ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

সমতা

দুর্যোগ সহনশীলতায় জেন্ডার সংবেদনশীল নীতি

দুর্যোগ সহনশীলতায় জেন্ডার সংবেদনশীল নীতি
×
×

ফারহানা হাফিজ

ফারহানা হাফিজ

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছালেই কি সবাই নিরাপদ হন? আশ্রয়কেন্দ্র থাকলেই কি নারী, কিশোরী, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা নির্বিঘ্নে যেতে পারেন? আর দুর্যোগ প্রস্তুতির পরিকল্পনা ও বাজেট তৈরির সময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে থাকাদের অভিজ্ঞতা ও মতামত কতটা গুরুত্ব পায়?

এটা ঠিক, বাংলাদেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। আগাম সতর্কবার্তা, আশ্রয়কেন্দ্র, স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক এবং নীতিগত কাঠামো দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়িয়েছে। দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিভিন্ন নীতিতে জেন্ডার সমতার গুরুত্বও স্বীকৃত। কিন্তু নীতির স্বীকৃতি আর বাস্তবের সুরক্ষায় ব্যবধান এখনও রয়ে গেছে।

দুর্যোগের ঝুঁকি সবার জন্য এক নয়। তথ্য ও সম্পদে প্রবেশাধিকার, চলাচলের স্বাধীনতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং পরিচর্যার দায়িত্বের অসম বণ্টন নারী ও মেয়েদের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। দরিদ্র ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার অনেক নারী পরিবারের শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী সদস্যের দেখাশোনার অতিরিক্ত দায়িত্ব বহন করেন। অথচ পরিবারের সম্পদ ও সিদ্ধান্তে তাদের নিয়ন্ত্রণ সীমিত হতে পারে।
এ বছর আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস দিবসে বাংলাদেশের বার্তা– ‘ঘর থেকে শুরু করি, দুর্যোগ সহনশীল দেশ গড়ি’ তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সহনশীলতা শুধু মজবুত ঘর বা আগাম সতর্কবার্তার বিষয় নয়। এটি এমন পরিবার ও সমাজ গড়ে তোলার বিষয়, যেখানে প্রত্যেকে তথ্য, সম্পদ, নিরাপত্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ পান। এই লক্ষ্য অর্জনে জেন্ডার সমতাকে নীতির ঘোষণা থেকে বাস্তব প্রস্তুতি, বাজেট ও জবাবদিহির কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে।

নীতি আছে, বাস্তবায়ন কোথায়?
দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে ২০১৫-২০৩০ সালের সেন্দাই ফ্রেমওয়ার্ক নারী ও কিশোরীদের চাহিদা, সক্ষমতা ও অবদান বিবেচনায় গুরুত্ব দেয়। ২০২৪ সালের সেন্দাই জেন্ডার অ্যাকশন প্ল্যান এই অঙ্গীকার আরও জোরালো করেছে। এতে ঝুঁকি-সংক্রান্ত তথ্য, নারীর নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ, সুশাসন, অর্থায়ন এবং জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের দুর্যোগবিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলি ২০১৯, জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা ২০২১-২০২৫, জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতি ২০১২, জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা ২০০৯ এবং জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ২০২৩-২০৫০ জেন্ডার সংবেদনশীল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ভিত্তি তৈরি করেছে।
অর্থাৎ নীতিগত কাঠামো পুরোপুরি অনুপস্থিত নয়। প্রশ্ন হলো, এসব অঙ্গীকার কতটা স্থানীয় প্রস্তুতি পরিকল্পনা, সম্পদ বরাদ্দ এবং মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রমে প্রতিফলিত হচ্ছে? নীতিতে জেন্ডার সমতার উল্লেখ থাকলেও তা বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট দায়িত্ব, সূচক ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা দুর্বল হলে পরিবর্তন নিশ্চিত করা কঠিন।

