ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আইন

অধ্যাদেশের বন্যা বনাম সংসদের বাঁধ

অধ্যাদেশের বন্যা বনাম সংসদের বাঁধ
×

প্রতীকী ছবি

আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব

প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৬ | ১০:৪৪

১৮ মাসে ১৩৩টি অধ্যাদেশ। সংখ্যাটা শুধু বড় নয়, তাৎপর্যও গভীর। আগামী ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে। সেই দিন থেকেই শুরু হবে এক সাংবিধানিক হিসাবনিকাশ– অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা এসব অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ কী? এগুলো কি আইনে রূপ পাবে, নাকি সংবিধানের বিধান অনুযায়ী ৩০ দিনের মাথায় ঝরে পড়বে?

বাংলাদেশের সংবিধান স্পষ্ট। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের– এ কথা বলা আছে সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদে। বিল উত্থাপন, আলোচনা, কমিটিতে পরীক্ষা, ভোটাভুটি, রাষ্ট্রপতির সম্মতি– এই প্রক্রিয়াই আইন প্রণয়নের নিয়মিত পথ। তবে ৯৩ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে বিশেষ পরিস্থিতিতে অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা দিয়েছে– শুধু তখনই, যখন সংসদ অধিবেশনে নেই বা ভেঙে গেছে এবং ‘আশু ব্যবস্থা গ্রহণ’ (ইমিডিয়েট অ্যাকশন) প্রয়োজনীয় বলে তাঁর কাছে সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হয়। অর্থাৎ অধ্যাদেশ কোনো বিকল্প আইনসভা নয়; এটি জরুরি প্রয়োজনে অস্থায়ী একটা ব্যবস্থা। 
কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার ৫৫৯ দিনে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছে। গড়ে প্রতি ৪.২ দিনে একটি। ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৭টি– প্রতি ৯ দিনে একটি। ২০২৫ সালে ৮০টি– প্রতি সাড়ে ৪ দিনে একটি। আর ২০২৬ সালের প্রথম দেড় মাসে ৩৬টি– প্রতি দেড় দিনেরও কম সময়ে একটি। সবচেয়ে বিস্ময়কর, বর্তমান সরকার শপথের আগের মাত্র ৬ কর্মদিবসে ১৭টি অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। কোনো কোনো দিনে ৪-৬টি পর্যন্ত। প্রশ্নটা স্বাভাবিক: এই ঝড়ের বেগে লাগাতার ‘অধ্যাদেশ প্রসবের’ রহস্য কী?

স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সংসদ মিলিয়ে প্রায় ১,৫০০-১,৬০০টি আইন পাস হয়েছে। সচল সংসদে গড়ে বছরে ৩০-৪০টি আইন হয়। সে তুলনায় বছরে ৮০-৯০টি অধ্যাদেশ মানে আইন প্রণয়নের গতিপথ সংসদ থেকে নির্বাহী শাখায় সরে যাওয়া। অধ্যাদেশ যদি নিয়ম হয়ে যায়, সংসদ তখন আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।

২০০৭-০৯ সময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ১২২টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। পরে নবম সংসদ বিশেষ কমিটি গঠন করে ৫৪টি আইনে রূপ দেয়, বাকিগুলো বাতিল হয়ে যায়। এরও আগে প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রপতি থাকাকালে জারি করা ৫৯৫টি অধ্যাদেশকে ২০১০ সালে উচ্চ আদালত অবৈধ ঘোষণা করেন, যদিও প্রশাসনিক শূন্যতা এড়াতে কিছু অধ্যাদেশের কার্যক্রম বহাল রাখা হয়। অর্থাৎ অধ্যাদেশের ভাগ্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে সংসদ ও আদালত– নির্বাহী বিভাগ নয়। 

