প্রযুক্তি বিপ্লব
ব্যবসায় এআই এবং আমাদের প্রস্তুতি
মামুন রশীদ
মামুন রশীদ
প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৩ | আপডেট: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে আমাদের আলোচনায় এখনও এক ধরনের কৌতূহল, ভয় ও অতিরঞ্জন একসঙ্গে কাজ করে। কেউ মনে করেন, এআই সব চাকরি খেয়ে ফেলবে। কেউ মনে করেন, এআই মানেই কিছু চ্যাটবট, ছবি বানানো বা পরীক্ষার উত্তর লেখা। বাস্তবতা, এর কোনোটিই একা নয়। এআই আসলে ব্যবসার ভেতরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার খরচ কমিয়ে দিচ্ছে। অর্থনীতির ভাষায় যখন কোনো কিছুর খরচ দ্রুত কমে, তখন সেটি শুধু একটি পণ্য বা প্রযুক্তি থাকে না; উৎপাদন ব্যবস্থার অংশ হয়ে যায়।
শিল্পবিপ্লব বদলে দিয়েছিল পেশিশক্তির ব্যবহার। বিদ্যুৎ বদলে দিয়েছিল কারখানা। ইন্টারনেট বদলে দিয়েছিল তথ্যের প্রবাহ। এআই বদলে দিচ্ছে সিদ্ধান্ত, পূর্বাভাস, গ্রাহক-সংলাপ, বিপণন, হিসাব, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদনের গতি। এই পরিবর্তন শুধু যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা ইউরোপে ঘটছে না। বাংলাদেশেও ঘটবে। বরং বাংলাদেশের মতো শ্রমঘন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসানির্ভর অর্থনীতিতে এর প্রভাব অনেক গভীর হতে পারে।
বিশ্বে বড় বড় কোম্পানি ইতোমধ্যে এআইকে কেবল পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি হিসেবে দেখছে না। তারা একে উৎপাদনশীলতা, খরচ নিয়ন্ত্রণ ও গ্রাহক ধরে রাখার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ব্যাংকিংয়ে জালিয়াতি শনাক্তকরণ, খুচরা ব্যবসায় পণ্যের চাহিদা অনুমান, ই-কমার্সে ব্যক্তিগত অফার, কল সেন্টারে তাৎক্ষণিক উত্তর, উৎপাদনে গুণগত মান যাচাই– প্রায় সবকিছুতেই এআই ঢুকে পড়েছে। এআই এখন আর ‘ভবিষ্যৎ’ নয়; এটি বর্তমান প্রতিযোগিতার নিয়ম বদলে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য প্রশ্ন তাই এআই আসবে কিনা– সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা এআইকে আমদানিকৃত সফটওয়্যার হিসেবে ব্যবহার করব, নাকি নিজেদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা তৈরির হাতিয়ার বানাব। এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ এত দিন বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করেছে মূলত সস্তা শ্রম, উদ্যোক্তার ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা এবং দ্রুত অভিযোজনের ওপর দাঁড়িয়ে। কিন্তু আগামী দশকে শুধু সস্তা শ্রম যথেষ্ট হবে না। ক্রেতা চাইবে দ্রুত ডেলিভারি, কম ত্রুটি, স্বচ্ছ সরবরাহ ব্যবস্থা, ব্যক্তিকেন্দ্রিক সেবা এবং ডেটা-সমর্থিত সিদ্ধান্ত। এখানে এআই আমাদের জন্য যেমন হুমকি, তেমন সুযোগও।