সতর্কবার্তাই কি নিরাপদ আশ্রয়ের নিশ্চয়তা?
আগাম সতর্কবার্তা কার্যকর হওয়ার অর্থ শুধু দ্রুত তথ্য পৌঁছে দেওয়া নয়; বরং তথ্য অনুযায়ী নিরাপদ পদক্ষেপের সুযোগও নিশ্চিত করা। সতর্কবার্তা পেতে কোনো নারীর নিজের মোবাইল ফোন নাও থাকতে পারে, তাঁর মতামতের গুরুত্ব কম হতে পারে কিংবা শিশু ও নির্ভরশীল সদস্যদের নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার ব্যবস্থা নাও থাকতে পারে। বয়স্ক, প্রতিবন্ধী ও একা বসবাসকারী নারীরা যোগাযোগ ও চলাচলে অতিরিক্ত বাধার মুখোমুখি হতে পারেন। আশ্রয়কেন্দ্রে নিরাপত্তা, গোপনীয়তা, পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির অপর্যাপ্ত ব্যবস্থা উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। তাই প্রস্তুতি পরিকল্পনায় জানতে হবে: কে সতর্কবার্তা পান, কে সিদ্ধান্ত নেন, কারা নিরাপদে আশ্রয় নিতে পারেন এবং কী বাধা তাদের আটকে রাখে– এসব বাস্তবতা বিবেচনায় না নিলে কারিগরিভাবে উন্নত সতর্কবার্তা ব্যবস্থাও সবার জন্য সমান সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারবে না।

সিদ্ধান্তে নারীর অংশগ্রহণ, নাকি শুধু উপস্থিতি?
দুর্যোগের সময় নারীরা পরিচর্যাকারী, স্বেচ্ছাসেবক, সংগঠক ও সহায়তা গ্রহণকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, প্রস্তুতি পরিকল্পনা এবং সম্পদ বণ্টনের সিদ্ধান্তে তাদের অংশগ্রহণ সব সময় সমান নয়। নারীর অংশগ্রহণ শুধু সভায় উপস্থিতির সংখ্যা দিয়ে মূল্যায়ন করা যথেষ্ট নয়। পরিবারের পানির চাহিদা, খাদ্য নিরাপত্তা, পরিচর্যার দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সম্পর্কে নারীর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে। এই জ্ঞান ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রস্তুতি পরিকল্পনায় যুক্ত হলে কমিউনিটির সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়তে পারে। এ জন্য নারী সংগঠন ও নারী নেতৃত্বাধীন সংগঠনগুলোকে পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণে অর্থবহভাবে যুক্ত করতে হবে।

বাজেটের টাকা ঝুঁকি কমাচ্ছে?
জেন্ডার সংবেদনশীল দুর্যোগ প্রস্তুতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো অর্থায়ন। বাংলাদেশে জলবায়ু বাজেট ও সরকারি ব্যয় পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু কোনো কর্মসূচিতে কতজন নারী উপকারভোগী, তা উল্লেখ করলেই সেই বিনিয়োগ জেন্ডার সংবেদনশীল হয়ে ওঠে না।
মূল প্রশ্ন, অর্থায়ন বাস্তবে চিহ্নিত ঝুঁকিগুলো কমাচ্ছে কিনা? বিনিয়োগের মাধ্যমে সহজে ব্যবহারযোগ্য আগাম সতর্কবার্তা, নিরাপদ ও প্রবেশগম্য আশ্রয়কেন্দ্র, পর্যাপ্ত পানি ও স্যানিটেশন, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা থেকে সুরক্ষা, নারীর জীবিকা সহায়তা এবং নারী নেতৃত্বাধীন কমিউনিটি উদ্যোগের জন্য সম্পদ নিশ্চিত হচ্ছে কিনা, তা মূল্যায়ন করা দরকার।
একই সঙ্গে বাজেট বরাদ্দ, বাস্তবায়ন ও ফলাফলের মধ্যে সুস্পষ্ট সংযোগ থাকতে হবে। শুধু কত টাকা ব্যয় হয়েছে, তা নয়; সেই ব্যয়ের ফলে কার নিরাপত্তা বেড়েছে, কারা সেবা পেয়েছেন এবং কোন ঝুঁকি কমেছে– তারও হিসাব রাখতে হবে। তা না হলে জেন্ডার সংবেদনশীল অর্থায়ন বাস্তব পরিবর্তনের বদলে প্রতিবেদন তৈরির আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হতে পারে।
দুর্যোগে নারী-পুরুষ-শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভিন্ন অভিজ্ঞতা বোঝার জন্য লিঙ্গ, বয়স ও প্রতিবন্ধিতাভিত্তিক তথ্য অপরিহার্য। পরিসংখ্যান ব্যুরো ইউএন উইমেনের কারিগরি সহায়তায় দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার সম্পর্কে এ ধরনের তথ্য সংগ্রহের পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নিয়েছে। তথ্য তখনই কার্যকর হবে, যখন তা প্রস্তুতি পরিকল্পনা পরিবর্তন; সম্পদের অগ্রাধিকার নির্ধারণে সহায়তা এবং সেবার ঘাটতি চিহ্নিত করবে।

