সাক্ষাৎকার: ড. মো. ছাদেকুল আরেফিন
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় হবে শিক্ষার্থীবান্ধব
সাক্ষাৎকার গ্রহণ: পুলক চ্যাটার্জি
প্রকাশ: ২২ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:০৩
অধ্যাপক ড. মো. ছাদেকুল আরেফিন (আরেফিন মতিন) বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের
(ববি) উপাচার্য পদে সদ্য যোগদান করেছেন। এর আগে ১৯৯৮ সাল থেকে তিনি রাজশাহী
বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগে অধ্যাপনা শুরু করেন। তার আগে সিলেটের
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন। একই
বিভাগে ১৯৯৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ
থেকে এমফিল এবং ২০০৩ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। রাজশাহী
বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রামা অ্যাসোসিয়েশনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং এ
বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের নেতৃত্ব দেন তিনি। বঙ্গবন্ধু
পরিষদ রাজশাহী জেলা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০১১ সালে রাজশাহী
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও একই বছর বাংলাদেশ
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় মহাসচিবের দায়িত্ব পালন
করেন তিনি। গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নের ওপর তার লেখা গবেষণা
গ্রন্থ দেশ-বিদেশে সমাদৃত। তার রয়েছে ১৮টি আন্তর্জাতিক ও জাতীয় গবেষণা
প্রকাশনা
সমকাল : বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিতে আপনার পরিকল্পনা কী?
ড. মো. ছাদেকুল আরেফিন :বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে রয়েছে বিপুল
সম্ভাবনা। আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিতে চাই। এ জন্য শিক্ষা-গবেষণা এবং
সহশিক্ষা কার্যক্রম যথাযথভাবে পরিচালনা করা হবে। যার মাধ্যমে এ
বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পাবে। শিক্ষার্থীদের
বিজ্ঞান ও প্রগতিমনস্ক এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ করে তুলতে সব ধরনের
প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। এক কথায় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়কে গড়ে তুলতে চাই
শিক্ষার্থীবান্ধব দেশসেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।
সমকাল :উপাচার্য পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকার পর আপনি যোগদান করেছেন। সামনে
অনেক চ্যালেঞ্জ। বিরাজমান সংকটগুলোর সমাধানে কী উদ্যোগ নেবেন?
ছাদেকুল আরেফিন :উপাচার্য না থাকার কারণে সৃষ্ট সমস্যাগুলো সমাধানে যথাযথ
পদক্ষেপ নেব সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। শৃঙ্খলার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা
করতে আমি দৃঢ়ভাবে আত্মবিশ্বাসী। এ জন্য বরিশালের সর্বস্তরের নাগরিক নেতাদের
সহযোগিতা প্রয়োজন। সবার সহযোগিতায় ববি এগিয়ে যাবে মর্যাদার আসনে।
সমকাল : বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষিণাঞ্চলের ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় রেখে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি?
ছাদেকুল আরেফিন : বরিশাল অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য ধারণ
করে, এমন বিষয়গুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চালু করার উদ্যোগ নেব। এ ক্ষেত্রে
ববিতে ভবিষ্যতে ফিসারিজ, বন, মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং- এসব বিভাগ চালু হতে পারে।
পদ্মা সেতু চালু হলে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিপুল
প্রভাব পড়বে। এ বিষয়টিও আমরা বিবেচনায় নেব।
সমকাল :ববিতে সেশনজট সৃষ্টি হয়েছে। তা দূর করতে কী পদক্ষেপ নেবেন?
ছাদেকুল আরেফিন :শিক্ষা কার্যক্রমকে যথাযথভাবে পরিচালনার মাধ্যমে সেশনজট
দূর করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য একাডেমিক ক্যালেন্ডার পর্যালোচনা করে
প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে প্রত্যেকটি বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া
হয়েছে।
সমকাল :ক্যাম্পাসে খাবার পানি, শ্রেণিকক্ষ ও আবাসিক সংকট প্রকট। এগুলো নিরসনে নতুন কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা?
ছাদেকুল আরেফিন :বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন
করব। সে পরিকল্পনার আওতায় প্রয়োজনীয় একাডেমিক ভবন, আবাসিক হল, মিলনায়তন,
শিক্ষক-কর্মকর্তাদের আবাসন সংকট দূর করতে চাই। সম্প্রতি আবাসিক হলগুলো
পরিদর্শন করেছি। তখন শিক্ষার্থীরা সুপেয় পানি সংকটের কথা বলেছে। তাৎক্ষণিক
নির্দেশনা দিয়েছি তিনটি হলে এবং একাডেমিক ভবনগুলোতে দ্রুত সুপেয় পানির
ব্যবস্থা করতে। আমি লাইব্রেরিও ঘুরে দেখেছি। লাইব্রেরিতে বিষয়ভিত্তিক বই
আরও বাড়ানো হবে। পাঠকক্ষের পরিসর বৃদ্ধির উদ্যোগ নেব। শিক্ষার্থীদের
স্বাস্থসেবা দেওয়ার পরিসর বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
সমকাল : ববিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নেই। এ ব্যাপারে কী পরিকল্পনা রয়েছে?
