অর্থনীতি
বিকল্প থাকা সত্ত্বেও জ্বালানির দাম কেন বাড়াল
মইনুল ইসলাম
মইনুল ইসলাম
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
এপ্রিল মাসে এক দফা বাড়ানোর মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম সরকার কেন কুড়ি টাকা করে বাড়াল তার যুক্তিসংগত কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। সরকার কিন্তু ভালো করেই জানে, একবারে এত বড় উল্লম্ফন অর্থনীতিতে বড়সড় অভিঘাত সৃষ্টি করবে। বিশেষত পেট্রোল ও অকটেনের সঙ্গে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম একই হারে বাড়ানো কোনো সুবিবেচনার স্বাক্ষর বহন করে না।
কেরোসিনের ভোক্তা প্রধানত সমাজের দরিদ্র জনগোষ্ঠী। ডিজেলের ব্যবহার শুধু পরিবহন ও শিল্পকারখানায় নয়, কৃষিতেও ব্যাপক। অন্যদিকে পেট্রোল ও অকটেন সাধারণত সমাজের উচ্চবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত অংশ ব্যবহার করে বিধায় এগুলোর দাম বাড়ার প্রভাব অর্থনীতিতে তেমন বড় হবে না। সত্য, ব্যবহার সীমিত বলে শুধু পেট্রোল ও অকটেনের দাম বাড়িয়ে সরকারের কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব মিলবে না। তাই সরকার ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাগানোকেই টার্গেট করেছে। তবে এটাও সত্য, গত এক-দেড় মাসে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমে আসার যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল, সেটা জ্বালানির দামের এই উল্লম্ফনের কারণে থেমে যাবে অথবা আবারও বিপরীতমুখী হবে। গত আগস্ট মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ২৮ শতাংশ, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে ছিল সর্বনিম্ন। এর আগে মূল্যস্ফীতির হার ৮.৫ শতাংশ থেকে ১৩ শতাংশে ঘুরপাক খাচ্ছিল। এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ যে পাকিস্তান বাদে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির হার কয়েক বছর ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়ে গেছে। ভারত এবং শ্রীলঙ্কায় মূল্যস্ফীতির হার ৪ শতাংশেরও কম।
জ্বালানির দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের লোকসান কমানোর যে অজুহাত সরকার দিয়েছে, সেটিকেও খোঁড়া বলতে হচ্ছে। কারণ, অতীতে যখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৪০ ডলারে উঠে গিয়েছিল, তখনও বাংলাদেশে সব রকম জ্বালানির দাম লিটারে ১০০ টাকার নিচে ছিল। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে যে ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছর ধরে বিপিসি মুনাফার ধারায় ছিল, শুধু এক বছর বাদে। এই ১০ বছরে বিপিসির নিট মুনাফা হয়েছে ৫৫ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। এর বিপরীতে শুধু ইরান বনাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের কারণে গত কয়েক মাসে বিপিসি লোকসানের ধারায় পড়েছে। উপরন্তু, সরকার জ্বালানি খাতে প্রায় ৩২ শতাংশ হারে শুল্ক-কর ধার্য করে চলেছে। সরকার যদি এই দাম বাড়ার বিকল্প নীতি হিসেবে জ্বালানি খাতের শুল্ক-কর সামান্য কমাতো, তাহলে অতি সহজেই এই মূল্যবৃদ্ধি এড়ানো সম্ভব হতো। এবারের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তে বিপিসির লোকসান নাকি কমবে ১০ হাজার কোটি টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয় কিংবা জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়টির কি কোনো বিশ্লেষণ করা হয়েছিল? বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) অকার্যকর করে না ফেললে তারাও এটি খতিয়ে দেখতে পারত। বর্তমানে দাম বাড়ার স্থানে ওই কমিশনের কোনো ভূমিকা ছিল না বলে জানা গেছে। আর একজন ব্যবসায়ী-অর্থমন্ত্রীর কাছে নীতি পরিবর্তনের আগে এর অর্থনৈতিক অভিঘাত সম্পর্কে গবেষণা বা গভীর বিশ্লেষণ তেমন কোনো গুরুত্ব বহন না করাই স্বাভাবিক! যে কোনো ভালো অর্থনীতিবিদই বুঝতে পারতেন যে জ্বালানির দাম বাড়ার সার্বিক অভিঘাত পুরো অর্থনীতিতে ১০ হাজার কোটি টাকার কয়েক গুণ হবে।
সরকার দাবি করছে, পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানির দাম কম থাকায় জ্বালানি চোরাচালানের আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছিল। এটা একেবারে ভুয়া যুক্তি, কারণ ভারতের কলকাতায় ডিজেলের দাম বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম। বাংলাদেশে দাম বাড়ার ফলে ডিজেলের দাম ১৫৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে, অথচ ভারতের কলকাতায় এক লিটার ডিজেলের দাম ৯৯.৫ রুপি (বাংলাদেশের ১২৮ টাকা)। সম্প্রতি সরকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার ফলে সরকারি ব্যয় বর্তমান অর্থবছরে বেড়ে যাবে ৩৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই পর্যায়ে ধাপে ধাপে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০-১৪০ শতাংশ বাড়ানোর যৌক্তিকতা আদৌ ছিল কিনা, সেটা ওয়াকিবহাল মহলের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। জ্বালানির দাম বাড়ানোর জন্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোকে অন্যতম ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচনা করলে ভুল হবে কি?

