ইরান যুদ্ধের ৬ মাস
সর্বোচ্চ নেতার আড়ালে থাকা নিয়ে প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে
রয়টার্সে প্রকাশিত প্রতিবেদন। স্ক্রিনশট
রয়টার্স
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ২০:০৩ | আপডেট: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ২০:২৩
যুদ্ধ শুরুর পর ছয় মাস কেটে গেলেও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি প্রকাশ্যে আসেননি বা বক্তব্য দেননি। সংঘাতের শুরুতে তিনি গুরুতর আহত হন। সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পেলেও তাঁর অন্তরালে থাকাটা নেতৃত্বের কেন্দ্রে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি করেছে।
বর্তমানে মোজতবার শারীরিক অবস্থা ও ভূমিকা নিয়ে ক্রমেই জোরালো প্রশ্ন উঠছে। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধ নিয়ে তেহরানকে গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। নাজুক অর্থনীতি আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
দেশটির কর্মকর্তা ও শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন সূত্র জানিয়েছেন, মোজতবা এখনও ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিয়ন্ত্রণে আছেন। নিরাপত্তার কারণে তিনি আড়াল থেকে দেশ পরিচালনা করছেন। মুখের গুরুতর আঘাত থেকে সেরে উঠছেন। প্রতিদিনকার কাজগুলো কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার ওপর ন্যস্ত করেছেন।
যুদ্ধের প্রথম এক সপ্তাহের মাথায় দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত মোজতবার কোনো ছবি, ভিডিও বা অডিও বার্তা প্রকাশ হয়নি। ফলে তাঁর অবস্থা নিয়ে ইরানিদের মধ্যে সংশয় ক্রমশ বাড়ছে। অন্তরালে থাকার এই ঘটনা এমন একটি দেশে ঘটছে, যেখানে সর্বোচ্চ নেতার কথাই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়।
ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের অ্যালেক্স ভাতানকা বলেন, ‘মোজতবা বেঁচে আছেন কি না, সেটা এখন প্রশ্ন নয়। বরং ইরানে আদৌ একজন কার্যকর সর্বোচ্চ নেতা আছেন কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।’
ইরানিদের উদ্দেশে মোজতবার বার্তাগুলো এসেছে কয়েকটি লিখিত বিবৃতির মাধ্যমে। টেলিভিশনের সংবাদ উপস্থাপকেরা সেগুলো পড়ে শুনিয়েছেন। এমনকি গত মাসে তাঁর বাবার শেষ বিদায়ের সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানেও তাঁকে দেখা যায়নি।

শীর্ষ কর্মকর্তা ও সরকার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা বলছেন, হত্যাচেষ্টার আশঙ্কায় মোজতবা প্রকাশ্যে আসছেন না। তিনি নিয়মিত শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন এবং প্রতিটি বড় ইস্যুতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ১০ আগস্ট বলেন, তিনি সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে ৭ ঘণ্টার একটি বৈঠক করেছেন।
তবে এসব ভাষ্যের পরও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কট্টর সমর্থকদের মধ্যে সংশয় তৈরি হচ্ছে। ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য পরিচিত শহর কোমে বাসিজ বাহিনীর এক সদস্য বলেন, ‘আমাদের নেতার কণ্ঠ শুনতে হবে। অথবা অন্তত এমন কোনো প্রমাণ দেওয়া উচিত, যা দেখে মনে হবে তিনি আছেন এবং দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এতে আমাদের মাঝে আত্মবিশ্বাস বাড়বে।’
বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় বাসিজ বাহিনীর ওই সদস্য নাম প্রকাশ করতে চাননি। কিছুটা সংশয় থাকলেও তিনি মনে করেন, মোজতবাই দেশের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। একইসঙ্গে স্বীকার করেন, একটি ছবিও প্রকাশ না হওয়ায় সমর্থকদের মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অন্যদিকে, শাসনব্যবস্থার বিরোধী ও সংস্কারপন্থীরা মোজতবার আড়ালে থাকা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলছেন। এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘মোজতবা যে নিহত হননি, সেটি আমরা কীভাবে নিশ্চিত হবো? তিনি যে জীবিত আছেন, এর পক্ষেও তো কোনো প্রমাণ নেই। বিষয়টি যুক্তিসঙ্গত মনে হচ্ছে না।’
আইআরজিসি ও ক্ষমতা কাঠামো
ছয় মাসের যুদ্ধে অনেক ক্ষতি হলেও ইরান এখনও টিকে আছে। দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। সামরিক বাহিনীও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি এবং মার্কিন মিত্রদের ওপর হামলা চালাতে সক্ষম।

শাসনব্যবস্থা দেখিয়েছে, সর্বোচ্চ নেতা ও শীর্ষ কমান্ডারদের হারিয়েও তারা ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে। ধর্মীয় আদর্শের প্রতি অনুগত রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বে ধারাবাহিকতাও বজায় আছে। তবে সংঘাতের খরচ ও তেল রপ্তানির অবরোধ; ইরানের অর্থনীতিকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। দেশটির মুদ্রা রিয়ালের মান ব্যাপকভাবে কমে গেছে। যা নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
এ অবস্থায় শাসকগোষ্ঠী নিজেদের পুনর্গঠিত করেছে। তাদের লক্ষ্য রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখা, প্রতিরোধক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে দেশকে অস্থিতিশীল হতে না দেওয়া।
সূত্রগুলো বলছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদকে ঘিরে একটি কাঠামো গড়ে উঠেছে। সেখানে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছে। ক্ষমতা কাঠামোর এই স্তরে আইআরজিসির শীর্ষ কমান্ডারদের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের মতো রাজনৈতিক নেতারা আছেন।
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা ইরানি সূত্রগুলো জানিয়েছেন, মোজতবা এই শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত আছেন। সব বড় সিদ্ধান্তেও তাঁর চূড়ান্ত অনুমোদন আছে।
এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, খুব অল্পসংখ্যক ব্যক্তি মোজতবার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ পান। তাঁর কোনো তথ্য বা ছবি প্রকাশ করা হচ্ছে না। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র এখনও লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।
মোজতবা সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন বলে জানিয়েছেন তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের একজন। ওই ব্যক্তির ভাষ্য, সর্বোচ্চ নেতার শারীরিক অবস্থারও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
- বিষয় :
- মোজতবা খামেনি
- ইরান
- যুদ্ধ