আইনি প্রশ্নও কম নয়। ৯৩ অনুচ্ছেদ তিনটি স্পষ্ট সীমা টেনেছে: (ক) সংসদ যা করতে পারে না, অধ্যাদেশেও তা সম্ভব নয়; (খ) সংবিধান সংশোধন বা বিলুপ্ত করা যাবে না; (গ) আগের অধ্যাদেশের কার্যকারিতা বাড়াতে নতুন অধ্যাদেশ জারি করা যাবে না। এর বাইরে রয়েছে বিচারিক পর্যালোচনা। কুদরত-ই-ইলাহী পনির মামলায় আপিল বিভাগ বলেছিল, অধ্যাদেশ জারিতে রাষ্ট্রপতির ‘সন্তুষ্টি’ সম্পূর্ণ অদৃশ্য দেয়াল নয়; এর যুক্তিসংগতা যাচাই হতে পারে। ২০০৯ সালে পীরজাদা শরীয়তুল্লাহ মামলায় হাইকোর্ট একটি অধ্যাদেশ বাতিল করে বলেছিল ‘জরুরি পরিস্থিতি’ ছিল না। অর্থাৎ ‘ইমিডিয়েট অ্যাকশন’ শব্দযুগল নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এর প্রমাণযোগ্য ভিত্তি চাই। তাছাড়া খোদ অধ্যাদেশ প্রণেতা রাষ্ট্রপতিই যখন বলেন, ‘অনেক অধ্যাদেশ করার কোনো কারণ ছিল না। প্রধান উপদেষ্টা সংবিধানের কোনো বিধান মেনে চলেন নি।’ তখন এই অধ্যাদেশগুলোর আইনগত ও নৈতিক ভিত্তি এবং উদ্দেশ্যগত সততা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। (কালের কণ্ঠে প্রকাশিত রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬)

প্রক্রিয়াগত প্রশ্নও আছে। সাধারণত কোনো আইন বা অধ্যাদেশের খসড়া স্বার্থসংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে মতামতের জন্য পাঠানো হয়, অংশীজনের মতামত নেওয়া হয়, অনেক ক্ষেত্রে ৩০ দিন সময় দেওয়া হয়। কিন্তু আলোচ্য অধ্যাদেশগুলোর অনেক ক্ষেত্রে খসড়া প্রকাশ করে ২-৩ দিনের মধ্যে মতামত চাওয়া হয়েছে। এতে অংশগ্রহণমূলক আইন প্রণয়নের নীতি ক্ষুণ্ন হয়েছে– এ প্রশ্ন উঠতে পারে। 
এখন প্রশ্ন– ত্রয়োদশ সংসদ কী করবে? সংসদ চাইলে একযোগে বাতিল করতে পারে, ধাপে ধাপে প্রত্যাখ্যান করতে পারে, কিংবা নতুন বিল আকারে সংশোধন করে পাস করতে পারে। বাস্তবতা হলো, ৩০ দিনে ১৩৩টি অধ্যাদেশকে হুবহু আইনে রূপ দিতে হলে দিনে গড়ে চারটির বেশি বিল প্রক্রিয়ায় নিতে হবে– যা সংসদীয় সময় ও মানের প্রশ্ন তুলবে। গণতন্ত্রে আইন কেবল কাগজ নয়; এটি বিতর্ক, সংশোধন, জবাবদিহি ও জনআস্থার ফল। 

অধ্যাদেশ জরুরি ওষুধের মতো– কেবল জীবন বাঁচাতে ব্যবহৃত হয়, প্রতিদিনের খাদ্য নয়। 

১২ মার্চের অধিবেশন তাই শুধু রুটিন বৈঠক নয়; এটি গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের পরীক্ষা। ১৩৩টি অধ্যাদেশের প্রতিটিকে পৃথকভাবে যাচাই, প্রয়োজনীয় অধ্যাদেশটিকে আইনে রূপ, অপ্রয়োজনীয়টিকে বিদায়– এই বাছাই প্রক্রিয়াই নির্ধারণ করবে আমরা জরুরিকে নিয়মে পরিণত করব, নাকি নিয়মকে পুনরুদ্ধার করব। গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য অনেক সময় সংখ্যায় নয়, প্রক্রিয়ায় মাপা হয়। এখন সেই প্রক্রিয়াকে শক্ত করার সময়।

আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব: প্রাবন্ধিক ও আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
[email protected]

আরও পড়ুন

×