ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

রাজনীতির ময়ূরপুচ্ছধারী কাকেরা

রাজনীতির ময়ূরপুচ্ছধারী কাকেরা
×

দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:১১ | আপডেট: ০৬ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:১৫

অনুপ্রবেশ কিংবা অনুপ্রবেশকারী এই শব্দগুচ্ছ নানা ক্ষেত্রে নানা উপমায় ব্যবহূত হলেও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে এ যেন এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যঞ্জনা নিয়ে এসেছে। সীমান্তে অনুপ্রবেশ, আমাদের সাগর এলাকায় মাছ ধরতে ভারত কিংবা মিয়ানমারের জেলেদের অনুপ্রবেশ ইত্যাদি খবর সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই ওঠে আসে। কোনো কোনো উন্নত দেশে জীবন-জীবিকার ঔজ্জ্বল্যের আশায় অনুপ্রবেশ করতে গিয়ে সাগর-মরুপথ কিংবা জঙ্গলে প্রাণহানির মর্মন্তুদতার খবরও প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত-প্রচারিত হয়ে থাকে। অনুপ্রবেশ কিংবা অনুপ্রবেশকারী এই শব্দ দুটি নিয়ে এত গৌরচন্দ্রিকার মূল কারণ চলমান দুর্নীতিবিরোধী কিংবা শুদ্ধি অভিযান। ক্ষমতাসীন দল এবার নিজেদের মধ্যে এই কার্যক্রম শুরু করেছে। তাদের এই আত্মজিজ্ঞাসা, আত্মসমালোচনা বিলম্বিত হলেও শুভ উদ্যোগ বলা যায়।


এও বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়তা-সদিচ্ছার সুস্পষ্ট নিদর্শন হলো এই শুদ্ধি অভিযান। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, দুর্নীতিবাজ কেউ ছাড় পাবে না। সম্প্রতি ক্যাসিনোবিরোধী কর্মকাণ্ডের জের ধরে অভিযান চালাতে গিয়ে কেঁচো খুঁড়তে সাপের সন্ধান মিলছে। সম্রাট, শামীম উপাখ্যানের পাশাপাশি নতুন নতুন উপাখ্যানও সৃষ্টি হচ্ছে। সরকার অর্থাৎ আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল অনেকের বক্তব্যে প্রায়ই শোনা যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনেকের আমলনামা রয়েছে। এও বলা হয়েছে- আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী পরিচয়ে যারা দুস্কর্ম করেছে কিংবা করছে, তারা দলে 'অনুপ্রবেশকারী'। প্রধানমন্ত্রীর ওপর হামলাকারীরাও যোগ দিয়েছে আওয়ামী লীগে এমন খবরও প্রকাশিত হয়েছে রোববারের (৩.১১.২০১৯) সমকালে। শোনা যাচ্ছে, দলে অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। এমনকি একসময় যারা জামায়াত-শিবিরের কিংবা বিএনপির প্রতাপশালী নেতা ছিলেন তারাও আওয়ামী লীগে ঢুকে 'সাচ্চা' আওয়ামী লীগার বনে গেছেন! কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তারা তো আর এমনি এমনিই ঢুকে পড়েননি, নিশ্চয় আওয়ামী লীগের কারো না কারোর হাত ধরেই আওয়ামী লীগের ছায়াতলে এসেছেন।

অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে বের করবেন ভালো কথা। নিঃসন্দেহে শুভ উদ্যোগ। কিন্তু যাদের হাত ধরে তারা অনুপ্রবেশ করল, যাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তুঘলকিকাণ্ড চালাল, আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে গেল, তাদের অস্পর্শিত রেখে শুদ্ধি অভিযানের সুফল কতটা মিলবে? দুর্নীতি নির্মূল কিংবা শুদ্ধি অভিযানের যে অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি আমরা শুনছি তা স্বস্তিদায়ক বটে; তবে কাজটি সহজসাধ্য নয়। অত্যন্ত কঠিন কাজ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেহেতু বাঘের পিঠে সওয়ার হয়েছেন, সেহেতু একটা 'কিছু' তাকে করতেই হবে। খন্দকার মোশতাকরা কেন 'ঘরের শত্রু বিভীষণ' হয়ে উঠেছিল, তা সচেতন মানুষ মাত্রই জানা। সম্রাটদের যারা সম্রাট বানিয়েছেন, তাদের হাত নিশ্চয়ই অনেক লম্বা এবং তারা বলবানও বটে। বটবৃক্ষের ছায়ায়ই সম্রাট-শামীমরা বেড়ে উঠেছে এবং এদের সংখ্যাও কম নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, ওই সব বটবৃক্ষের শিকড় উপড়ে ফেলবে কে?

