আ'লীগে এক নেতা এক পদ সম্ভব?
বিভুরঞ্জন সরকার
প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:০৪
বড় দলের সম্মেলন মানেই বড় আয়োজন, বড় হৈচৈ, বড় প্রত্যাশা। সে দলটি যদি হয়
ক্ষমতাসীন এবং দলটির নাম হয় আওয়ামী লীগ, তাহলে তো কথাই নেই। আওয়ামী লীগের
কাছে মানুষের আশা বেশি, হতাশাও বেশি। আওয়ামী লীগ এ দেশের মানুষকে স্বাধীনতা
দিয়েছে; কিন্তু অর্থনৈতিক মুক্তি দিতে পারেনি। অথচ যার হাতে আওয়ামী লীগের
নবজন্ম ঘটেছে, উত্থান ঘটেছে; যিনি আওয়ামী লীগের প্রাণপুরুষ এবং সবচেয়ে
জনপ্রিয় নেতা, সেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে
স্বাধীনতা ও মুক্তি দুটিই দিতে চেয়েছিলেন। প্রথমটা দিয়ে দ্বিতীয়টা দেওয়ার
প্রস্তুতিলগ্নেই ঘাতকের তপ্ত বুলেট তাঁর বক্ষ বিদীর্ণ করে দেয়। এখন তাঁর
কন্যা শেখ হাসিনা পিতার অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে
বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
শেখ হাসিনার শক্তি তাঁর দল, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। হাসিনার শক্তি দেশের
পরিশ্রমী আত্মপ্রত্যয়ী কোটি কোটি জনগণ। জনগণ এবং দল যখন এক কাতারে থাকে,
তখনই সেটা হয় অপ্রতিরোধ্য শক্তি। দল যখন জনবিচ্ছিন্ন হয়; জনতার স্বার্থ এবং
দলের স্বার্থ যখন বিপরীতমুখী হয়, তখন দল আর শক্তি থাকে না। আওয়ামী লীগ
ক্ষমতায় আছে টানা তিন মেয়াদে। ক্ষমতার রাজনীতির কিছু কুফল আছে। ক্ষমতা অনেক
কিছু বদলে দেয়। ত্যাগের আদর্শ থেকে ভোগের স্পৃহা প্রবল করে তোলে। জীবনের
মোহের কাছে হার মানা হলো মানুষের সবচেয়ে বড় মানবিক দুর্বলতা। এই দুর্বলতাকে
জয় করার জন্য যে উন্নত নৈতিক চেতনাবোধ থাকার কথা, সেটা না থাকার কারণেই
দেখা দেয় বিপর্যয়। নেতৃত্ব দূরদর্শী ও বিচক্ষণ হলে বিপর্যয় এড়ানো যায়।
রাজনৈতিক দল এমন একটি সামাজিক সংগঠন, যাকে নিয়মিত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে
যেতে হয়। স্থবিরতা রাজনৈতিক দলের বড় শত্রু। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে
মানুষের রুচি, চাহিদা ইত্যাদিরও বদল ঘটে। যে রাজনৈতিক দল পরিবর্তনের সঙ্গে
খাপ খাওয়াতে পারে না; মানুষের পরিবর্তিত চাহিদা ও মনস্তত্ত্ব বুঝতে পারে
না; সেই রাজনৈতিক দল পিছিয়ে পড়ে; হারিয়ে যায়। আওয়ামী লীগের সামনে এখন বড়
চ্যালেঞ্জ- দলের মধ্যে যে দুর্বলতাগুলো দেখা দিয়েছে, যেসব ক্ষতিকর উপাদান
দলটিকে
গ্রাস করছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে কি-না?
দুই.
