আলতাফ মাহমুদ সংগীত বিদ্যালয় রক্ষা করুন
রণেশ মৈত্র
প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:১৭
ডিসেম্বরের ২ তারিখে এই বিজয়ের মাসে সমকালে 'আলতাফ মাহমুদ সংগীত
বিদ্যালয়ের সম্পত্তি বেহাতের আশঙ্কা' শীর্ষক খবরটি আমাদের উদ্বিগ্ন না করে
পারে না। আমরা সারাদেশেই দেখছি ভূমিখেকোদের উৎপাত। যারা আইন মেনে চলেন,
আইনের নামে তারাই আবার বেআইনি কার্যক্রমের শিকার হন। জাল দলিল তৈরি
ভূমিখেকোদের বহু পরিচিত কৌশল। সেই কৌশল বা অপকৌশলের অসহায় শিকার হতে চলেছে
জাতির গর্বিত স্মৃতি বহনকারী বরিশাল শহরের আলতাফ মাহমুদ সংগীত বিদ্যালয়। ওই
খবরে বলা হয়েছে, 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি
ভুলিতে পারি'- একুশের এই অবিনাশী গানের সুরকার, ভাষাসংগ্রামী, শহীদ
মুক্তিযোদ্ধা আলতাফ মাহমুদের স্মৃতিচিহ্ন বরিশাল শহরে মুছে যেতে চলেছে,
মুছে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আজ থেকে ৪৭ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত শহীদ আলতাফ মাহমুদ সংগীত বিদ্যালয়ের নামে
লিজ নেওয়া অর্পিত সম্পত্তি বেহাত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে
অর্পিত সম্পত্তি লিজ নিয়ে নগরীর হাসপাতাল সড়কে ওই সংগীত বিদ্যালয়টি
প্রতিষ্ঠা করা হলেও বিদ্যালয়ের জমির মালিকানা দাবি করে বরিশাল যুগ্ম জেলা
জজ ও অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আদালতে একটি মামলা দায়ের করেছেন জনৈক শৈল
দে। তবে বরিশালে জেলা প্রশাসক জমিটি রক্ষায় সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাবেন বলে
সাংবাদিকদের বলেছেন। অন্যদিকে বরিশালের সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের
নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সংগীত বিদ্যালয়টি রক্ষায়
প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
জানা যায়, ১৯৭২ সালে বরিশাল নগরের বেশ কয়েকজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শহীদ
মুক্তিযোদ্ধা আলতাফ মাহমুদের সংগীত বিদ্যালয়ের নামে ওই জমিটি লিজ দেন
বরিশালের জেলা প্রশাসক। সেই থেকে বরিশাল হাসপাতাল সড়কের ওই একতলা বাড়িতে
শহীদ আলতাফ মাহমুদ সংগীত বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলছে। সূত্র জানায়, ১৯৯৯
সালে নগরীর রূপাতলী এলাকার বাসিন্দা রফিক উদ্দিন আহমেদ রফিক ও তার পরিবারের
সদস্যরা ওই জমি তাদের দাবি করে জিয়া উদ্দিন হাসান কবিরকে রক্ষণাবেক্ষণ ও
পরিচালনার দায়িত্ব দেন। কিন্তু ২০০৭ সালে ওই জমি অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে
সরকারি গেজেটভুক্ত হয়। ২০০৮ সালে রফিক উদ্দিন আহমেদ রফিক ও তার পরিবারের
সাত সদস্য জমি শৈল দের কাছে ১৬ লাখ টাকায় বিক্রি করেন। অন্যদিকে ২০১২ সালের
সিএস রেকর্ডেও সংগীত বিদ্যালয়ের ওই জমি জেলা প্রশাসনের ১নং খাস
খতিয়ানভুক্ত হয়।
ক্রেতা শৈল দে দখলে যেতে না পেরে ২০১২ সালে বরিশালের যুগ্ম জেলা জজ অর্পিত
সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আদালতে জেলা প্রশাসককে বিবাদী করে মামলা দায়ের করেন।
ওই মামলার বাদী শৈল দে দাবি করেন, তিনি ওই জমি দলিলমূলে কিনেছেন। উল্লেখ্য,
শৈল দে হচ্ছেন অমৃতলাল দে অ্যান্ড কোম্পানির চেয়ারম্যান বিজয় কৃষ্ণ দের
স্ত্রী। তবে জেলা প্রশাসনের অর্পিত সম্পত্তি সেল থেকে আদালতে দেওয়া
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ জমি শহীদ আলতাফ মাহমুদ সংগীত বিদ্যালয়ের নামে লিজ
দিয়ে ১৯৭২ সাল থেকে সুনামের সঙ্গে পরিচালনা করে আসছে এবং ওই জমিতে সরকার
পক্ষে লিজ গ্রহীতা ছাড়া অন্য কারও স্বত্ব বা দখল নেই। এ জমি নগরীর
প্রাণকেন্দ্রে ও অধিক মূল্যবান হওয়ায় জালিয়াতির মাধ্যমে কাগজ সৃষ্টি করে
মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।
শুনেছি, শহীদ আলতাফ মাহমুদের নামে প্রতিষ্ঠিত সংগীত বিদ্যালয়টি যে স্থানে
আছে, সেখানে রাখতে প্রয়োজনে বরিশালের সাংস্কৃতিক কর্মীরা আন্দোলনে নামবেন।
সংগীত বিদ্যালয়ের পরিচালন কমিটিরও প্রয়োজনে বৃহত্তর আন্দোলনে নামার কথা
বলেছে। জেলা প্রশাসক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সম্পত্তি ও বিদ্যালয়টি রক্ষার
সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
প্রকাশিত
সংবাদে যে অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে তাতে শৈল দে কর্তৃক দায়ের করা মামলার
রায়ের ওপর শহীদ আলতাফ মাহমুদ সংগীত বিদ্যালয়টির অস্তিত্ব লিজপ্রাপ্ত জমিতে
থাকবে কিনা, তা নির্ভর করছে। সরকার জমিটি অর্পিত সম্পত্তি (ক) শ্রেণির
তালিকাভুক্ত করায় মামলাটি আইনত অচল। মোকদ্দমাটির নির্গলিত অর্থ সরকার
অবৈধভাবে ওই সম্পত্তি অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। আদালতকে
সব পরিস্থিতি সঠিক পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করতে সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয়
এগিয়ে আসতে পারে। জেলা প্রশাসন অবশ্য মন্ত্রণালয় প্রদত্ত ক্ষমতাবলেই আদালতে
জবাব দাখিল করেছে। আশা করা যায়, আদালত মোকদ্দমার সব পরিপ্রেক্ষিত
যথার্থভাবে বিবেচনায় নিয়েই রায় ঘোষণা করেন। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, ওই
জমির মালিকানা যিনি দাবি করছেন, তিনি বরিশাল নগরের বড় ধনী এবং সে কারণে
প্রভাবশালীও। ব্যক্তিগতভাবে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, বাদী পক্ষ থেকে শহীদ আলতাফ
মাহমুদ সংগীত বিদ্যালয়ের পরিচালন কমিটিকে প্রস্তাব দিয়ে বলা হয়েছিল যে,
বাদী শহরের অন্যত্র একটি বাড়ি ভাড়া নিয়েছেন, সেই বাড়িতে সংগীত বিদ্যালয়টি
স্থানান্তর করা হোক। কিন্তু সংগীত বিদ্যালয় পরিচালন কর্তৃপক্ষ ওই প্রস্তাবে
সম্মত হননি।
বাদী যে দলিলমূলে জমির মালিকানা দাবি করছেন, সে দলিলটিই জাল এবং আইনত
অগ্রহণযোগ্য। যে জমিতে ১৯৭২ সালে শহীদ আলতাফ মাহমুদ সংগীত বিদ্যালয় সরকারের
কাছ থেকে লিজ নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, সে জমি আশি বা নব্বইয়ের দশকে এসে
