ইতিহাস
পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রদায়িকতার ঐতিহাসিক কারণ
আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী
আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২২ | আপডেট: ১৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঊনআশি বছর আগে বাংলা ভাগ হলেও এর পক্ষে-বিপক্ষে মতামত প্রদান থামেনি। বাংলা ভাগের জন্য আমরা কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতাকে বাহবা অথবা নিন্দা জানিয়ে আসছি। আশ্চর্যের বিষয়, ১৯০৫ সালে যারা বাংলা বিভক্তির বিপক্ষে ছিলেন, তাদের উত্তরসূরিরা ১৯৪৭-এ বিভক্তির পক্ষে শক্ত অবস্থান নেন। স্বাধীনতার আগে বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে একাধিক ধারণা কাজ করছিল। একটি ধারণা– বাংলা পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্র হবে অথবা গোটা বাংলাই পাকিস্তানভুক্ত হবে। অন্য ধারণা ছিল– বাংলা বিভক্ত হয়ে একটি করে অংশ ভারত ও পাকিস্তানে যোগ দেবে। দুর্ভাগ্য, ১৯৪৭ সালের ২০ জুন যেদিন বঙ্গীয় আইনসভার সদস্যরা ভোটাভুটির মাধ্যমে বাংলার ভাগ্য নির্ধারণ করেন, তাতে স্বাধীন অখণ্ড বাংলা প্রশ্নে কোনো ভোট হয়নি। ভোট হয়েছিল বাংলা অখণ্ড থেকে পাকিস্তানভুক্ত হবে, নাকি বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তানে যোগ দেবে সে প্রশ্নে।
১৭৯৩ সালে যখন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কায়েম হয়, তখনকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের প্রায় সব জমিদারিই একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের হাতে চলে যায়। ১৭৫৭ সালে পরাজিত পক্ষের মানুষকে জমিদারি দিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মালিকপক্ষের সীমাবদ্ধতা থাকা স্বাভাবিক। ১৭৯৩ থেকে ১৯০৫; এই দীর্ঘ ১১২ বছরে জমিদাররা চতুর্থ ও পঞ্চম প্রজন্মে পৌঁছে গিয়েছিলেন। অধিকাংশ জমিদারেরই সহায়-সম্পদ বিনিয়োগ করা ছিল ভারতের তৎকালীন রাজধানী কলকাতায়। কলকাতা থেকে নিজ নিজ জমিদারির কুঠিবাড়িতে এসে আদায় করতেন খাজনাপাতি।
১৯০৫-এ বাংলা ভাগের পর সবচেয়ে বেশি শঙ্কিত হয় এই জমিদার শ্রেণি। নতুন পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ কলকাতানিবাসী জমিদার শ্রেণির স্বার্থকে সরাসরি আঘাত করে। ঢাকা পূর্ব বাংলা ও আসামের রাজধানী হলে ঢাকায় হাইকোর্ট হবে; জমিজিরাত নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা কলকাতার বদলে ঢাকায় এসে সামলাতে হবে– বিষয়টি হিন্দু জমিদার শ্রেণিকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। মূলত জমিদারি হারানো কিংবা পূর্ব বাংলায় কলকাতানিবাসী হিন্দুদের জমিদারি দুর্বল হয়ে পড়ার শঙ্কা থেকেই বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে হিন্দু প্রতিপত্তিশালীরা তীব্র অবস্থান নেন। ১৯০৫ সালের আগে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা নিয়ে বিশাল বাংলা প্রদেশ ছিল। আন্দোলনের ফলে বঙ্গভঙ্গ রদ হলো। রদ করার পর আসাম (এখনকার আসাম, মেঘালয়, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল ও মিজোরাম) এবং বাংলার সিলেট নিয়ে আসাম প্রদেশ; বিহার ও উড়িষ্যা নিয়ে পৃথক আরেকটা প্রদেশ গঠিত হলো।