নানা আশা-আশঙ্কা সামনে নিয়ে আগামী ২০-২১ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয়
সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর আগেই চারটি সহযোগী সংগঠন- যুবলীগ,
স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগ এবং কৃষক লীগের সম্মেলন হয়ে গেছে। এখন মূল
দলের সম্মেলন সফল করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, তোড়জোড় শুরু হওয়ার
অপেক্ষায় এখন আওয়ামী পরিবার। এবার এক বিশেষ পরিস্থিতিতে মূল দল এবং সহযোগী
সংগঠনগুলোর সম্মেলন হতে যাচ্ছে। সম্মেলন ঘিরে যতটা না উৎসাহ-উদ্দীপনা, তার
চেয়ে বেশি শঙ্কা ও সতর্কতা। কারণ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দেশে
দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু হয়েছে এবং এই অভিযানের প্রথম ধাক্কাটা লেগেছে
আওয়ামী পরিবারেই। শুদ্ধি অভিযান ঘর থেকে শুরু হয়েছে এবং এটা অব্যাহত থাকবে
বলেও প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন। অপরাধী নিজ দলের কিংবা পরিবার বা আত্মীয়
হলেও রেহাই মিলবে না বলে রেড সিগন্যাল দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ফলে মুখ শুকিয়েছে অনেকেরই।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগে
অনুপ্রবেশকারী, বিতর্কিত ও অপকর্মকারীদের নামের তালিকা শেখ হাসিনার হাতে
রয়েছে। ফলে সম্মেলনে নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে অনেকেরই ভাগ্য বিপর্যয়ের
আশঙ্কা আছে। কেউ কেউ অবশ্য মনে করেন, যত গর্জে তত বর্ষে না। আওয়ামী লীগ
টানা ক্ষমতায় থাকায় দলের মন্ত্রী, এমপি এবং কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল নেতার
অনেকেই দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতিসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছেন। ঠগ
বাছতে গাঁ উজাড় হওয়ার অবস্থা হতে পারে। তাই কিছু পরিবর্তন ঘটিয়ে একটি
প্রলেপ দিয়ে জনমত পক্ষে রাখার একটি চেষ্টা হয়তো হবে। আবার এ নিয়ে ভিন্নমতও
আছে। যারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কর্মধারা ও সৃজনশীল পরিকল্পনা
গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন তারা মনে করছেন, এবার তিনি দল এবং সহযোগী সংগঠনের
নেতৃত্ব নির্বাচনে বড় ধরনের চমক দেখাবেন। এমন দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দেবেন
না, যেটা তার সরকারের সব ভালো অর্জনকে ম্লান করে দিতে পারে। দল ও সরকারের
জন্য শেখ হাসিনা ছাড়া আর কেউ যে অপরিহার্য নন, এটা একাধিক ঘটনায় প্রমাণ
হয়েছে। এবারও বিতর্কিতদের বাদ দিলে কোনো ক্ষতি হবে না, বরং শক্তি বৃদ্ধি
হবে।
আওয়ামী লীগের শক্তি নেতাদের চেয়ে কর্মী-সমর্থকরাই বেশি। দুঃসময়ে নেতারা
দিগভ্রান্ত হন, এদিক-ওদিক করেন। কিন্তু কর্মীরা নৌকার হাল ধরে থাকেন
অত্যন্ত দৃঢ় হাতে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে শুরু করে আরও অনেক খারাপ সময়ে
এর পরিচয় শেখ হাসিনা নিজেই পেয়েছেন। তাই এবার তিনি তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার
ওপর নির্ভর করেই দলের শুদ্ধি অভিযান চালাবেন। বঙ্গবন্ধু যেমন দলে-সরকারে
চাটার দলের বিরুদ্ধে সোচ্চার
ছিলেন, শেখ হাসিনাও তেমনি সুবিধাভোগী, সম্পদ লুণ্ঠনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হবেন বলে মনে হয়।
এবার সম্মেলনের সময় নেতৃত্ব বাছাইয়ে একটি বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া যেতে পারে।
সেটা হলো- এক নেতা, এক পদ নীতি। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোতে এখন অনেক
নেতা। কেউ কেউ রসিকতা করে বলেন, আওয়ামী লীগে এখন কর্মীর চেয়ে নেতা বেশি। এই
নেতৃত্বজটের কারণে দলের মধ্যে এখন কোন্দল-দ্বন্দ্ব্ব-বিরোধ বেশি। দলে কেউ
কেউ বেশি সুবিধাভোগী, কেউ আবার উপযুক্ত মূল্যায়নবঞ্চিত। পাওয়া ও না পাওয়ার
ক্ষোভ-খেদে দল জর্জরিত। এর থেকে মুক্তি পাওয়ার সহজ ও টেকসই উপায় হলো 'এক
নেতা এক পদ' নীতি কার্যকর হওয়া। যিনি জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন, তিনি
দলের সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদক হবেন না বা হতে পারবেন না। মেয়র ও
চেয়ারম্যানরা দলের পদে না থাকলে আরও অনেককে দলীয় পদ দিয়ে খুশি করা যাবে।
একইভাবে মন্ত্রী-এমপিরাও দলের নেতৃত্বে থাকবেন না। আর দলের সভাপতি ও সাধারণ
সম্পাদকের একজন মন্ত্রিসভায় থাকবেন না। দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী
হিসেবে শেখ হাসিনার অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য। তবে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব
নির্বাচনের বিষয়টি মাথায় রেখে একজন নির্বাহী সভাপতির কথা ভাবা যেতে পারে।
এতে শেখ হাসিনার ওপর চাপও কিছুটা কমবে। কিন্তু যাকে সাধারণ সম্পাদকের
দায়িত্ব দেওয়া হবে, তাকে অবশ্যই মন্ত্রিসভার বাইরে রাখতে হবে। দল সংগঠিত ও
শক্তিশালী না হলে একটি রাজনৈতিক সরকার সফলভাবে দেশ চালাতে পারে না। ওপরভাসা
সমাধানের দিকে বেশি মনোযোগ না দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধানের কথাই
ভাবা উচিত বলে রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা মনে করেন। মনে রাখতে হবে, সরকারের জন্য
এখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হুমকিস্বরূপ নয়। ঝড়ের ঝাপটা আসবে অতর্কিতে, অন্য
কোনোদিক থেকে। সেই অতর্কিত ঝড় মোকাবিলায় সক্ষম একটি মজবুত দল
বা রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার কাজে হাত দেওয়া হোক আওয়ামী লীগের আগামী সম্মেলনে।
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক
- বিষয় :
- কাউন্সিল
- বিভুরঞ্জন সরকার