বাংলাদেশ সরকারের জ্বালানি নীতির বড় ভুল হলো আমদানীকৃত তেল এবং এলএনজির ওপর অতি নির্ভরতা। পাকিস্তানে সোলার এনার্জির উৎপাদন ইতোমধ্যে ছয় হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে, যা ওই দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশেরও বেশি। ভারতে সোলার পাওয়ার উৎপাদন ৭০ হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করেছে। অথচ বাংলাদেশে সোলার এনার্জি উৎপাদন এখনও এক হাজার ৭০০ মেগাওয়াটের কম। একটা ভয়াবহ ভুল ধারণা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের মনে গেঁথে রয়েছে যে সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেহেতু অনেক বেশি জমি প্রয়োজন, তাই ভূমি-দরিদ্র বাংলাদেশে তেমন বেশি সোলার পাওয়ার উৎপাদন করা যাবে না। এই ভুল ধারণা নিরসনের জন্য আমি অনেকগুলো কলামে সম্ভাব্য জমির সন্ধান দেওয়া শুরু করেছি। বাংলাদেশের সিলেট বিভাগে মোট ১৬৮টি চা বাগান রয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ চা সংসদের কর্তাব্যক্তিদের বয়ানে জানা গেল যে এই চা বাগানগুলোর ৫০-৫২ শতাংশ জমিতে টেকনিক্যালি চা উৎপাদন সম্ভব, বাকি জমির প্রধান অংশে চা জন্মানো প্রাকৃতিকভাবেই সম্ভব নয়। কারণ, এসব জমিতে সরাসরি সূর্যের আলো বেশি পড়ায় এগুলোতে চা গাছ বাঁচতে পারে না। তারা সরকারের কাছে দাবি করেছেন, এ ধরনের জমিতে সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের অনুমতি প্রদান করে তাদের লিজ-ডকুমেন্ট সংশোধন করা হলে দু-তিন বছরের মধ্যে চা বাগানগুলোতে সোলার প্যানেল স্থাপন করে দেশের বিদ্যুৎ গ্রিডে প্রায় দশ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ যোগ করা সম্ভব হবে। এ সম্পর্কিত প্রস্তাব নাকি বাংলাদেশ চা সংসদের কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে জেগে ওঠা চরাঞ্চলগুলো, দেশের সমুদ্র উপকূল এবং নদনদী ও খালগুলোর দুপারে সোলার প্যানেল স্থাপনের সম্ভাবনাটিও খতিয়ে দেখা হোক। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সীমানায় যে কয়েকশ চরাঞ্চল গড়ে উঠছে সেগুলোতে জনবসতি গড়ে ওঠার আগেই এগুলোতে যদি বড় বড় সৌরবিদ্যুৎ কাম-বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা অগ্রাধিকার সহকারে বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে অত্যন্ত সাশ্রয়ী পন্থায় কয়েক হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন আগামী চার-পাঁচ বছরের মধ্যেই সম্ভব হবে।
জার্মানি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে বাংলাদেশকে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বলে গত বছরের নভেম্বরে সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গিয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে জমির তুলনামূলক সস্তার প্রকৃত সমাধান পাওয়া যাবে যদি দেশের বিশাল সমুদ্র উপকূলে একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন প্লান্ট স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়। সমুদ্র উপকূলের কথা জার্মানি বলেছে, আমি এর চাইতেও সম্ভাবনাময় মনে করি বঙ্গোপসাগরে নতুন জেগে ওঠা চরাঞ্চলগুলোকে। এগুলোতে মানববসতি নেই, তাই ভূমি অধিগ্রহণের কোনো ঝামেলা হবে না। উপরন্তু, উৎপাদিত বিদ্যুৎ সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে দেশের মূল ভূখণ্ডের বিদ্যুৎ গ্রিডে নিয়ে আসাও খুব বেশি ব্যয়সাধ্য হওয়ার কথা নয়। সোলার পাওয়ার উৎপাদনে যথাযথ অগ্রাধিকার দিলে আমদানীকৃত তেল এবং এলএনজির আন্তর্জাতিক দামের ওঠানামা সামাল দেওয়ার অজুহাতে জ্বালানির দাম বাড়ার প্রয়োজন পড়ত না।
ড. মইনুল ইসলাম: একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ এবং অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- অর্থনীতি