ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

ব্যবস্থাপনা

বন্দর শুধু ব্যবসা, নাকি সার্বভৌমত্বেরও প্রশ্ন

বন্দর শুধু ব্যবসা, নাকি সার্বভৌমত্বেরও প্রশ্ন
×
×

এম এম খালেকুজ্জামান

এম এম খালেকুজ্জামান

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ১৫ বছরের চুক্তি সম্পাদিত হলো। এর মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান টার্মিনালটির পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়নের দায়িত্ব পেয়েছে। বলা যায়, দক্ষতার প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, আর্থিক স্বচ্ছতা ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের কঠিন পরীক্ষার সামনে বাংলাদেশ। 

তবে বন্দর কোনো সরকারের এক মেয়াদের সম্পদ নয়। এটি প্রজন্মের বিনিয়োগ, জাতীয় অর্থনীতির অবলম্বন, ভবিষ্যতের সম্ভাবনার প্রবেশদ্বার। তাই প্রশ্ন হলো, এই দায়িত্ব দেওয়ার বিনিময়ে বাংলাদেশ কী পাচ্ছে, কী ঝুঁকি নিচ্ছে এবং আগামী দেড় দশকে নিজের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখার জন্য কী ব্যবস্থা করছে?

দক্ষতা প্রয়োজন, কিন্তু শর্তহীন আস্থা নয়
চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যে বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৮৫ শতাংশ এই বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। দেশের সমুদ্রপথের কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৯৯ শতাংশ এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। এনসিটি একাই বন্দরের মোট কনটেইনার চলাচলের প্রায় ৪৪ শতাংশ সামলায়।
এত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনায় দীর্ঘসূত্রতা, অদক্ষতা কিংবা প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার মূল্য শুধু বন্দর কর্তৃপক্ষকে দিতে হয় না। দিতে হয় আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, শিল্পোদ্যোক্তা, শ্রমিক; শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাকেও। আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থাপনা, আধুনিক যন্ত্রপাতি, ডিজিটাল সেবা ও দ্রুত পণ্য খালাস নিশ্চিত করা গেলে তার অর্থনৈতিক সুফল অস্বীকার করার উপায় নেই। অতএব, বিদেশি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান মানেই জাতীয় স্বার্থের ক্ষতি– এমন সিদ্ধান্ত যুক্তিসংগত নয়। তবে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা আছে বলেই চুক্তিটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে–এমন ধারণাও বিপজ্জনক। দক্ষতা একটি সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনাকে জনস্বার্থে রূপান্তর করার নিশ্চয়তা আসে চুক্তির শর্ত, তদারকি ও জবাবদিহি থেকে।

লাভের অঙ্কের আড়ালে কী আছে 
চুক্তি স্বাক্ষরের আগে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘আমরা নির্দিষ্ট ট্যারিফের ওপর চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনা করি। কিন্তু বিদেশিদের দিলে তাদের কমিশন দিতে হবে। এভাবে টাকা চলে গেলে আমার দেশ ডলারে স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকবে না।’ অন্যদিকে, সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, চুক্তিতে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা প্রদানের পাশাপাশি প্রথম ১০ বছরে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। বন্দরের জন্য রাজস্বের অংশ এবং নির্দিষ্ট বার্ষিক ফি পাওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। সরকারের দাবি, চুক্তিতে কার্য সম্পাদনের মানদণ্ড ও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে আর্থিক জরিমানার বিধান রয়েছে। 

এসব প্রতিশ্রুতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বড় অঙ্কের বিনিয়োগ বা এককালীন অর্থপ্রাপ্তি চুক্তির সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি হতে পারে না। এনসিটি ইতোমধ্যে নির্মিত, চালু এবং উল্লেখযোগ্য আয়-উৎপাদনক্ষম একটি স্থাপনা। ফলে এখানে নতুন টার্মিনাল নির্মাণের সঙ্গে বিদ্যমান টার্মিনাল পরিচালনার পার্থক্যটি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। 

রাষ্ট্র যে সম্পদ বহু বছর ধরে গড়ে তুলেছে, তার ভবিষ্যৎ আয় ও উন্নয়নের সম্ভাবনার মূল্যায়নও চুক্তির অংশ হওয়া উচিত। প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে রাজস্ব ভাগাভাগির কাঠামো নিয়ে কিছু তথ্য পাওয়া গেলেও পূর্ণাঙ্গ চুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়নি। ঠিক কোন আয়ের ওপর কত অংশ প্রযোজ্য; কোন ব্যয় বা কর্তন বিবেচিত হবে; অতিরিক্ত সেবার মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রের নিট প্রাপ্তি কত হতে পারে– এসব প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। চুক্তির গোপনীয়তা যেন জবাবদিহি এড়ানোর ঢাল হয়ে না ওঠে।

