঙালি নারীদের পছন্দের তালিকায় টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির জায়গা আলাদা। তরুণী থেকে প্রবীণ, সবার কাছেই এর কদর রয়েছে। হালকা ও আরামদায়ক হওয়ার পাশাপাশি শাড়ির নকশা ও রঙের বৈচিত্র্যও সহজেই মন কাড়ে। শাড়িতে কখনও ফুটে ওঠে পদ্ম, কখনও ফুল-লতা, আবার কখনও দেখা যায় জ্যামিতিক নকশা। কোথাও পাড়জুড়ে সূক্ষ্ম কারুকাজ, কোথাও একরঙা জমিনের সঙ্গে পাড় ও আঁচলের রঙে তৈরি হয় বৈপরীত্য।
ঈদ, পূজা কিংবা পারিবারিক কোনো আয়োজনেও অনেকের প্রথম পছন্দ থাকে টাঙ্গাইল শাড়ি। আসন্ন দূর্গাপূজাকে কেন্দ্র করেও শুরু হয়েছে তোড়জোড়। কারিগরেরা বুনছেন নতুন শাড়ি। আবার কর্মজীবী নারীর প্রতিদিনের পোশাক হিসেবেও সুতি টাঙ্গাইলের চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় সুতি কাপড়ের স্বস্তি এই শাড়ির জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ।
টাঙ্গাইল শাড়ির পরিচয় অবশ্য শুধু রং, নকশা কিংবা আরামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার তাঁতশিল্প, কারিগরের শ্রম এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা বয়নঐতিহ্য। ২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল শাড়ি বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এর পর ২০২৫ সালে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী শাড়ি বয়নশিল্প ইউনেস্কোর অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বশীল তালিকায় স্থান পায়। আন্তর্জাতিক এই স্বীকৃতি টাঙ্গাইল শাড়ির ঐতিহ্যকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
তাঁত থেকে শাড়ি
টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্পের বিকাশ উনিশ শতকের শেষভাগে বিশেষভাবে গতি পায়। তবে এ অঞ্চলের বয়নঐতিহ্যের শিকড় আরও পুরোনো। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, ঢাকা অঞ্চলের ধামরাই ও চৌহাট্টা থেকে কিছু তাঁতি টাঙ্গাইল অঞ্চলে এসে বসতি গড়েন। স্থানীয় পরিবেশ ও মানুষের চাহিদার সঙ্গে খাপ খাইয়ে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে টাঙ্গাইলের নিজস্ব বয়নধারা।
প্রথমদিকে এ অঞ্চলে মূলত সাদামাটা কাপড় তৈরি হতো। সময়ের সঙ্গে শাড়িতে যুক্ত হয় নকশা ও বৈচিত্র্যময় পাড়। সূক্ষ্ম বুনন, পাড়ের কাজ এবং নকশার বৈচিত্র্য ধীরে ধীরে টাঙ্গাইল শাড়িকে আলাদা পরিচিতি দেয়। টাঙ্গাইলের পাথরাইল, দেলদুয়ার, কালিহাতীসহ বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে তাঁতশিল্পের চর্চা হয়ে আসছে। এই বয়নঐতিহ্যের সঙ্গে বসাক সম্প্রদায়ের তাঁতিদের অবদানও গভীরভাবে যুক্ত।
প্রায় ৪৫ বছর ধরে টাঙ্গাইলের শাড়ি নিয়ে কাজ করছেন মনি ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী নিমাই চন্দ্র বসাক। তাঁর মতে, টাঙ্গাইল শাড়ির নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্যবাহী নকশা রয়েছে, যা অন্য শাড়ি থেকে একে আলাদা করেছে। শাড়ি পরলে এর বুনন ও কাপড়ের গুণমানও সহজে বোঝা যায় বলে মনে করেন তিনি।
ঐতিহ্যগতভাবে টাঙ্গাইলের নকশার মধ্যে জ্যাকেট পাড়, ঘষা ফিতা জামদানি ও তন্তুজ জামদানির কথা উল্লেখ করেন নিমাই চন্দ্র বসাক। সুতি ছাড়াও টাঙ্গাইল শাড়ির মধ্যে হাফ সিল্ক, পিওর সিল্ক, সফট সিল্ক, সুতি জামদানি, বালুচরি ও টাঙ্গাইল বিটির মতো নানা ধরন রয়েছে। জরিপাড়, হাজারবুটি, স্বর্ণচূড়, ইক্কাত, আনারকলি, দেবদাস, সুতিপাড়, কাটকি, কুমকুম, সানন্দা, ময়ূরকণ্ঠী ও নীলাম্বরীর মতো বৈচিত্র্যও রয়েছে শাড়িতে।
