ঢাকা শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ক্যাফেইনের প্রভাব সবার শরীরে এক নয় কেন?

ক্যাফেইনের প্রভাব সবার শরীরে এক নয় কেন?
×

ছবি: সংগৃহীত

বিবিসি

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৪:৫৩ | আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৫:১১

সকাল শুরু করতে কিংবা কাজের ফাঁকে সতেজ থাকতে অনেকেরই পছন্দ এক কাপ কফি। কারও কাছে কফি দিনের ক্লান্তি কাটানোর সঙ্গী, আবার কারও কাছে মনোযোগ ধরে রাখার উপায়। তবে কফি পান করার পর সবার শরীরে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। কেউ এক কাপ কফি খেলেই চনমনে হয়ে ওঠেন, আবার কেউ কফি পান করেও তেমন কোনো পরিবর্তন অনুভব করেন না। কারও ক্ষেত্রে রাতে ঘুমাতেও সমস্যা হতে পারে।

এর মূল কারণ কফিতে থাকা ক্যাফেইন শরীরে একেকজনের ক্ষেত্রে একেকভাবে কাজ করে। ক্যাফেইন কত দ্রুত শরীরে ভাঙে, জিনগত বৈশিষ্ট্য, নিয়মিত কফি পানের অভ্যাস, ধূমপান, কিছু ওষুধ এবং জীবনযাপনের মতো বিষয় এতে প্রভাব ফেলে।

ক্যাফেইন কীভাবে কাজ করে

ক্যাফেইন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত উদ্দীপক পদার্থগুলোর একটি। প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে ২০০ কোটির বেশি কাপ কফি পান করা হয়। কফি ছাড়াও চা, কোমল পানীয়, এনার্জি ড্রিংক, চকলেট, চুইংগাম ও কিছু স্পোর্টস সাপ্লিমেন্টে ক্যাফেইন থাকে। ক্যাফেইন শরীরে প্রবেশের পর মস্তিষ্কে অ্যাডেনোসিন নামের একটি রাসায়নিকের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করে। অ্যাডেনোসিন সাধারণত শরীরে ক্লান্তি ও ঘুমভাব তৈরি করে। ফলে ক্যাফেইন সাময়িকভাবে সতর্কতা ও মনোযোগ বাড়াতে এবং ক্লান্তির অনুভূতি কমাতে পারে।

শরীরে কতক্ষণ থাকে ক্যাফেইন

ক্যাফেইন দ্রুত শরীরে শোষিত হয় এবং পরে লিভারের এনজাইমের মাধ্যমে ভেঙে যায়। নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির পুষ্টিবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক মেরিলিন কর্নেলিসের মতে, ব্যক্তিভেদে শরীরে ক্যাফেইন ৬ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত থাকতে পারে। তাই কেউ বিকেলে কফি খেলেও রাতে সহজে ঘুমাতে পারেন, আবার কারও ক্ষেত্রে একই সময়ে কফি পান করলে ঘুমে সমস্যা হতে পারে। একাধিক কাপ কফি পান করলে শরীরে ক্যাফেইনের মাত্রা বেড়ে অস্থিরতা বা উদ্বেগও দেখা দিতে পারে।

জিনেরও ভূমিকা আছে

ক্যাফেইন শরীরে কত দ্রুত ভাঙবে, তার ওপর জিনগত বৈশিষ্ট্যেরও প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে সিওয়াইপি১এ২ নামের একটি জিন ক্যাফেইন বিপাকের সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষের জিনগত পার্থক্যের কারণে কারও শরীরে ক্যাফেইন তুলনামূলক দ্রুত ভেঙে যায়, আবার কারও ক্ষেত্রে ধীরে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপীয় ও দক্ষিণ আমেরিকান জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্যাফেইন বিপাকের গড় গতিতেও পার্থক্য রয়েছে।

ধূমপান ও কিছু ওষুধের প্রভাব

ধূমপান ক্যাফেইন দ্রুত ভাঙতে সহায়তা করতে পারে। ফলে নিয়মিত ধূমপানকারীদের শরীরে ক্যাফেইনের প্রভাব তুলনামূলক কম সময় স্থায়ী হতে পারে। ধূমপান ছেড়ে দিলে আবার ক্যাফেইনের প্রভাব বেশি অনুভূত হতে পারে। এ ছাড়া কিছু অ্যান্টিবায়োটিক, জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি এবং নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ শরীরে ক্যাফেইন ভাঙার প্রক্রিয়া ধীর করে দিতে পারে। গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তনের কারণেও ক্যাফেইন বিপাকের গতি কমে যেতে পারে।

নিয়মিত কফি পান করলে সহনশীলতা বাড়ে

নিয়মিত ক্যাফেইন গ্রহণের ফলে শরীর ধীরে ধীরে এর সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। ফলে আগে যে পরিমাণ ক্যাফেইনে সতেজতা অনুভূত হতো, পরে একই পরিমাণে তেমন প্রভাব নাও দেখা যেতে পারে।কয়েক সপ্তাহ ক্যাফেইন থেকে বিরতি নিলে এই অভ্যাসগত সহনশীলতা কিছুটা কমে যেতে পারে। তখন আবার কফি পান করলে আগের তুলনায় বেশি প্রভাব অনুভূত হতে পারে।

 ঘুমের আগে কতক্ষণ ক্যাফেইন এড়াবেন

ঘুমের ওপর ক্যাফেইনের প্রভাব এড়াতে বিশেষজ্ঞরা ঘুমানোর অন্তত ছয় ঘণ্টা আগে ক্যাফেইন গ্রহণ বন্ধ রাখার পরামর্শ দেন। ঘুম বিশেষজ্ঞ লিন্ডসে ব্রাউনিংয়ের মতে, ক্যাফেইন ঘুমের মানেও প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন, রাত ১০টায় ঘুমানোর অভ্যাস থাকলে দুপুর ২টার পর ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা যেতে পারে। তবে ক্যাফেইনের প্রতি সংবেদনশীলতা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হওয়ায় সবার জন্য একই সময়সীমা প্রযোজ্য নয়।

গর্ভাবস্থায় সতর্কতা জরুরি

গর্ভবতীদের ক্যাফেইন গ্রহণের পরিমাণ সীমিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস) দিনে ২০০ মিলিগ্রামের কম ক্যাফেইন গ্রহণের পরামর্শ দেয়। অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ কম ওজনের শিশুর জন্মসহ কিছু জটিলতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

পরিমিত কফিতে থাকতে পারে উপকারও

ক্যাফেইন পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করলে সাধারণত নিরাপদ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। অতিরিক্ত মাত্রায় ক্যাফেইন গ্রহণে সমস্যা হতে পারে, বিশেষ করে ঘনীভূত ক্যাফেইনযুক্ত পণ্য থেকে গুরুতর বিষক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এদিকে পর্যবেক্ষণভিত্তিক কিছু গবেষণায় পরিমিত কফি পানকারীদের মধ্যে কয়েকটি গুরুতর রোগের ঝুঁকি কম এবং আয়ু তুলনামূলক বেশি হওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এসব গবেষণা থেকে কফিই সরাসরি ওই উপকারের কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। ক্যাফেইনের প্রভাব ব্যক্তিভেদে বুঝে পরিমাণ ও সময় ঠিক করাই গুরুত্বপূর্ণ।
 

আরও পড়ুন

×