মহাকবি ফেরদৌসীর জীবনের শেষ এক ঘণ্টাকে কেন্দ্র করে একক নাটক
অভিনেতা ও নির্দেশক খন্দকার শাহ আলম। ছবি: অভিনেতার সৌজন্যে
বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬ | ২০:০০
ইরানের জাতীয় কবি ও বিশ্বসাহিত্যের অনন্য মহাকাব্য ‘শাহনামা’র রচয়িতা মহাকবি ফেরদৌসীর জীবন ও সৃষ্টিকে কেন্দ্র করে নতুন মঞ্চনাটক ‘মহাকবি ফেরদৌসী’ নিয়ে দর্শকের সামনে আসছে দেশের ঐতিহ্যবাহী নাট্যদল বাংলাদেশ থিয়েটার। নাটকটি রচনা করেছেন নাট্যকার অপূর্ব কুমার কুণ্ডু এবং নির্দেশনায় রয়েছেন বাংলাদেশ থিয়েটারের দলীয় প্রধান অভিনেতা ও নির্দেশক খন্দকার শাহ আলম। এটি বাংলাদেশ থিয়েটারের ১৮তম প্রযোজনা হিসেবে মঞ্চে আসছে।
নাটকটির কাহিনি আবর্তিত হয়েছে মহাকবি ফেরদৌসীর জীবনের অন্তিম সময়ের শেষ এক ঘণ্টাকে কেন্দ্র করে।
ইরানের তুস নগরে নিজ গৃহের সামনে বসে আশি বছর বয়সী ফেরদৌসী জোহরের নামাজ শেষে অপেক্ষা করছেন গজনির সুলতান মাহমুদের পাঠানো উপঢৌকনের জন্য। সেই প্রতীক্ষার মুহূর্তে স্মৃতির পর্দায় একে একে ভেসে ওঠে তাঁর সমগ্র জীবনের নানা ঘটনা, সংগ্রাম, বেদনা ও সৃষ্টির ইতিহাস।
নাটকে উঠে এসেছে ফেরদৌসীর জন্মের সময় তাঁর বাবার স্বপ্নদর্শন, শৈশবে বাবার সান্নিধ্যে দেহান সম্প্রদায়ের চারণ কবিতা শোনার অভিজ্ঞতা এবং কবি হিসেবে বেড়ে ওঠার গল্প। একইসঙ্গে দেখানো হয়েছে কবি-বন্ধু দাকিকির কাছ থেকে ‘শাহনামা’ রচনার দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টি। বন্ধু লস্করির সহায়তায় পারস্যের রাজকাহিনি সংগ্রহ, স্ত্রীর অনুপ্রেরণায় সাহিত্যসাধনায় আত্মনিয়োগ এবং তুস নগরের গভর্নর মনসুরের আর্থিক সহযোগিতায় মহাকাব্য রচনার ঘটনাও নাটকের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
নাটকে গজনির রাজসভায় ফেরদৌসীর সংগ্রামী যাত্রাও বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কবি আনসারি, ফারুকি ও আসজাদির মতো প্রতিষ্ঠিত কবিদের বিরূপ আচরণ, বীর মোহেক বাহাদুরের সহায়তায় রাজসভায় প্রবেশ এবং সুলতান মাহমুদের পৃষ্ঠপোষকতায় দীর্ঘদিন ‘শাহনামা’ রচনার ইতিহাস নাটকে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে মহাকাব্যের প্রতিটি পংক্তির বিনিময়ে প্রতিশ্রুত সমসংখ্যক স্বর্ণমুদ্রা না পেয়ে প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠেন ফেরদৌসী। সেখান থেকেই শুরু হয় সুলতানের সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্ব ও বিরোধ।
নাটকে আরও উঠে এসেছে জীবনের শেষপ্রান্তে ফেরদৌসীর দীর্ঘ পলায়নপর অধ্যায়। আত্মরক্ষার্থে তাঁকে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছুটে বেড়াতে হয়েছে বছরের পর বছর। এই সময় বিজ্ঞানী আল বেরুনি ও খলিফা কাদির বিল্লার মতো ব্যক্তিত্ব তাঁর পাশে দাঁড়ান আশ্রয়দাতা হিসেবে। পরে সুলতান মাহমুদের অনুশোচনা, তুস নগরে ফেরদৌসীর প্রত্যাবর্তন এবং অবশেষে ষাট হাজার স্বর্ণমুদ্রা পাঠানোর ঘটনাও নাটকের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।
