নবায়নযোগ্য জ্বালানি
বাংলাদেশেও ‘রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ’ হতে পারে কার্যকর উৎস
অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম
মইনুল ইসলাম
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৭:৩৭ | আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৭:৫৬
বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে অনেক কথাবার্তা হলেও এর প্রতি এক ধরনের অবহেলা রয়েছে, যা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। আলোচনাগুলো এমনভাবে করা হয়; দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গৃহস্থালি পর্যায়ে সম্প্রসারণের মধ্য দিয়েই যেন সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। অথচ এখনও এই বিদ্যুতে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তাই একে বিদ্যুতের প্রধান সূত্রে পরিণত করা সময়ের দাবি।
আমরা দেখেছি, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরেও বাংলাদেশে মাত্র দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছিল নবায়নযোগ্য উৎসগুলো থেকে। বাংলাদেশের ‘সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’ স্রেডা তাদের ঘোষিত ন্যাশনাল সোলার এনার্জি রোডম্যাপে ৩০ হাজার মেগাওয়াটের সোলার এনার্জির টার্গেট অর্জনের সুপারিশ করেছে, যার মধ্যে ১২ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ছাদভিত্তিক সোলার প্যানেল থেকে আহরণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু এই রোডম্যাপ ঘোষণার পর কয়েক বছর অতিবাহিত হলেও লক্ষ্য পূরণের উপযুক্ত কর্মসূচি গৃহীত হয়নি।
দেশের বড় বড় নগর ও মফস্বল শহরগুলোর প্রাইভেট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ির ছাদ ব্যবহারের মাধ্যমে ৭-৮ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন মোটেও অসম্ভব মনে হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন হবে সোলার প্যানেল ও ব্যাটারির ভর্তুকি-দাম কর্মসূচি বাস্তবায়ন, সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রপাতির ওপর আরোপিত শুল্ক হ্রাস এবং যুগোপযোগী ‘নেট মিটারিং’ পদ্ধতি চালু।
সম্প্রতি ভারতের নাগরিকদের বাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনের জন্য দেশটির ‘প্রধানমন্ত্রীর সূর্যোদয় যোজনা’ বা ‘পিএম রুফটপ সোলার যোজনা’ চালুর যে বিবরণ সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত হয়েছে, তাতে ভারতীয় ৪৭ হাজার রুপি খরচে তিন কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার সোলার প্যানেল বাড়ির ছাদে স্থাপন করতে চাইলে উল্লিখিত যোজনার কাছে আবেদন করার নিয়ম পরিপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী মোট ৪৭ হাজার রুপি প্রাক্কলিত খরচের মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে ১৮ হাজার রুপি ভর্তুকি প্রদান করা হবে। আর সোলার প্যানেল স্থাপনকারী ভোক্তাকে ব্যয় করতে হবে ২৯ হাজার রুপি। মোট এক কোটি পরিবারকে ‘পিএম রুফটপ সোলার যোজনা’য় অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে ভারত। এই যোজনার পূর্ণ বিবরণ পাঠের পর আমার কাছে মনে হয়েছে, এই মডেলটি সরাসরি বাংলাদেশে প্রয়োগযোগ্য।
মনে আছে, বেশ কয়েক মাস আগে অন্তর্বর্তী সরকারের জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান মন্তব্য করেছিলেন, বাংলাদেশের জন্য সৌরবিদ্যুৎ সবচেয়ে উপযোগী বিদ্যুতের উৎস হিসেবে সরকারের অগ্রাধিকার দাবিদার। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, দেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট জমি নেই বলে যে ধারণা রয়েছে, সেটা ভুল। তিনি রেলওয়ের নিজস্ব জায়গা এবং মহাসড়কের পাশের জায়গার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, সরকারি জমিতে ভবিষ্যতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলা হবে।