নারী ঝুঁকির নয়, সমাধানেরও অংশীদার
নারী ও মেয়েরা বিশেষ ঝুঁকির মুখোমুখি হন– এটি স্বীকার করা জরুরি। তবে তাদের শুধু ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী হিসেবে দেখলে দুর্যোগ মোকাবিলায় তাদের জ্ঞান, নেতৃত্ব ও সক্ষমতা আড়ালে থেকে যায়। বিভিন্ন এলাকায় নারী সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবক ও নারী নেতৃত্বাধীন নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো আগাম সতর্কবার্তা প্রচার, কমিউনিটির সচেতনতা বৃদ্ধি, জীবিকা সুরক্ষা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধারে অবদান রাখে। তাই নারীদের জন্য সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধিতেও বিনিয়োগ করতে হবে। 

জবাবদিহি ছাড়া অঙ্গীকারের মূল্য নেই
নীতিগত অঙ্গীকার বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা পরিমাপের জন্য স্পষ্ট জবাবদিহি কাঠামো প্রয়োজন। দুর্যোগ প্রস্তুতি পরিকল্পনায় জেন্ডারভিত্তিক সূচক অন্তর্ভুক্ত করা; লিঙ্গ, বয়স ও প্রতিবন্ধিতাভিত্তিক তথ্য ব্যবহার; সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ পর্যবেক্ষণ ও বরাদ্দকৃত অর্থের ফল মূল্যায়ন করা জরুরি। দুর্যোগ প্রস্তুতি, সতর্কবার্তা ও জরুরি সাড়াদানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ভূমিকার সঙ্গে জেন্ডার সমতা ও সুরক্ষাবিষয়ক মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অভিজ্ঞতা যুক্ত করা জরুরি।
দুর্যোগবিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলির জেন্ডার সংক্রান্ত নির্দেশনা বাস্তবায়নে দুই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব, পরিমাপযোগ্য সূচক, প্রতিবেদন, অগ্রগতি পর্যালোচনা ও ঘাটতি সংশোধনের ব্যবস্থা নির্ধারণ করা যেতে পারে। স্থানীয় সরকার ও নারী নেতৃত্বাধীন সংগঠনগুলোকেও এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে।

ঘর থেকে সহনশীলতা শুরু, বাস্তবায়নের দায়িত্ব সবার
‘ঘর থেকে শুরু করি, দুর্যোগ সহনশীল দেশ গড়ি’– এই বার্তাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে পরিবারের ভেতরে কে তথ্য পান, কে সিদ্ধান্ত নেন, কার হাতে সম্পদ থাকে এবং কে নিরাপদে আশ্রয় নিতে পারেন, তা বিবেচনায় নিতে হবে। তবে পরিবারের প্রস্তুতি শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না; তা নীতি, বাজেট, প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সেবার সুযোগ দ্বারাও নির্ধারিত হয়।
বাংলাদেশের সামনে এখন প্রধান কাজ হলো বিদ্যমান নীতিগত অঙ্গীকারকে কার্যকর বাস্তবায়নে রূপ দেওয়া। অগ্রগতি মাপতে হবে শুধু নীতিতে জেন্ডার সমতার উল্লেখ দিয়ে নয়, বরং নারী ও কিশোরীরা সিদ্ধান্ত গ্রহণে কতটা প্রভাব রাখতে পারছেন; নিরাপদ আশ্রয় ও আগাম সতর্কবার্তায় তাদের প্রবেশাধিকার কতটা বাড়ছে এবং দুর্যোগের সময় তারা কতটা সুরক্ষিত থাকছেন, তা দিয়ে।
দুর্যোগ সহনশীল বাংলাদেশ গড়তে জেন্ডার সমতা কোনো অতিরিক্ত লক্ষ্য নয়। এটি কার্যকর দুর্যোগ প্রস্তুতি ও ঝুঁকি হ্রাসের অন্যতম মৌলিক শর্ত।

ফারহানা হাফিজ: জেন্ডার বিশ্লেষক

আরও পড়ুন

×