ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

অর্থনীতি

শিল্প খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা

শিল্প খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা
×

মো. মহিউদ্দিন রুবেল

মো. মহিউদ্দিন রুবেল

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২০ | আপডেট: ১৬ জুলাই ২০২৬ | ১৪:৪৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের ওপর আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক এবং আগাম কর ১ শতাংশ করেছে সরকার, যা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রেয়াতি সুবিধার ফলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশের শিল্প খাত একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি– ক্রমেই জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহে অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের টেকসই উৎপাদনের ক্রমবর্ধমান চাহিদা। সব মিলিয়ে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়েছে। এ অবস্থায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে পরিচ্ছন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানির দিকে এগিয়ে নিতে পারে, এমন নীতিগত উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।

বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যার মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসবে ২০ শতাংশ। তবে বর্তমানে দেশে সরবরাহ করা বিদ্যুতের মাত্র প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ আসে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। এই বিশাল ব্যবধান পূরণ করতে হলে শুধু বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়; শিল্প, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ ভোক্তাদেরও সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান বাজেটের নীতিগত সহায়তা যদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব। বাংলাদেশের উৎপাদন খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্প দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের প্রধান ভিত্তি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাত ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় করেছে, যা দেশের মোট পণ্য রপ্তানির ৮০ শতাংশেরও বেশি। এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে শিল্প খাতের জন্য নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও পূর্বানুমানযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ অপরিহার্য।

একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাজারও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন পণ্যের মান ও দামের পাশাপাশি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সব তথ্য সম্পর্কেও জানতে আগ্রহী। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন শুধু পরিবেশগত দায়বদ্ধতার বিষয় নয়। এটি শিল্পের প্রতিযোগিতা-সক্ষমতারও অন্যতম শর্ত হয়ে উঠেছে। এ বাস্তবতায় বাজেটে ঘোষিত নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রণোদনাগুলো শিল্প খাত ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সৌরবিদ্যুৎ-সংশ্লিষ্ট এই শুল্ক-কর সুবিধা ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত কার্যকর করা হয়েছে। মাউন্টিং স্ট্রাকচার, লিথিয়াম সেল, ব্যাটারি প্যাক ও এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমের জন্য এই সুবিধা ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এবং পরিবেশবান্ধব লিথিয়াম-আয়ন ও সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি উৎপাদনে শুল্ক অব্যাহতি ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বহাল থাকবে।

বাজেটের পর সম্প্রতি এনবিআর প্রজ্ঞাপন সংশোধন করে জানিয়েছে, সৌর সরঞ্জামের ওপর ১ শতাংশ কর নেবে সরকার। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিজেদের অর্থায়নে কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করছে বিদ্যুৎ বিক্রির জন্য নয়, বরং নিজেদের জ্বালানি চাহিদার একটি অংশ নিশ্চিত করতে, উৎপাদন ব্যয় কমাতে এবং টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে। এসব উদ্যোগ আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমায়; জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ হ্রাস এবং দেশের জলবায়ু ও জ্বালানি নিরাপত্তার লক্ষ্য অর্জনেও সহায়তা করে। 

শিল্প খাতে রুফটপ সৌরবিদ্যুতের পক্ষে শক্তিশালী অর্থনৈতিক যুক্তিও রয়েছে। যে কারখানা নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করবে, ভবিষ্যতে তার জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি ও দামের অস্থিরতা কমবে। দীর্ঘমেয়াদে পরিচালন ব্যয় হ্রাস পাবে এবং বৈশ্বিক সোর্সিং গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের আকর্ষণ আরও বাড়বে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগসহ (সিপিডি) বিভিন্ন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সতর্ক করেছে; বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি প্রয়োজনীয় গুরুত্বের অভাব রয়েছে এবং এর আর্থিক ভিত্তি এখনও যথেষ্ট মজবুত নয়। এই উদ্বেগ অমূলক নয়। ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবায়নের ব্যবধান কমাতে হলে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ও পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা অপরিহার্য। অবশ্য জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলের খসড়ায় এ খাত উন্নয়নে বেশ কিছু ভালো প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো ইউলিটি স্কেল পাওয়ার প্লান্টের জন্য সরকারি পেমেন্ট গ্যারান্টির সুযোগ রাখা, যাতে দেশি ব্যাংকগুলো সহজে এ খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসে। 
যখন প্রতিযোগী উৎপাদনকারী দেশগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক শিল্পায়নকে কেন্দ্র করে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। ইতিবাচক দিক হলো, ভিত্তি ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। বাজেটের মাধ্যমে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সমর্থন করার আন্তরিকতা দেখিয়েছে। 
বাংলাদেশের সামনে এখন একই সঙ্গে দুটি জাতীয় অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে– জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা-সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। নবায়নযোগ্য জ্বালানি এ দুটি লক্ষ্য অর্জনেই সহায়ক।

লক্ষ্যটি হওয়া উচিত সহজ ও স্পষ্ট– যদি কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ করতে এবং বাংলাদেশের উন্নয়নের লক্ষ্যে অবদান রাখতে আগ্রহী হয়, তাহলে নীতি কাঠামো সেই উদ্যোগকে উৎসাহিত ও সহায়তা করবে। কয়েকটি বাস্তবসম্মত নীতিগত পরিমার্জনের মাধ্যমে এই প্রণোদনাগুলো আরও বেশি বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট এবং সরকার ও শিল্প খাতের মধ্যে কার্যকর অংশীদারিত্ব সৃষ্টি করতে পারে, যা গড়ে তুলবে একটি শক্তিশালী, টেকসই ও সহনশীল জ্বালানি ভবিষ্যৎ।

লেখক: বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক

আরও পড়ুন

×