নকশায় যত বৈচিত্র্য
টাঙ্গাইল শাড়ির দিকে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়ে এর পাড়। কখনও চওড়া, কখনও সরু। কোথাও পাড়জুড়ে ঘন কারুকাজ, আবার কোথাও সূক্ষ্ম রেখা ও ছোট ছোট মোটিফ। অনেক সময় পাড়ের নকশাই শাড়িটির পুরো চরিত্র নির্ধারণ করে। শাড়ির জমিনেও থাকে নানা ধরনের বুটি। প্রকৃতি ও দৈনন্দিন জীবনের নানা উপাদান থেকেই এসব নকশার অনুপ্রেরণা এসেছে। পাতা বুটি, পদ্ম বুটি, জবা ফুল বুটি, ঢেঁকিশাক বুটি, পান বুটি, গাছ বুটি, লতা বুটি, শাপলা বুটি, সূর্যমুখী বুটি, ভোমরা বুটি, প্রজাপতি বুটি, মাছ বুটি, কাঁকড়া বুটি, আনারস বুটি, কামরাঙা বুটি, করলা বুটি, তারা বুটি, সূর্য বুটি, ঢেউ বুটি ও চমচম বুটির মতো নানা নাম প্রচলিত রয়েছে। এসব নকশার দিকে তাকালে বাংলার প্রকৃতি ও মানুষের প্রতিদিনের জীবনের অনেক পরিচিত দৃশ্যের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। একটি ফুল, পাতা কিংবা মাছও তাঁতির হাতে হয়ে ওঠে শাড়ির সৌন্দর্যের অংশ।
রঙের খেলাও কম নয়
নকশার পাশাপাশি টাঙ্গাইল শাড়ির রঙেও রয়েছে বৈচিত্র্য। সাদা-লাল, সাদা-কালো কিংবা সাদা-নীলের মতো চিরাচরিত রঙের সমন্বয়ের পাশাপাশি এখন প্যাস্টেল, মাটি রঙ, গাঢ় নীল, সবুজ, হলুদ, গোলাপি, মেরুন, বেগুনি ও কালোর নানা শেডের শাড়িও তৈরি হচ্ছে। উৎসবের জন্য অনেকেই উজ্জ্বল রঙের টাঙ্গাইল বেছে নেন। আবার প্রতিদিন পরার জন্য হালকা রঙের সুতি শাড়ির চাহিদাও রয়েছে। সহজে পরা যায়, শরীরে স্বস্তি দেয় এবং নানা বয়সে মানিয়ে যায় বলেই দৈনন্দিন পোশাক হিসেবেও এর জনপ্রিয়তা কমেনি।
সময়ের সঙ্গে নকশায় পরিবর্তন
টাঙ্গাইলে তো বটেই, জেলার বাইরেও এখন টাঙ্গাইল শাড়ির কাজ হচ্ছে। দেশীয় বিভিন্ন ব্র্যান্ড তাঁতিদের কাছ থেকে থান কাপড় সংগ্রহ করে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী নকশা ও পাড় তৈরি করিয়ে শাড়ি বাজারজাত করছে। নিমাই চন্দ্র বসাক জানান, ১২ থেকে ১৪ হাতের শাড়িতে ঐতিহ্যবাহী নকশার পাশাপাশি বিভিন্ন ব্র্যান্ড নিজেদের পছন্দমতো নকশি পাড় ও অন্যান্য কাজ করিয়ে নিচ্ছে। কোনো কোনো ফ্যাশন হাউজ টাঙ্গাইলের থান কাপড়ে ডিজিটাল প্রিন্টও করছে। সময়ের সঙ্গে শাড়ির নকশা ও তৈরির পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক। পাথরাইলের তাঁতিদের অনেকেই মনে করেন, নতুন সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিকায়ন প্রয়োজন। তবে সেই পরিবর্তনের মধ্যেও টাঙ্গাইল শাড়ির নিজস্ব বয়নরীতি ও ঐতিহ্য ধরে রাখাটা জরুরি।
তাঁতের কাজে পরিবারের সবাই
টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিবারভিত্তিক কাজের ধারা। একটি তাঁতঘরে শুধু তাঁতিই কাজ করেন না। সুতা প্রস্তুত করা, রং দেওয়া, মাড় দেওয়া, বুনন এবং শাড়ির শেষ কাজসহ বিভিন্ন ধাপে পরিবারের একাধিক সদস্য যুক্ত থাকেন। এইভাবেই একটি পরিবার থেকে আরেক প্রজন্মে বয়নকৌশল ছড়িয়ে পড়ে। ফলে টাঙ্গাইল শাড়ির প্রতিটি বুননের সঙ্গে শুধু একজন কারিগরের দক্ষতার পাশাপাশি একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাও যুক্ত থাকে।
দরদাম
টাঙ্গাইল শাড়ির দাম নির্ভর করে কাপড়ের মান, সুতা, নকশা, বুনন ও কারিগরি কাজের ওপর। সাধারণ শাড়ির দাম কয়েকশ টাকা থেকে শুরু হলেও ভালো মানের ও জটিল নকশার শাড়ির দাম কয়েক হাজার টাকা। বিশেষ কাজ, উন্নত মানের সুতা ও দীর্ঘ সময়ের শ্রমে তৈরি শাড়ির দাম এক লাখ বা দেড় লাখ টাকা পর্যন্তও হয়ে থাকে।
- বিষয় :
- শাড়ি
- টাঙ্গাইল
- টাঙ্গাইল শাড়ি