১৯০৫ সালে হিন্দু জমিদারদের ভরসা ছিল হাইকোর্টে তাদের অনুকূলে রায় না গেলেও প্রিভিকাউন্সিলের আশ্রয় নেওয়া যাবে, যেখানে ব্রিটিশরাই সর্বেসর্বা। কিন্তু বাংলা স্বাধীন রাষ্ট্র হলে জমিদারি স্বার্থ দেখার জন্য প্রিভিকাউন্সিলের আশ্রয় পাওয়া যাবে না। জমিদারি বজায় রাখার অর্থনৈতিক স্বার্থই ১৯৪৭ সালে বঙ্গমাতাকে দুই টুকরা করতে সহায়তা করে। অথচ ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বহাল থাকলে ১৯১১ পরবর্তী ৩৬ বৎসরে পূর্ব বাংলা ও আসামের মানুষ শিক্ষা-দীক্ষা ও চাকরিবাকরিতে অনেক অগ্রসর হতেন। এই অগ্রসরতা ও বঙ্গভঙ্গবিরোধী পূর্বতন মনোভাব একত্র হয়ে বাংলাকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সহায়ক হতে পারত।
১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে ব্রিটিশরা এ দেশে পৃথক নির্বাচনের চল করে। এই পৃথক নির্বাচনে সম্প্রদায়গতভাবে পার্লামেন্টে প্রতিনিধি নির্বাচিত হতেন। ২৫০ আসনবিশিষ্ট বঙ্গীয় আইনসভার সুনির্দিষ্ট গঠন ও আসন বিন্যাস ছিল: সাধারণ নির্বাচক আসন-৭৮ (যার মধ্যে তপশিলি জাতির জন্য সংরক্ষিত ৩০টি আসন), মুসলিম নির্বাচক আসন-১১৭, ইঙ্গ-ভারতীয় নির্বাচক আসন-৩, ইউরোপীয় নির্বাচক আসন-১১। এ ছাড়াও ছয়টি পৃথক আসন ছিল যেমন– নারী, জমিদার, শিক্ষা, শ্রমিক ইত্যাদি।
এই বিভাজনে সম্প্রদায়গতভাবে সাধারণ নির্বাচকের আড়ালে হিন্দু আসন ৭৮টি হলেও তপশিলি জাতিভুক্তদের ৩০টি আসন সংরক্ষিত থাকায় বর্ণ হিন্দুদের প্রকৃত আসন ছিল দুটি নারী আসনসহ ৫০টি, যা আইনসভার মোট আসনের মাত্র এক-পঞ্চমাংশ। এই সংখ্যা নিয়ে বর্ণ হিন্দুদের পক্ষে বাংলায় সরকার গঠন যে কোনোকালেই সম্ভব না, তা স্পষ্ট হয়েছিল। এদিকে ১৯৩৭ ও ১৯৪৬-এর নির্বাচনের ফলাফল তা প্রমাণ করে। সম্প্রদায়গতভাবে মুসলিম আসন ১১৭টির সঙ্গে দুটি সংরক্ষিত নারী আসন যোগ হয়ে মুসলিম আসন ছিল ১১৯টি, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে মাত্র ৭ কম।
বর্ণ হিন্দুরা তপশিলি জাতিভুক্তদের হিন্দু বলে স্বীকারই করতেন না। যে কারণে নমঃশূদ্র নেতা শ্রী যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল স্লোগান দিতে বাধ্য হয়েছিলেন নমঃ- মুসলিম ভাই ভাই বলে। ১৯৩৫-এর ভারত শাসন আইনের পরে বাংলায় অনুষ্ঠিত দুটি আইনসভার নির্বাচনের মাধ্যমে ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৭– এই ১০ বছরে তিনজন মুসলিম নেতা বাংলার প্রধানমন্ত্রী ও তিনজন মুসলিম স্পিকার নির্বাচিত হন। পৃথক নির্বাচনের বাস্তবতায় ব্রিটিশ ভারতের প্রভাবশালী বর্ণ হিন্দু বাঙালি সমাজ স্বাধীন অখণ্ড বাংলায় রাজনৈতিক ক্ষমতা বলয় থেকে দূরে থাকবে বলে শঙ্কিত হয়ে ওঠে। অনুমিত হতে পারে, ইঙ্গ-ভারতীয় নির্বাচক আসন, ইউরোপীয় নির্বাচক আসন ও ভারতীয় খ্রিষ্টান এবং ইঙ্গ-ভারতীয় নারীসহ মোট ১৭টি আসন স্বাধীনতার পর নিরপেক্ষ থাকবে অথবা সংখ্যাগুরুর অনুকূলে থাকবে, যা হয়তো হিন্দুদের চিরকাল বিরোধী দলের বেঞ্চেই বসতে বাধ্য করবে।