সার্বভৌমত্ব শুধু মালিকানার দলিলে থাকে না
সরকারের বক্তব্য, এনসিটির জমি ও অবকাঠামোর মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতেই রয়ে যাবে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, শুল্ক, অভিবাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্বও বহাল থাকবে। এটি গুরুত্বপূর্ণ আশ্বাস। তবে সার্বভৌমত্বের ধারণা শুধু জমির দলিল বা পতাকা উত্তোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কৌশলগত অবকাঠামোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, তথ্য পাওয়ার অধিকার, জরুরি পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপের ক্ষমতা, চুক্তির শর্ত ভঙ্গ হলে প্রতিকার এবং প্রয়োজন হলে পরিচালনার দায়িত্ব পুনরুদ্ধারের সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্র যদি মালিক থাকে, কিন্তু পরিচালনার মান যাচাই করতে না পারে; রাজস্বের হিসাব নিরীক্ষা করতে না পারে কিংবা জনস্বার্থ ক্ষুণ্ন হলে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারে, তবে মালিকানা কাগজে অক্ষুণ্ন থাকলেও নিয়ন্ত্রণের বাস্তবতা দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জাতীয়তা দিয়ে নয়; রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ও চুক্তির শর্ত দিয়ে বিচার করা উচিত।

টার্মিনাল আধুনিক হলেই বন্দর আধুনিক হয় না
চট্টগ্রাম বন্দরের সমস্যার সমাধান শুধু কনটেইনার ওঠানো-নামানোর গতি বাড়ানোর মধ্যে নেই। জাহাজের অপেক্ষা, সড়কের যানজট, রেলপথে কনটেইনার পরিবহনের সীমাবদ্ধতা, কাস্টমসের দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং বন্দরের সঙ্গে দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোর দুর্বল যোগাযোগ– সব মিলিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যয় বাড়ে। বিশ্বমানের পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানও এসব সমস্যার সবকটি একা সমাধান করতে পারবে না।
সুতরাং এনসিটির আধুনিকায়নের পাশাপাশি সড়ক, রেল, নৌ যোগাযোগ, শুল্কব্যবস্থা ও অভ্যন্তরীণ কনটেইনার পরিবহনের সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন। শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়েও সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা থাকতে হবে। আধুনিকায়নের সুফল যদি কেবল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের আয় বাড়ায়, কিন্তু দেশের ব্যবসার খরচ না কমায়, তবে সেই সাফল্য হবে অসম্পূর্ণ। 

রাষ্ট্রের দায়িত্ব চুক্তির পর শুরু হয়
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তিকে সাফল্য বা ব্যর্থতার চূড়ান্ত রায় দেওয়ার সময় এখনও আসেনি। এর সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তব ফলের ওপর– পণ্য খালাসের সময় কতটা কমলো; জাহাজের অপেক্ষা কতটা হ্রাস পেল; ব্যবসার ব্যয় কতটা কমলো; রাষ্ট্রের নিট আয় কতটা বাড়ল এবং শ্রমিকদের অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকল।

এ জন্য নিয়মিত কর্মসম্পাদন প্রতিবেদন, স্বাধীন আর্থিক নিরীক্ষা, প্রকাশযোগ্য চুক্তিগত তথ্যের উন্মুক্ততা এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর জনস্বার্থভিত্তিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব ফলের ব্যবধান থাকলে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতাও রাষ্ট্রের থাকতে হবে।
বন্দরকে অদক্ষতার হাতে জিম্মি রাখা যায় না; আবার দক্ষতার প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকেও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে রাখা ক্ষতিকর। ব্যবসার জন্য দরজা খুলতে হয়। সেই দরজার চাবি, হিসাবের খাতা এবং জবাবদিহির ক্ষমতা কার হাতে থাকবে, সেটিও নিশ্চিত করতে হয়।
বন্দর শুধু ব্যবসা নয়; এটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণেরও প্রশ্ন। পরিচালনার দায়িত্ব চুক্তিতে দেওয়া যায়, কিন্তু জাতীয় স্বার্থের দায়িত্ব অন্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না।
 
এম এম খালেকুজ্জামান: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট বাংলাদেশ 
adv.mmkzaman@gmailcom
 

আরও পড়ুন

×