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সুযোগটি বড় করপোরেট নয়, বরং ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়। আমাদের অর্থনীতির প্রাণ সেখানে। কিন্তু এসব ব্যবসার বেশির ভাগেরই আলাদা ডেটা অ্যানালিটিকস টিম নেই; কাস্টমার সার্ভিস টিম নেই। উন্নত বিপণন কাঠামো নেই; ইনভেন্টরি পূর্বাভাসের ব্যবস্থা নেই। এআই এই ঘাটতি আংশিকভাবে পূরণ করতে পারে। একজন ছোট উদ্যোক্তা যদি জানতে পারেন কোন গ্রাহক আবার কিনতে পারেন, কোন এলাকায় কোন পণ্যের চাহিদা বাড়ছে, কোন গ্রাহকের অভিযোগ আগে সমাধান করা জরুরি, তাহলে তাঁর ব্যবসার সিদ্ধান্ত হবে অনেক বেশি তথ্যভিত্তিক।
অনেকে এআইকে শুধু স্টার্টআপের বিষয় মনে করেন, যা একেবারেই ভুল। তৈরি পোশাক খাতে এআই ব্যবহার হতে পারে চাহিদার পূর্বাভাস, ডিজাইন ট্রেন্ড বিশ্লেষণ, মান নিয়ন্ত্রণ ও উৎপাদন পরিকল্পনায়। কৃষিতে ব্যবহার হতে পারে আবহাওয়া, মাটি, রোগবালাই ও বাজারদর বিশ্লেষণে। ব্যাংকিংয়ে ব্যবহার হতে পারে ঋণ ঝুঁকি, জালিয়াতি শনাক্তকরণ ও ক্ষুদ্র ব্যবসার বিকল্প ক্রেডিট স্কোরিংয়ে। লজিস্টিকসে ব্যবহার হতে পারে রুট অপটিমাইজেশন, ডেলিভারির সময় অনুমান ও যানবাহন ব্যবহারের দক্ষতা বাড়াতে। এমনকি সরকারি সেবায়ও এআই নাগরিকের আবেদন, অভিযোগ ও সেবা পাওয়ার সময় কমাতে পারে যদি তা দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এখানে একটি সতর্কতা জরুরি।
এআই কোনো জাদুর কাঠি নয়। ভুল ডেটা দিলে ভুল সিদ্ধান্তই দেবে। পক্ষপাতদুষ্ট ডেটা দিলে পক্ষপাতদুষ্ট ফলই দেবে। ব্যবসার প্রক্রিয়া অগোছালো থাকলে এআই সেই অগোছালোতাকে আরও দ্রুত করবে। তাই এআই বাস্তবায়নের আগে ব্যবসাকে নিজের ডেটা, প্রক্রিয়া ও জবাবদিহি ঠিক করতে হবে। শুধু একটি চ্যাটবট বসালেই ডিজিটাল রূপান্তর হয় না। একটি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়, হিসাব, গ্রাহকসেবা, সরবরাহ ও মানবসম্পদ– সব জায়গায় ডেটা প্রবাহ তৈরি করতে হয়।
বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য এখানেই মূল শিক্ষা। আমাদের এআই নীতি দরকার, কিন্তু নীতিপত্রের চেয়ে বেশি দরকার বাস্তবায়নের ইঞ্জিন। প্রথমত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার জন্য এআই গ্রহণে ভাউচার বা কর-সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংক, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা ও রপ্তানিমুখী শিল্পে নিয়ন্ত্রিত এআই স্যান্ডবক্স দরকার, যাতে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করে উদ্ভাবন পরীক্ষা করা যায়। তৃতীয়ত, ডেটা সুরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা ও অ্যালগরিদমিক জবাবদিহির কাঠামো দ্রুত স্পষ্ট করতে হবে। চতুর্থত, এআইভিত্তিক রপ্তানি সেবাকে আলাদা অগ্রাধিকার খাত হিসেবে দেখা উচিত। আমরা যদি শুধু সফটওয়্যার ডেভেলপার রপ্তানির চিন্তায় আটকে থাকি, তবে বড় সুযোগ হারানোর সম্ভাবনা থাকে।