ছাদেকুল আরেফিন :বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে প্রয়োজনীয়
বরাদ্দপ্রাপ্তি সাপেক্ষে ববির গবেষণা খাতকে সম্প্রসারিত করতে চাই। এ উদ্যোগ
বাস্তবায়নে ইউজিসির উদার সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন। গবেষণার কাজে
শিক্ষার্থীদেরও যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সমকাল :বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্ভিস রুল, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী
আপগ্রেডেশন বিধি, প্রভিডেন্ট ফান্ড বিধি রয়েছে। কিন্তু সেগুলো কার্যকর
হয়নি, বাস্তবায়নে কী পদক্ষেপ নেবেন?
ছাদেকুল আরেফিন :বিশ্ববিদ্যালয় সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সার্ভিস রুলসহ
অন্য বিধিগুলো পর্যালোচনা ও অধিকতর যাচাই-বাছাই শেষে বাস্তবায়নের যথাযথ
উদ্যোগ নেওয়া হবে। আসন্ন (২৭ ও ২৮ ডিসেম্বর) ভর্তি পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে
সম্পন্ন করার পর দীর্ঘদিনের জমে থাকা সংকটগুলো পর্যায়ক্রমে সমাধানের কাজে
হাত দেব।
সমকাল :ববিতে শুরু থেকে প্রো-ভিসি নেই। কোষাধ্যক্ষ ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক
নেই। সিনিয়র শিক্ষক (অধ্যাপক) নেই। এ ব্যাপারে কী উদ্যোগ নেবেন?
ছাদেকুল আরেফিন : আমি ববিতে যোগদানের আগেই এ বিষয়গুলো সম্পর্কে অবহিত
হয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো শূন্য। ধাপে ধাপে এ সমস্যাগুলো
সমাধান করা হবে। প্রত্যেক বিভাগের শিক্ষা কার্যক্রম উপযুক্তভাবে পরিচালনার
জন্য অভিজ্ঞ ও সিনিয়র শিক্ষকদের আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। শুরুতে
জ্যেষ্ঠ পর্যায় থেকে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ
এতদিনে আরও সমৃদ্ধ হতো।
সমকাল :ববি সিন্ডিকেটের সভা হয় না ৮ মাস। এ নিয়ে কোনো পরিকল্পনা আছে কি?
ছাদেকুল আরেফিন :সামনে ভর্তি পরীক্ষা। তাই পরীক্ষা আয়োজনের জন্য প্রচুর সময়
দিতে হচ্ছে। ভর্তি পরীক্ষা শেষে যত দ্রুত সম্ভব সিন্ডিকেটের সভা করার
উদ্যোগ নেব।
সমকাল :ছাত্র রাজনীতির ব্যাপারে আপনার চিন্তাভাবনা কী?
ছাদেকুল আরেফিন : বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে।
মুক্তিসংগ্রাম ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ছাত্ররাই সংগঠিত হয়ে অধিকার আদায়
করেছে। আমি ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করার পক্ষে না। সুষ্ঠু ছাত্র রাজনীতির
প্রয়োজনীতা রয়েছে। ছাত্র রাজনীতি না থাকলে জাতীয় নেতৃত্ব সৃষ্টি হয় না। তবে
ছাত্র রাজনীতি হতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার স্বার্থের ভিত্তিতে।
সমকাল : ববির শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আপনার পরামর্শ কী?
ছাদেকুল আরেফিন :শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলতে চাই, তারা যেন শিক্ষা
কার্যক্রম ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে উপযুক্তভাবে মনোনিবেশ করে। তাদের অভিভাবক
হিসেবে আমি যে কোনো প্রয়োজনে পাশে থাকব। শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, সৃজনশীল ও
সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করা হবে। আমি চাই, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের
সব শিক্ষার্থী তাদের চিন্তা ও কর্মে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করুক।
সমকাল :ব্যস্ততার মধ্যেও সমকালকে সময় দেওয়ার জন্য আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ।
আমাদের প্রত্যাশা, আপনার নেতৃত্বে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে যাবে।
ছাদেকুল আরেফিন :মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা
জানাই আমাকে আস্থায় নিয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে ৪ বছরের জন্য
নিয়োগ দেওয়ায়। মনপ্রাণ দিয়ে ভালো কিছু করার চেষ্টা চালিয়ে যাব। এ জন্য
সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। বিশেষ করে গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
আমি নিজেও গণমাধ্যমবান্ধব মানুষ। সবটুকু উজাড় করে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের
সেবা করব। সমকালের সাফল্য ও সমৃদ্ধি কামনা করছি।