বেসরকারি কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কারও কাছে কেনাবেচা করার কাহিনি যে কোনো
বিবেচনায়ই গ্রাহ্য হতে পারে না। তদুপরি বিশাল বরিশাল নগরীর লাখো বাসিন্দা
বাল্যকাল থেকেই দেখে আসছেন, ওই বিদ্যালয়টিতে নিজেদের ছেলেমেয়েদের সংগীত
লিখতে পাঠাচ্ছেন। প্রতি বছরই ওই বিদ্যালয় থেকে যথেষ্ট সংখ্যক ছেলেমেয়ে
সংগীত শিক্ষা নিয়ে সংগীত সংস্কৃতি অঙ্গনে প্রবেশ করে বরিশালের সাংস্কৃতিক
জগৎকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। সংশ্নিষ্ট জমি ওই বিদ্যালয়ের দখলে রয়েছে দীর্ঘ
৪৭টি বছর ধরে। বরিশালের সমগ্র জনগোষ্ঠী এই দখলের প্রত্যক্ষ সাক্ষী দিতেও
পরোয়া করবে না বলে বিশ্বাস রাখি। শহীদ আলতাফ মাহমুদ একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।
তার মূল্যবান অবদান রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে একুশে পদকপ্রাপ্ত
আলতাফ মাহমুদকে।
শৈল দের পরিবার সম্পর্কে যতটুকু জানা যায়, তারা কোনো প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির
অংশ নন। জানলাম, ওই বিদ্যালয়ের পৃষ্ঠপোষকও ছিলেন তারা। কিন্তু হঠাৎ করে
কোন উদ্দেশ্যে এ ধরনের কাণ্ডকারখানায় নিজেদের জড়ালেন, তা এক বিস্ময়। জাল
দলিল সম্পাদন করা তার দাতা-গ্রহীতা, সাক্ষী ও রেজিস্ট্রেশন অফিসার, দলিল
লেখক- সবাই ফৌজদারি আইনে মামলায় পড়ে যেতে পারেন, যদি চলমান মামলাটিতে
দলিলটিকে আদালত জাল দলিল বলে উল্লেখ করে প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের
ভিত্তিতে। আমাদের শ্রদ্ধা ও গর্বের সঙ্গে স্মরণে আনা প্রয়োজন যে, গণসংগীত
শিল্পী আলতাফ মাহমুদ এবং তার জীবিত-মৃত সহযোদ্ধারা জীবন-মরণ পণ করে
মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন ১৯৭১-এ ৯ মাসব্যাপী এবং অসাধারণ বিজয় অর্জন করতে
পেরেছিলেন। আমরা সবাই এ দেশে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকতে পারছি।
তাই ওই লাখো শহীদের মধ্যে বিশিষ্ট একজন গণসংগীত শিল্পী আলতাফ মাহমুদের নামে
পরিচালিত সংগীত বিদ্যালয়টিকে সমমর্যাদায় রক্ষা করা, তাকে সমৃদ্ধ করা,
বিদ্যালয়কে মহাবিদ্যালয়ে উন্নীত করার মাধ্যমেই আমরা তাকে সম্মান জানাতে
পারি। তাই মামলাটি প্রত্যাহার করে নিন। ভূমি মন্ত্রণালয় ওই জমিকে শহীদ
আলতাফ মাহমুদ সংগীত বিদ্যালয়ের নামে এবং সম্ভব হলে জমির পার্শ্ববর্তী আরও
জমি অধিগ্রহণ করে ওই সংগীত বিদ্যালয়ের নামে স্থায়ী লিজ প্রদান করে আলতাফ
মাহমুদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তার প্রতি উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করতে
পারে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়টি বেদখলের আশঙ্কা থেকে মুক্ত করতে সবরকম উদ্যোগ
নেওয়া জরুরি। আমরা এও বলতে চাই, বিদ্যালয়টির সম্পত্তি নিয়ে শঙ্কা এবং এর
উন্নয়ন না হওয়ার দায় সংশ্নিষ্ট জেলা প্রশাসন এড়াতে পারে না। এই স্মৃতি
রক্ষার আন্দোলন সফল হোক।
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
- বিষয় :
- স্মৃতি সংরক্ষণ
- রণেশ মৈত্র