শিক্ষাব্যবস্থাকেও দ্রুত বদলাতে হবে। এআই যুগে কেবল কোড লেখা জানলেই চলবে না; সমস্যা বোঝা, তথ্যপ্রযুক্তি বোঝা, গ্রাহক বোঝা এবং ব্যবসার ফলাফল বোঝা জরুরি। একজন কৃষিবিদ যদি এআই বোঝেন; একজন ব্যাংকার যদি ডেটা বোঝেন; একজন পোশাকশিল্প ব্যবস্থাপক যদি পূর্বাভাস মডেল বোঝেন, তাহলে উৎপাদনশীলতার বিপ্লব হবে। বিপরীতে, এআই যদি কেবল কয়েক হাজার প্রযুক্তিকর্মীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে বৈষম্য বাড়বে; উৎপাদনশীলতা নয়।
চাকরির প্রশ্নটিও বাস্তব। কিছু কাজ কমবে, কিছু কাজ বদলাবে, কিছু নতুন কাজ তৈরি হবে। কল সেন্টারের একঘেয়ে কাজ কমতে পারে; কিন্তু এআই ট্রেইনার, কনভারসেশন ডিজাইনার, গ্রাহক অভিজ্ঞতা বিশ্লেষক ও অটোমেশন ম্যানেজারের চাহিদা বাড়তে পারে। হিসাবরক্ষকের কাজ শুধু ভাউচার এন্ট্রি থেকে সরে গিয়ে ব্যতিক্রম শনাক্তকরণ ও সিদ্ধান্ত সহায়তায় যাবে। বিপণনকর্মীর কাজ শুধু বিজ্ঞাপন চালানো নয়; গ্রাহকের আচরণ বুঝে কৌশল তৈরিতে যাবে। অর্থাৎ মানুষ অপ্রয়োজনীয় হবে না। কিন্তু যিনি এআই ব্যবহার করতে পারবেন না, তাঁর দক্ষতা দ্রুত পুরোনো হয়ে যাবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন একটি নতুন বিভাজন তৈরি হচ্ছে। একদিকে থাকবে সেই প্রতিষ্ঠান, যারা এআইকে খরচ কমানোর অস্থায়ী টুল হিসেবে দেখবে। অন্যদিকে থাকবে সেই প্রতিষ্ঠান, যারা এআইকে উৎপাদনশীলতা, গুণগত মান, গ্রাহক ধরে রাখা এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের অবকাঠামো হিসেবে ব্যবহার করবে। দ্বিতীয় দলটি ভবিষ্যৎ জিতবে।
আমাদের বড় ভুল হবে এআইকে শুধু প্রযুক্তির আলোচনায় আটকে রাখা। বাংলাদেশ যদি পোশাক, রেমিট্যান্স ও কম খরচের শ্রমের বাইরে পরবর্তী প্রবৃদ্ধির উৎস খুঁজতে চায়, তাহলে এআইভিত্তিক সেবা, অটোমেশন ও বুদ্ধিমান ব্যবসা-প্রক্রিয়া হতে পারে রপ্তানির বড় সুযোগ। ব্যবসার ভবিষ্যৎ বদলে দেবে এআই– এটি এখন আর আগাম বার্তা নয়। বাংলাদেশের জন্য আসল প্রশ্ন– আমরা কি এই পরিবর্তনের ভোক্তা হয়ে থাকব, নাকি নির্মাতা হবো। ইতিহাস বলছে, যারা প্রযুক্তি দেরিতে গ্রহণ করে, তারা বাজার হারায়। কিন্তু যারা নিজের বাস্তব সমস্যাকে প্রযুক্তির মাধ্যমে সমাধান করে, তারা নতুন বাজার তৈরি করে। বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের সেই ক্ষমতা আছে। উদীয়মান কিছু এআই স্টার্টআপ ইতোমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে। এখন দরকার রাষ্ট্রের দূরদৃষ্টি, প্রতিষ্ঠানের সাহস এবং দক্ষ মানুষের দ্রুত প্রস্তুতি।
মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক; স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান শপআপ ও এআই প্রতিষ্ঠান অলিনের সঙ্গে যুক্ত
- বিষয় :
- মামুন রশীদ