জ্বালানি উপদেষ্টা ধন্যবাদ পেতে পারেন, জমির স্বল্পতার মিথ্যা ধারণাটি তিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। আমি তাঁর সঙ্গে একমত, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন খুবই সম্ভব, যদি এ ব্যাপারে যথাযথ অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়। বিষয়টি নিয়ে আগে থেকেই ভেবেছি। যে কারণে রেল, মহাসড়ক ও সরকারি জমির পাশাপাশি আরও কতগুলো সম্ভাব্য স্থানের তালিকা দিতে পারি, যেখানে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা সম্ভব।
যেমন বাংলাদেশে বর্তমানে চারটি আমদানি করা কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ প্লান্ট নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলো হলো পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বাঁশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্র। এর প্রতিটিই মেগা প্রকল্প, যেগুলো থেকে প্রায় ৫২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেশের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু এসব প্লান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাঝখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে গেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে কয়লার আন্তর্জাতিক বাজারে দাম অনেকখানি বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়ায় বর্ধিত দামে এসব বিদ্যুৎ প্লান্টের জন্য প্রয়োজনীয় কয়লা আমদানির ব্যাপারে বাংলাদেশের সক্ষমতা অনেকখানি সংকুচিত হয়েছে।
আমরা দেখছি, বাংলাদেশ ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকে অত্যন্ত কঠোরভাবে আমদানি নিয়ন্ত্রণ নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে চলেছে নিজেদের বাণিজ্য ঘাটতি ও ব্যালান্স অব পেমেন্টসের কারেন্ট অ্যাকাউন্টের ঘাটতি মোকাবিলা করার উদ্দেশ্যে। ফলে নির্মাণ সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও কয়লার অভাবে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রায়ই বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে এমন আশঙ্কা অমূলক হতে পারে না, আমদানি করা কয়লানির্ভর বিদ্যুতের মেগা প্রকল্প স্থাপনের পুরো ব্যাপারটিই বাংলাদেশের জন্য অসহনীয় বোঝা হিসেবে দাঁড়িয়ে যেতে পারে।
মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে ভারতের আদানি গ্রুপ থেকে অত্যন্ত অন্যায্য শর্তে বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি করে গেছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। সেই চুক্তি থেকে বেরোনোর কোনো উপায় এখনও খুঁজে পাচ্ছে না বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী অনেক বেশি দামে, সর্বোচ্চ ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশকে কিনতেই হচ্ছে আদানির ঝাড়খণ্ডের গড্ডা প্রকল্প থেকে! 
এই বাস্তবতাও বিবেচনা করতে হবে, এলএনজিচালিত অনেক বিদ্যুৎ প্লান্ট বন্ধ থাকছে মূলত ডলার সংকটের কারণে। এর ফলে এলএনজি আমদানি কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রায় ২৭ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্যাপাসিটি অর্জন সত্ত্বেও দৈনিক উৎপাদনকে এখন ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটে সীমিত রাখতে হচ্ছে। এই সংকটের জন্য প্রধানত দায়ী আমদানি করা এলএনজিনির্ভর জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদননীতি। এর পাশাপাশি এখন কয়লানির্ভর মেগা প্রকল্পগুলোও বড়সড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে।
অভিজ্ঞ মহলের ধারণা, কয়েক প্রভাবশালী এলএনজি আমদানিকারককে অন্যায্য সুবিধা দেওয়ার জন্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এই আমদানি করা এলএনজি-নির্ভরতার নীতি গৃহীত হয়েছিল। এই নীতির কারণে দৃশ্যত একদিকে ইচ্ছাকৃত অবহেলার শিকার হয়েছে গ্যাস অনুসন্ধান, অন্যদিকে যথাযথ অগ্রাধিকার পায়নি সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন। এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ, দেশের স্থলভাগে গত ১৪ বছরে কয়েকটি ছোট ছোট গ্যাসকূপ ব্যতীত উল্লেখযোগ্য তেল-গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া যায়নি। ভোলা গ্যাসের ওপর ভাসছে বলা হলেও ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশের মূল ভূখণ্ডে আনার কাজ এখনও শুরুই হয়নি!