'কাকের ময়ূরপুচ্ছ ধারণ'- বাঙালি সমাজে এই প্রবাদটি বহুল প্রচলিত। 'ভাত ছিটালে কাকের অভাব হয় না'- এই প্রবাদটিও এ সমাজে বহুল প্রচারিত। প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামী লীগের বলবানরাই কি ভাত ছিটিয়ে এই 'কাউয়া'দের এনেছেন? নাকি তারা নিজেই ঠাঁই নিয়েছে আওয়ামী লীগ চত্বরে? যেভাবেই হোক, আবর্জনা খাওয়া কাকেরা ময়ূরপুচ্ছ ধারণ করে পাল্টে ফেলেছে চেহারা। ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজির মচ্ছব যারা চালিয়েছে, তা তো আজকের যুগে প্রযুক্তির বিকাশের কল্যাণে গোপন থাকার বিষয় নয়। এখন যদি আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা বলেন এসব তারা জানতেনই না, তাহলে এমন যুক্তি ধোপে টেকে না। একজন সদ্য সাবেক ষাটোর্ধ্ব যুবলীগপ্রধান ওমর ফারুক চৌধুরীর দুস্কর্ম এতদিন গোপন ছিল কীভাবে? এমন ওমর ফারুক চৌধুরীর সংখ্যা কত? এমন প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়।

ময়ূরপুচ্ছধারী কাকেরা এত বাঘা বাঘা নেতা-নীতিনির্ধারকদের চোখে ধুলা দিয়ে মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খেল অথচ কেউ টেরই পেলেন না! এমন প্রশ্ন বরং আরও প্রশ্নেরই জন্ম দেয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি মনে করেন এবং এই সিদ্ধান্তে অটল থাকেন যে, ময়ূরপুচ্ছধারী কাকেদের পাশাপাশি তাদের আশীর্বাদ দানকারীদের শিকড়ও উপড়ে ফেলবেন, তাহলে তা শুধু তার ভোটের রাজনীতিতেই তাকে যে পোক্ত আসনে বসাবে তাই নয়; একই সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক ও সরকার পরিচালনার ইতিহাস তাকে অনন্য স্থান করে দেবে। যদিও দুর্মুখেরা বলেন- পানি আর কতদূর গড়াবে! পানি গড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছার আগেই মাটি শুষে নেবে। এমন বহুবিধ আশঙ্কা জিইয়ে আছে বটে; তবে বিলম্বে হলেও আমাদের নষ্ট-দূষিত-গলিত রাজনীতির যে শুদ্ধিকরণের অঙ্গীকার মিলেছে, তা দেশের সাধারণ মানুষদের আশান্বিত করেছে। তারা নতুন করে স্বপ্নও দেখতে শুরু করেছে। হ্যাঁ, স্বপ্ন তো দেখতেই হবে, তা না হলে মানুষ দুঃস্বপ্নের থাবা থেকে বাঁচবে কী করে! উল্লেখ্য, এ কথা ভুলে গেলে চলবে না এ দেশের রাজনীতির বিপুল অর্জনও রয়েছে। বায়ান্ন, ঊনসত্তর, একাত্তর- এরই দৃষ্টান্ত। কিন্তু স্বাধীন দেশে পঁচাত্তর-পরবর্তী রাজনীতি যে বিপথগামীদের মুঠিবদ্ধ হয়, এরই বিরূপ ফল এখনও বইতে হচ্ছে।