যে কোনো দেশের রাজনৈতিক অবস্থান নদীর প্রবাহের মতো। কখনও ভরা জল তো কখনও শুষ্ক মরুভূমি। তখনকার নেতৃবৃন্দ শুধু তৎকালীন বর্তমানকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। দেশভাগের পর ১৯৫১ সালে প্রথম সাধারণ নির্বাচনেই ভারত সাংবিধানিকভাবে পৃথক নির্বাচনকে বাতিল করে দিয়েছে। পাকিস্তানেও সংবিধান প্রণয়নের পর পৃথক নির্বাচন হয়নি। সংবিধান প্রণয়নের আগে পূর্ব বাংলায় ১৯৫৪ সালেই শেষবারের মতো পৃথক নির্বাচন হয়েছিল। সেই নির্বাচনেই পূর্ব বাংলা থেকে মুসলিম লীগ নিঃশেষ হতে শুরু করে। অবিভক্ত বাংলার শক্তিশালী দল কৃষক প্রজা পার্টিও বাংলাদেশে হারিয়ে গেছে। ১৯৫৪-এর নির্বাচনে বিপুল সাড়া ফেলা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী আওয়ামী লীগের কার্যক্রমই এখন নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। ভারতের স্বাধীনতায় নেতৃত্ব দানকারী কংগ্রেস এবার পশ্চিম বাংলা বিধানসভায় দুটো আসন পেয়ে অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে এবং বিগত নির্বাচনের শূন্যতা কাটিয়েছে। ৩৪ বছর রাজত্ব করা সিপিআইএম একটি আসন পেয়ে গতবারের শূন্যতা কাটিয়েছে। অন্যদিকে যে জমিদারি প্রথা বাংলা বিভক্তির পক্ষে-বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করেছিল, তা দেশভাগের অল্প দিন পরেই উভয় অংশ হতে বিলীন হয়েছে।
তিনটি প্রধান ধর্মে বিন্যস্ত লেবানন সাংবিধানিকভাবেই একেক ধর্ম থেকে প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারের বিধান রেখে দিয়েছে। ১৯৪৭-এর নেতারা পাকিস্তান বা ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে দুই প্রধান ধর্মের রাজনৈতিক সমঝোতার রূপরেখা নিয়ে ভাবলে স্বাধীন অখণ্ডিত বাংলা একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হতে পারত। ১৯৪৭-এর একটি অসংশোধনযোগ্য সিদ্ধান্তই বিপুলসংখ্যক মানুষকে বাস্তুচ্যুত করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি শত্রুভাবাপন্ন করে তুলেছে। ইতিহাসের পথপরিক্রমায় মুহূর্তের একটি সিদ্ধান্ত উভয় অংশের জনগণের কাছে অনন্তকাল ধরে দুর্ভোগের কারণ হয়ে থাকবে। বাংলার বিভক্তি এখন অসংশোধনযোগ্য বাস্তবতা। ভাষা ও সংস্কৃতি একই হলেও উভয় অংশ তিন-চার প্রজন্ম ধরে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য তৈরি করে চলেছে। সম্প্রতি পশ্চিম বাংলায় সৃষ্ট সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতা যেসব উদাহরণ তৈরি করছে, এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা বিভক্তির অনালোচিত কারণ আবারও সামনে তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: লেখক অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব
- বিষয় :
- আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী