ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

গণঅভ্যুত্থান

নতুন রাজনীতির সম্ভাবনা ও আকাঙ্ক্ষা এখনও জীবিত

নতুন রাজনীতির সম্ভাবনা ও আকাঙ্ক্ষা এখনও জীবিত
×
×

তাজনূভা জাবীন

তাজনূভা জাবীন

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নিয়মকানুন ঠিক করার উদ্যোগ, মানে অনেকের কাছে অপ্রিয়, অপ্রয়োজনীয় ‘সংস্কার’ অনেকটা নিরুপায়ভাবে হার মেনেছিল ‘নির্বাচিত সরকার’-এর দাবির কাছে। নির্বাচনের আগে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের উদ্যোগ, প্রয়োজনীয়তার পাল্লা ভারী করতেও ব‍্যর্থ হয়েছিল গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক শক্তি এবং সংস্কারপন্থি পুরোনো রাজনৈতিক শক্তিগুলো। জুলাই সনদে যতটুকু আদায় করা সম্ভব হয়েছিল, সেটাকে এক ধরনের সান্ত্বনা মেনে, গণভোটের মাধ্যমে জনগণের রায় কিছু হলেও অন্তর্ভুক্ত হবে ভেবে সব পক্ষ নির্বাচনের দিকেই গিয়েছিল। 

নির্বাচনের ফল মোটাদাগে যা প্রত্যাশিত ছিল, সেটাই হয়েছে। বিএনপি জিতেছে। কিন্তু আশাভঙ্গের বড় ধাক্কা এলো যখন একই প্রক্রিয়ায় ভোটের পরেও বিএনপি সরকার গঠনের রায় গ্রহণ করল আর জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের রায় উপেক্ষা করল। তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথও নিলেন না। যদিও নির্বাচনের পর থেকে বিএনপি বলে আসছে– অক্ষরে অক্ষরে সব হবে। আন্দাজ করি, বিএনপির নিজস্ব নিয়মেই এসব হবে। অন্তত একচেটিয়া সংবিধান সংশোধন কমিটির আয়োজন সেদিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। 

শাসকদের সুবিধাজনক নিয়মে দেশ চালানোর রীতি আমাদের দেশের আদি রাজনৈতিক সংকট। পালাক্রমে রাষ্ট্রক্ষমতায় যখন যারা এসেছেন, তারাই পুরোনো নিয়ম ধরে রাখার বন্দোবস্ত করছেন। মানুষের জীবন ও রক্তের ওপর দিয়ে ক্ষমতায় বসার পরও পুরোনো বন্দোবস্তের পক্ষে পুরোনো রাজনৈতিক শক্তির তীব্র আকর্ষণ দেশকে পেছাচ্ছে– এই উপলব্ধি চোখ থাকতেও তারা দেখেন না। বারবার বাংলাদেশের বুকে গণজাগরণ, গণআন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান নেমেছে। কিন্তু পরে পুরোনো বন্দোবস্তের কাছে হেরে যেতে হয়েছে। এই এক বিস্ময়কর চক্রের মধ্যে দেশ পড়েছে। বারবার সংবিধানের বাইরে গিয়ে আন্দোলন করে ক্ষমতায় বসে সেই শাসকই সংবিধানকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য; গণতন্ত্রের ফাঁকফোকর নিজেদের সুবিধার্থে জিইয়ে রাখার জন্য। এমনকি এতে নিজেদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, রাজনৈতিক দফার অঙ্গীকার ভঙ্গেও ভ্রুক্ষেপ নেই।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর সেটা হওয়ার কথা ছিল না। এর অন্যতম কারণ গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী, নেতৃত্ব দানকারী বেশির ভাগই ছিলেন পুরোনো রাজনৈতিক শক্তির বাইরে। সবাই আশা ও বিশ্বাস করেছিল– এই দফায় নতুন রাজনৈতিক শক্তি অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু সেটা এখনও সম্ভব হয়নি। যাদের ‘নতুন রাজনৈতিক শক্তি’ হিসেবে দাবি করা হয় তারা মূলত জামায়াতে ইসলামীর সম্প্রসারিত শক্তি মাত্র; অন্তত আমি তা-ই মনে করি। যে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজের অংশগ্রহণে মূলত চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান সফল হয়েছিল, তারাও তা-ই মনে করে। গণঅভ্যুত্থানকারী মূল রাজনৈতিক শক্তি এখন বিভক্ত, আপাতত পরাজিত বা সাময়িকভাবে স্থির। 

এই পরিস্থিতির দায় পুরোনোদের তুলনায় নতুনদের বেশি বলে আমি মনে করি। কারণ পুরোনোরা পুরোনো পথেই হাঁটবে, যেভাবে তারা বিগত দিনেও হেঁটেছে। আওয়ামী লীগ যেমন মনে করে, তাদের পতনের মূল নায়ক তরুণ অপরিচিত ছাত্র-জনতা; তেমন বাংলাদেশের জনগণও মনে করে, পুরোনোদের পাল্লায় তাদের আবার তুলে দেওয়ার দোষও নতুনদের। বিএনপি-জামায়াতের বাইরে একটা স্বতন্ত্র ব্যালট বাক্স জনগণের সামনে রাখতে না পারার দায় তারা নতুনদেরই দেয়। জনগণ ভেবেছিল, নতুন রাজনৈতিক শক্তির আগমনের সূচনা হয়েছে। তারা আর যা-ই হোক, পুরোনোদের মতো হবে না। জনগণ বোকা নয়। তারা নিশ্চয় জানত, এক নির্বাচনেই সব সম্ভব হবে না। হয়তো কিছুই হবে না। কিন্তু তারা বিশ্বাস করতে চেয়েছিল– এই তৃতীয় ব্যালট বাক্স তাদের মুক্তি ও অধিকারের কথা বলবে। এই ব্যালট বাক্স সব ধর্ম, সব জাতিসত্তার সত্যিকার প্রতিনিধিত্ব করবে; যে ব্যালট বাক্স চাঁদাবাজ, দখলবাজ, দুর্নীতিগ্রস্ত হবে না।

একদিকে এক ঝাঁক তরুণের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক শক্তির লড়াই শেষ করে রাজনৈতিক ময়দানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের স্পৃহা, উদ্যম, রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ক্ষুধা; অন্যদিকে এই শক্তির জন্য জনগণের অপেক্ষা, আশা, দোয়া, সমর্থন। এই দুই মেরু এক হওয়া দূরে থাক– নতুনদের একাংশের পথভ্রষ্ট হওয়া, নারীদের ঠেলে সরানো, ভাইরাল নেতার আগ্রাসন, ধর্মের রাজনীতি, পুরোনো কাঠামোতে নতুনদের মিশে যাওয়ার আয়োজন– সকল পাতা ফাঁদে পা দিয়ে গণঅভ্যুত্থানের মূল শক্তি বিচ্ছিন্ন হতে থাকে। বিচ্ছিন্ন হতে থাকে নিজেদের থেকে; তাদের অপেক্ষায় থাকা জনগণ থেকে। বিচ্ছিন্ন হতে হতে এত দূরে সরিয়ে ফেলানো হলো, সেই শূন্যস্থান আবার স্পষ্ট হতে থাকল; যে জায়গা অত্যন্ত উর্বর নতুন রাজনৈতিক শক্তির বিকাশের জন্য।
কিন্তু কী নিদারুণ অপচয়! গোলকধাঁধার মধ্যে থাকলে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাওয়া কষ্টের। কিন্তু গোলকধাঁধা থেকে যত দূরে যাওয়া যায়, বের হওয়ার পথগুলো তত পরিষ্কার হতে থাকে। আমরা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান থেকে দুই বছর দূরে চলে এসেছি। নিশ্চিতভাবে এখন অনেক কিছু পরিষ্কার। 

আমরা যখন বলি, গণঅভ্যুত্থানের মূল শক্তি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে; সেখানে বিএনপিসহ গণঅভ্যুত্থানের কোন দলকে, কোনো পন্থাকে বাদ দেওয়া হয় না। কিন্তু নিউক্লিয়াস যারা হতে পারত তারা বিচ্ছিন্ন হওয়াতে যে যেদিকে পারছে বিকল্প খোঁজার চেষ্টা করছে। কিন্তু সেই রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা এখনও ওখানে স্থির, যেখানে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান সবাইকে এক করেছিল। সেই শক্তির বিকাশের সম্ভাবনা এখন হয়তো বামন হয়ে আছে, কিন্তু জীবিত; হারিয়ে যায়নি। 

ওপরে লিখেছি, নতুনদের দায় বেশি। কেন বেশি? শুধু সরকারের সমালোচনা করা আর তাদের নীতির বিরোধিতা করার জন্য নতুনদের দরকার নেই। এ জন্য বহু প্রতিষ্ঠান, সচেতন নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন পেশার দায়িত্বশীল মানুষ আছেন। কিন্তু তারা কেউ রাজনীতি করবেন না বা করছেন না। এখন আমরা নতুনরা যদি নিজেদের ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক রূপান্তরের মাধ্যমে নিজেদের তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সাংগঠনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করার চাইতে সমালোচনায় বেশি সময়, জ্ঞান, মেধা নষ্ট করি তাহলে নির্বাচনের আগে এর-ওর হাতে-পায়ে ধরা ছাড়া আর উপায় বাকি থাকে না। প্রতিদিন নতুন নতুন ইস্যু, আলোচনা-সমালোচনা!

সমালোচনার প্রয়োজনীয়তা আছে বৈ কি। পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে নিজেদের দূরত্ব ও নিজেদের মধ্যে দূরত্ব কমানো অনেক বেশি জরুরি। কারণ আমরা এখন যা করছি, সেটা করার জন্য মানুষ আছে। অভাব হচ্ছে সত্যিকার অর্থে জনপ্রতিনিধি হওয়ার মতো মানুষের, যেটা হওয়ার প্রয়াস ক্ষীণ আমাদের মাঝে। অভ্যুত্থানের গর্ভ থেকে বের হয়ে, সাগরে যুদ্ধের জন্য সক্ষমতা অর্জন করে নতুন নেতৃত্ব অ্যাকুয়ারিয়ামে কৃত্রিমভাবে ভাসছে। সংকীর্ণতায় নিজেদের এত ছোট করে ফেলেছি কবে, যেন টেরই পাইনি।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর যারা অন্যদের বাদ দেওয়ার রাজনীতি করেছে; গণঅভ্যুত্থানকে সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে; মাজার ভেঙেছে; নারীর প্রতি বিদ্বেষ ছড়িয়ে নারীর রাজনৈতিক হিস্যা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে; পত্রিকা অফিসে আগুন দিয়েছে; উগ্রতার চর্চা করে গণঅভ্যুত্থানকে নিজেদের সম্পত্তি বানানোর চেষ্টা করেছে; যারা গালিকে মহিমান্বিত করে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজকে দূরে সরিয়েছে তাদের কোনো অপরাধ, কোনো কূটকৌশল কেউ কখনও ভুলবে না। ভুলতে দেওয়া হবে না। তার মানে এই না, গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা থেকে মুখ সরিয়ে নেওয়া। উগ্র ও বিভাজনকারীর অনুভূতিকে এতটা মনোযোগ দেওয়াও অপচয়। এটাই তাদের অন্যতম কূটকৌশল– আপনাকে, আমাকে, আমাদের নিজেদের থেকে আলাদা রাখা এবং রাজনৈতিক বিকল্প শক্তিতে পরিণত হতে বাধা দেওয়া।
জামায়াত-শিবিরের ধর্মভিত্তিক রাজনীতিও জনগণের কাছে পরিষ্কার। এখন যদি আমরাও তাদের সমালোচনায় বুঁদ থাকি, তাহলে আমরা কার্যত তাদের নিয়েই পড়ে রইলাম। আমাদের কাজ নিজেদের সংগঠিত হওয়া; নিজেদের রাজনীতি দাঁড় করানো; স্বকীয়তা বজায় রেখে নতুন বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জনগণের সামনে হাজির হওয়া। এরপর দেখা যাক, জনগণ কাদের বেছে নেয়।

জনগণ এখনও তৃতীয় ব্যালট বাক্সেরই অপেক্ষায়। ক্যামেরা, মাইক্রোফোন বন্ধ করে কান পাতা হোক– শ্রমিক, কৃষক, শিক্ষক, ডাক্তার, সাধারণ নাগরিক; প্রত্যেকে এই ব্যবস্থা পরিবর্তনকারীর অপেক্ষায়। আমরা গণঅভ্যুত্থানের পর অনেকবার বলেছি– যে নাগরিক কোনোদিন রাজনীতি করবে না; আমাদের কোনো উপকারে আসবে না, আমরা তার জন্য রাজনীতি করব। সকল নাগরিকের অধিকার নিশ্চিতের জন্য কাজ করব। তাদের মৌলিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় আমরা সংগঠিত হবো। কিন্তু আমরা হয়ে গেলাম তাদের নেতা, যারা কোনো না কোনোভাবে আমাদের উপকারে আসে, আমাদের হ্যাঁ-তে হ্যাঁ মেলায়, না-তে না মেলায়। সবার হওয়ার বদলে যার যার গোষ্ঠীর হয়ে গেলাম; সাগর থেকে অ্যাকুয়ারিয়ামে। 

আরেকটা বড় সমস্যা, বড় দল হিসেবে আমাদের সামনে ছিল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। আমরা যে কোনো মানদণ্ডে দল দুটির গঠন প্রক্রিয়া, কাঠামো, পরিচালনা পদ্ধতি, নির্বাচনী কৌশলকে উপযুক্ত ধরে, তার তুলনায় নিজেরা কত ভালো বা খারাপ আছি, সেটা মেপেছি। সে তুলনায় নিজেরা কতটুকু বেশি বা কম পেয়েছি, সেটা বিচার করেছি। অথচ আমরা বারবার ভুলে যাই; যাদের সঙ্গে আমরা নিজেদের তুলনা করি, তাদের কারও জন্ম গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে হয়নি। সামষ্টিকতার বদলে কোনো ব্যক্তি বা পরিবার ঘিরে আবর্তিত হয়ে আসছে। প্রতিটি বড় রাজনৈতিক দলে নারী সংগঠন আছে, বহু নারী আছে। কিন্তু যে নতুন সম্ভবনাময় নারী নেতৃত্ব চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান থেকে প্রাকৃতিকভাবে উঠে এসেছে, সেটা পুরোনো কোনো দলে নেই। পুরোনোদের টেক্কা দেওয়ার জন্য এটাই গেম চেঞ্জার হতে পারত। 
বিএনপিও ২২ বছর জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটে ছিল– এটা শক্তিশালী যুক্তি হতে পারে না। এটা যে বলার জন্য বলা, সেটা দেশবাসী জানে। কিন্তু চব্বিশের গণঅভ্যুথান থেকে উঠে আসার পরও যেভাবে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সঙ্গে জোটের কালিমা; জনগণ ভুলতে দেবে না। বিএনপির সাংস্কৃতিক রাজনীতি দুর্বল, আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক রাজনীতি সক্রিয় সব উপায়ে সর্বক্ষেত্রে– আমরা এই আলোচনায় যতটা সরব ততটাই যেন নীরব গণঅভ্যুত্থানপন্থি সাংস্কৃতিক রাজনীতি দাঁড় করাতে। আমরা ততটাই নীরব সাংস্কৃতিক বিভাজনগুলো মুছতে। 

আমরা পুরোনোদের মতোই নিজেদের স্বার্থের পক্ষে সংস্কৃতির দোকান খুলছি কিন্তু সর্বজনীন কোনো চিন্তা আমাদের নেই। গণঅভ্যুত্থানে অনেক মানুষ গান, কবিতা, স্লোগান, গ্রাফিতিতে সেই সাংস্কৃতিক বিভাজন তুলে দিয়েছিল পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থেকে। তাদের ফিরিয়ে আনার রাজনীতি আমরা কি করছি? নাকি ডানপন্থার ওপর বিরক্ত হয়ে সব বিসর্জন দিয়ে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন আরও ত্বরান্বিত করছি। আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে; নতুন করে সংগঠিত হতে হবে। আবারও বলি, দুই বছর আগের সেই সম্ভাবনা ও আকাঙ্ক্ষা এখনও জীবিত। 

জ্বালানি, বিদ্যুৎ, বন্দর, বোয়িং, কয়লা, রূপপুর, মার্কিন, ভারত, আইএমএফ, রাড্ডা, নিউ গিনি, ঢাবি শিক্ষক, হিজাব, রবীন্দ্রনাথ, ডেঙ্গু, হাম, প্রশ্ন ফাঁস– সব বিষয়ে আমাদের আলোচনা-সমালোচনা যেমন জরুরি। তেমনি জরুরি ইস্যুগুলো দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলায় নিজেদের তৈরি করা। আমাদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত নিজেদের তৈরি করার দিকে বেশি। দিন শেষে কে কতটুকু তর্কে-বিতর্কে এগিয়ে থাকলাম বা কে টকশো মাতালাম– এটা জিডিপিতে কিছুই যুক্ত করবে না। কিন্তু আমরা নিজেদের যুক্তি বেশি যুক্তিসই প্রমাণ করাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছি। আমাদের ফোকাস সরাতে হবে। 
আমাদের এমন নেতৃত্ব লাগবে, যারা ‘ভাইরাল’ হওয়ার জন্য জন্মায়নি। যে নেতারা মাইনাসের রাজনীতির কবর রচনার স্বপ্ন দেখায় এবং বাস্তবায়নে কাজ করে; যাদের বাংলাদেশপন্থি রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার সামনে দ্বিমতকারীর ক্ষোভ তুচ্ছ থাকে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ইতোমধ্যে এ রকম মানুষ দেশকে দিয়েছে; এখন শুধু রাজনৈতিক রূপান্তর বাকি। বামন হয়ে থাকা সম্ভাবনাকে জাগাতে হলে আত্মসমালোচনা দিয়ে শুরু করতে হবে। অন্যের দোষ অনেক ধরা হয়েছে; যথেষ্ট। 

বস্তুত বাংলাদেশে একটা নতুন মধ্যপন্থার দল লাগবে। এটা সম্ভব। কারণ ওই যে শূন্য জায়গা পড়ে আছে। বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াতের পুরোনো বৃত্ত ভাঙার আহ্বান জানাচ্ছে জনগণ। সম্মিলিতভাবে সেই ডাকে সাড়া দিতে হবে। আমাদের মনোযোগ সরাতে হবে ডানপন্থা বনাম বামপন্থার লড়াই থেকে। আমাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে তিন দিকে। এক. এই লড়াইয়ের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে, যে লড়াই শক্তি-সময় ক্ষয় করে। এই লড়াইয়ের একমাত্র জবাব হতে পারে এই লড়াইয়ের ওপরে উঠে রাজনীতি স্থাপন করা। দুই. নিজেদের মধ্যে দূরত্ব ও সংকীর্ণতা কমাতে হবে। তিন. মানুষের কাছে যেতে হবে– দরজায়, পাড়ায়, মহল্লায়, শহরে।

গণঅভ্যুত্থান সফল যেমন নতুনদের জন্য; ব্যর্থতার দায়ও নতুনদের হবে। নতুন মানেই বয়সে কম তরুণ প্রজন্ম না শুধু। নতুন মানে যারা নতুন চিন্তা করে; যারা দেশের ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা বলে; যারা অগ্রজ কিন্তু পশ্চাৎপদ না; যারা অভিজ্ঞ কিন্তু ক্রেডিটবাজ না। এই বর্গীয় মানুষ সমাজে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এদের আবার একত্র করতে পারতে হবে। নয়া বন্দোবস্ত যে ভন্ড না– সেটা প্রমাণ করার সময়, সম্ভাবনা এখনও আছে। আর তা প্রমাণ করার নেতৃত্ব, বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা, রাজনৈতিক শক্তির উৎসও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রেখেছে; এখন শুধু ডটগুলো মেলাতে হবে।

ডা. তাজনূভা জাবীন: সংগঠক, অল্টারনেটিভস

আরও পড়ুন

×