নাটকের শেষাংশে দেখা যাবে, মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ফেরদৌসী অপেক্ষা করছেন সেই পুরস্কারের জন্য, যা তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি হওয়ার কথা ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি কি সেই স্বর্ণমুদ্রা হাতে পেয়েছিলেন? নাকি অপূর্ণই থেকে গিয়েছিল তাঁর স্বপ্ন? একইসঙ্গে কাশফ নদীতে সেতু ও তীরে বাঁধ নির্মাণের যে মহৎ পরিকল্পনা তিনি করেছিলেন, তা বাস্তবায়িত হয়েছিল কিনা–এসব প্রশ্নের উত্তর নিয়েই এগিয়ে যায় নাটক ‘মহাকবি ফেরদৌসী’।
নাট্যকার অপূর্ব কুমার কুণ্ডু জানান, ইরানি চলচ্চিত্র, পারস্য সাহিত্য এবং পূর্বে রচিত শেখ সাদী ও জালালউদ্দীন রুমীবিষয়ক নাটকের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি ফেরদৌসীকে নতুনভাবে আবিষ্কারের চেষ্টা করেছেন। তিনি জানান, ‘শাহনামা’র অনুবাদক মনির উদ্দীন ইউসুফ, ঢাকার ইরানি কালচারাল সেন্টার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সি বিভাগ এবং বাংলাদেশ থিয়েটারের প্রাণপুরুষ খন্দকার শাহ আলমের সহযোগিতায় নাটকটির গবেষণা ও নির্মাণকাজ এগিয়েছে। তাঁর বিশ্বাস, নাটকটি দর্শকদের নতুন এক নান্দনিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করবে।
নাটকের নাম ভূমিকায় অভিনয় করছেন খন্দকার শাহ আলম। তিনি বলেন, প্রায় তিন দশকের মঞ্চজীবনে পারস্য সভ্যতার অন্যতম আলোকবর্তিকা মহাকবি ফেরদৌসীকে মঞ্চে তুলে ধরার ইচ্ছা তাঁর দীর্ঘদিনের। দর্শকদেরও আগ্রহ আছে মহাকবি ফেরদৌসীর জীবনীকে জানার। তাদের কথা ভেবেই প্রযোজনাটি শুরু করেছি।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নাট্য মঞ্চায়নের অভিজ্ঞতা নির্দেশককে এই নির্মাণে অনুপ্রাণিত করেছে। ইতিহাস ও কল্পনার সংমিশ্রণে নির্মিত এ নাটক বর্তমান বিভাজিত বিশ্ববাস্তবতায় মানবিকতা, সমন্বয় ও আলোর বার্তা বহন করবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি আরও বলেন, ‘মঞ্চে নতুন নাটক কম হচ্ছে। পুরোনা কিছু প্রযোজনাই ঘুরেফিরে দেখছেন দর্শক। ঢাকা মঞ্চে দর্শকের নতুন নাটক দেখার আগ্রহ প্রবল। যখনই নতুন কোন নাটক মঞ্চ আসছে দর্শক তা দলবেঁধে উপভোগ করে। বাংলাদেশ থিয়েটারের দলগত শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে নাটকটির মহড়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহড়া কক্ষে চলবে আরও কয়েকদিনের মহড়া। চেষ্টা করছি যাতে ভালোভাবে মঞ্চে চরিত্রটি ফুটিয়ে তোলা যায়। সবিকছু ঠিক থাকলে ঈদের পরপরই নাটকটি মঞ্চে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।’