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনোত্তর (বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের বিপুল পরাজয়ের পর) হঠাৎ করে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরে শুরু হয় দল ভারী করার অপপ্রবণতা। ফুলের তোড়ায় বরণ করতে থাকেন আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিরা। বিএনপি-জামায়াতের সুবিধাবাদীরা রাতারাতি বনে যেতে থাকেন আওয়ামী লীগের হোমরাচোমরা। তারা জেলা-উপজেলা এমনকি বিভাগীয় পর্যায়ের কিংবা আরও ওপরের স্তরেও পদ বাগাতে থাকেন। আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের নির্দেশ অমান্য করেই দলের কিছু নেতা-মন্ত্রী-এমপি এই অপপ্রক্রিয়া শুরু করেন, যার ফল আখেরে ভালো হয়নি, হওয়ার কথাও নয়। অনুপ্রবেশ যে শুধু আওয়ামী লীগেই ঘটেছে তাই তো নয়, অনুপ্রবেশ ঘটেছে ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ অন্যান্য অঙ্গ সংগঠনেও। গত এক দশকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের অর্জন যে আকাশছোঁয়া, তা অস্বীকার করা দুরূহ। কিন্তু এই অর্জনের অনেকটাই বিসর্জন ঘটেছে এই ময়ূরপুচ্ছধারী ও দলের স্বার্থান্বেষীদের কারণে।

সুতরাং যে প্রশ্নটা উঠে আসছে তা হলো, এই ময়ূরপুচ্ছধারীদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করার মূল্য দিতে হচ্ছে আজ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনগুলোকে। যাদের কারণে এই পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে, তারা কি অধরাই থেকে যাবেন? এই প্রশ্নটি সঙ্গত কারণেই ক্রমে জোরালো হচ্ছে। টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে দলকে সুসংগঠিত ও হাইব্রিডমুক্ত করতে বিভিন্ন সময়ে দলে অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা তৈরি করে ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা আরও আগেই উত্থাপন করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের বারবার তাগিদ দিয়েও কাজ হয়নি। আজ বিষবৃক্ষের ডালপালা-শিকড় সবই অনেক ছড়িয়ে গেছে। তাই প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান শেখ হাসিনাকে অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করে সবদিক সামলাতে হচ্ছে। বর্তমান রাজনীতিতে 'সততা' ও 'আদর্শ' শব্দ দুটি অনেকটা যেন 'সোনার পাথর বাটি'র  মতো। কিছু রাজনীতিকের প্রশ্নবিদ্ধ দেশপ্রেম ও সচেতন ধান্দাবাজদের জন্য আজ গণতন্ত্রও কলুষিত।

পল্টিবাজ-সুবিধাবাজরা এতদিন যে দলকে ব্যবহার করে এত কিছু করেছে, তারা আজ পুরোনো-ঐতিহ্যবাহী একটি রাজনৈতিক দলের কাছে আবর্জনা বা বস্তাপচা আলুর মতো, যারা অন্য ভালো আলুরও পচনের কারণ। প্রভাবশালী এসব তথাকথিত পচা-আবর্জনার আড়ালে থেকে যাওয়া কয়েক শতাংশ প্রকৃত দেশপ্রেমী, মানবপ্রেমী, সৎ ও প্রতিবাদীদের চলমান কঠিন যুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে। ময়ূরপুচ্ছধারী কিংবা তথাকথিত অর্থাৎ মুখোশধারী আওয়ামী লীগের নেতারা রাজনীতি ও গণতন্ত্রের প্রহরী নন। কাজেই এই বর্ণ চোরাদের ছেঁটে ফেললে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার ক্ষতি হবে না বরং লাভের সম্ভাবনাই বেশি। সময় বয়ে যায়, কাজেই এই রণে ভঙ্গ দিলে ভবিষ্যতের জন্য ভুলটাই পুষ্ট হবে। এ ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ না হলেই মঙ্গল।

-লেখক ও সাংবাদিক
[email protected]

আরও পড়ুন

×