এটাও লক্ষণীয়, ২০১২ ও ’১৪ সালে যথাক্রমে মিয়ানমার ও ভারতের বিরুদ্ধে মামলায় জিতে বাংলাদেশ এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমার নিয়ন্ত্রণ পাওয়া সত্ত্বেও ১০-১২ বছর পর্যন্ত সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান চালানো হয়নি। গত বছর সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য পেট্রোবাংলা আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করেছিল। কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
আমরা জানি, বাংলাদেশের সেন্টমার্টিনের অদূরে মিয়ানমার তাদের সমুদ্রসীমা থেকে পাঁচ টিসিএফের বেশি গ্যাস আহরণ করে চলেছে। একই ভূতাত্ত্বিক কাঠামো যেহেতু বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় রয়েছে, তাই বাংলাদেশের সেন্টমার্টিন এলাকার সমুদ্রেও গ্যাস না পাওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না।
প্রসঙ্গত, ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলের কাছাকাছি বঙ্গোপসাগরের গোদাবরী বেসিনে ভারতও ইতোমধ্যে বিশাল গ্যাস ও তেলক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে।
দেশের বিদ্যুৎ খাতের জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা থেকে নিষ্কৃতি পেতে হলে চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের সোলার পাওয়ারের সাফল্য কীভাবে অর্জিত হয়েছে, তা জেনে এ দেশের সোলার পাওয়ার নীতিকে অবিলম্বে ঢেলে সাজাতে হবে। সে জন্যই ভারতের ‘প্রধানমন্ত্রী সূর্যোদয় যোজনা’কে অবিলম্বে বাংলাদেশে চালু করার দাবি জানাচ্ছি। এর প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করা যায় গভীর চিন্তাভাবনা করলে। বাড়ির মালিকদের জন্য এই ভর্তুকি কর্মসূচি তাদের অবিলম্বে বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনে উৎসাহিত করবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
আমরা দেখেছি, গণচীন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ভারত, ফিলিপাইন এবং জার্মানি ছাদভিত্তিক সোলার পাওয়ার উৎপাদনে চমকপ্রদ সাফল্য অর্জন করেছে। সোলার প্যানেল ও ‘ব্যাটারি’র দামে সুনির্দিষ্ট ভর্তুকি প্রদান এবং ভর্তুকি দামে ‘নেট মিটারিং’ স্থাপনে প্রণোদনা এসব দেশের সাফল্য অর্জনের প্রধান উপাদান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই ‘নেট-মিটারিং’ প্রযুক্তি গণচীন থেকে এখন সুলভে আমদানি করা যাচ্ছে। অথচ এ ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতি নগণ্যই!
মনে রাখতে হবে, রূপপুর পরমাণু শক্তিকেন্দ্র স্থাপন করার জন্য আমরা এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করছি। বলা হচ্ছিল, সেখান থেকে ২০২৫ সাল নাগাদ আমরা ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাব। অথচ ছাদভিত্তিক সোলার পাওয়ার প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিলে ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ব্যয় রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের মোট ব্যয়ের অর্ধেকও হতো না। উপরন্তু সৌরবিদ্যুৎ সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব এবং ঝুঁকিমুক্ত প্রযুক্তি। সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রমাণিত, এক ইউনিট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ইতোমধ্যে গণচীন, ভিয়েতনাম এবং থাইল্যান্ডে বাংলাদেশি ১০ টাকার নিচে নেমে এসেছে।
মনে আছে, ২০২৩ সালের ১৭ নভেম্বর দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়েছিল, ব্লুমবার্গের এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ২০২৫ সালের পর সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন খরচ অন্য সব বিকল্পের তুলনায় বাংলাদেশেও কমে আসবে। ২০৩০ সাল নাগাদ এক মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন খরচ হবে মাত্র ৪২ ডলার, যেখানে এলএনজিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে তা পড়বে ৯৪ ডলার এবং কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে ১১৮ ডলার।
আগেই বলেছি, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে অনেক খালি জায়গা লাগে বিধায় বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে তা উৎপাদন অসম্ভব– ধারণাটি ঠিক নয়। বরং বাংলাদেশের ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য সৌরবিদ্যুতের জন্য বিশেষ উপযোগী। যেমন বঙ্গোপসাগরের মোহনায় জেগে ওঠা চরাঞ্চল, সমুদ্র-উপকূল, নদনদী ও খালের দু’পারে সোলার প্যানেল স্থাপনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। বঙ্গোপসাগরের মোহনায় বাংলাদেশ সীমানায় যে কয়েকশ চরাঞ্চল গড়ে উঠছে, সেখানে জনবসতি গড়ে ওঠার আগেই বড় বড় সৌরবিদ্যুৎ-কাম-বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। তাহলে সাশ্রয়ী পন্থায় কয়েক হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন আগামী চার-পাঁচ বছরের মধ্যেই সম্ভব হবে।
খবরে দেখেছি, সম্প্রতি জার্মানি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে বাংলাদেশকে বিপুলভাবে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে জমির তুলনামূলক স্বল্পতার প্রকৃত সমাধান পাওয়া যাবে যদি দেশের বিশাল সমুদ্র-উপকূলে একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন প্লান্ট স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়। জার্মানি যদিও সমুদ্র-উপকূলের কথাই কেবল বলেছে, আমি এর চাইতেও সম্ভাবনাময় মনে করি বঙ্গোপসাগরে নতুন জেগে ওঠা চরাঞ্চলকে। এগুলোতে মানব-বসতি নেই। তাই ভূমি অধিগ্রহণের কোনো ঝামেলাই হবে না। উপরন্তু উৎপাদিত বিদ্যুৎ সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে দেশের মূল ভূখণ্ডের বিদ্যুৎ-গ্রিডে নিয়ে আসাও খুব বেশি ব্যয়সাধ্য হওয়ার কথা নয়।
ইউরোপেরই আরেকটি দেশ ডেনমার্ক বাংলাদেশের সমুদ্র-উপকূলে ১৩০০ মেগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগ-প্রস্তাব বিগত সরকারের কাছে পেশ করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত হবে তা অবিলম্বে গ্রহণ করা। দেশের নদনদীর দু’পার ও চরগুলো, বঙ্গোপসাগরের নতুন জেগে ওঠা চর এবং সমুদ্র-উপকূলে এমন বড় সৌরবিদ্যুৎ-কাম-বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করলে দেশের বিদ্যুতের চাহিদার অধিকাংশই নবায়নযোগ্য সোর্স থেকে আহরণ করা সম্ভব হবে। তাহলে আমদানি করা কয়লা ও এলএনজির ওপর অতিনির্ভরতা থেকে জাতি মুক্তি পাবে।
সম্প্রতি সাবেক সরকারের সব সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন চুক্তি বাতিল ঘোষণা করে প্রতিযোগিতামূলক নতুন চুক্তি সম্পাদন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। আমরা আশা করছি, এর ফলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ আরও অনেকখানি হ্রাস পাবে।
সম্প্রতি সরকার বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভবনগুলোর ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নীতিমালা ঘোষণা করেছে। কিন্তু বেসরকারি ভবনগুলোর জন্য ভারতের ‘পিএম রুফটপ সোলার পাওয়ার যোজনা’র আদলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে প্রণোদনা প্রদানের জন্য কোনো নীতিমালা গৃহীত হয়নি।
আমি মনে করি, এই মডেলটি গুরুত্ব দিয়ে দেখা যেতে পারে। আবার ‘নেট মিটারিং’ প্রযুক্তি আমদানি ও ব্যবহারকে উৎসাহিত করার জন্য উপযুক্ত ভর্তুকি নীতিমালা বাস্তবায়নকে কেন অগ্রাধিকার প্রদান করা হচ্ছে না, তাও আমার বোধগম্য নয়। তাহলে কি সরিষার ভেতরেই কোথাও ভূত রয়েছে? এ ব্যাপারে অবিলম্বে সরকারি অবস্থান পরিষ্কার ও সিদ্ধান্ত ঘোষণার জোর দাবি জানাচ্ছি।
অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম: একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ; সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি
- বিষয় :
- জ্বালানি
- নবায়নযোগ্য জ্বালানি
- সৌরবিদ্যুৎ
