টিভি নাটকের মালিকানা
কাওসার চৌধুরী
প্রকাশ: ২৮ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:৪১
সম্ভবত '৯১ কি '৯২ সালের কথা। টিভি নাটকের একটি ঘটনা নিয়ে সাধারণ এক দর্শকের অসাধারণ কাণ্ড বেশ নাড়া দিয়েছিল আমায়। সচকিত হয়ে গিয়েছিলাম নাটক আর দর্শকের মিথস্ট্ক্রিয়া নিয়ে। বিষয়টি একটু খুলে বলি। দেশে তখন টেলিভিশনের সংখ্যা মাত্র একটি- বাংলাদেশ টেলিভিশন। ১৯৮০ সাল থেকে আমি সেই টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত নিয়মিত শিল্পী। যদিও '৭৭ সাল থেকেই টিভিতে পারফরম্যান্স শুরু করেছিলাম 'প্রাণ তরঙ্গ' নামে (কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান) একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা দিয়ে। সে অনুষ্ঠান অবশ্য আমি ছাড়াও কয়েকজন পালাক্রমে উপস্থাপনা করত সেই সময়ে। এগুলো ভিন্ন কথা। যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাইছি, সেটা টিভি নাটকের মালিকানা নিয়ে।
টিভি নাটকের মালিক আসলে কে বা কারা? নাটকের কি আদৌ কোনো একক মালিকানা আছে? থাকে কোনোদিন? আমার মতে, একেকটি নাটকের আসলে তিনটি পক্ষ। নাটকের সামনে ও পেছনে যারা কাজ করেন, তারা একটি পক্ষ। মাধ্যম হিসেবে টেলিভিশনের অবস্থানটুকু দ্বিতীয় পক্ষ। আর তৃতীয় পক্ষ হলো দর্শক। এই তৃতীয় পক্ষই আসলে সবচেয়ে শক্তিশালী ও মূল পক্ষ। কারণ, নাটক তৈরিই হয় দর্শকদের জন্য। শুরুতেই বলেছিলাম, ঘটনাটি সম্ভবত '৯১ কি '৯২ সালের। সেই সময়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনের কিংবদন্তি পুরুষ আব্দুল্লাহ আল-মামুনের লেখা এবং প্রযোজনায় একটি নাটকে অভিনয় করার সুযোগ হয়েছিল আমার। নাটকটির শিরোনাম 'যাহা পাই তাহা চাই না'। নাটকটির অবশ্য নির্বাহী প্রযোজক ছিলেন আহসান হাবীব কোহিনূর। এর প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন আসাদুজ্জামান নূর। আমি তার বন্ধুর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলাম। নাটকটির প্রধান সব চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ফেরদৌসী মজুমদার, রওশন আরা হোসেন, রুমুসহ অনেকে। আপাতদৃষ্টিতে নাটকের কাহিনি ছিল বেশ সাদামাটা। গল্পে আসাদুজ্জামান নূর ছিলেন ঢাকা শহরের একজন বড় ব্যবসায়ীর একমাত্র সন্তান, অবিবাহিত। তার মা ফেরদৌসী মজুমদার। পিতার অবর্তমানে আসাদুজ্জামান নূরই তার পিতার মস্ত বড় ব্যবসা পরিচালনা করেন। বাড়ি-গাড়ি, ধন-দৌলত আর শানশওকতের কোনো সীমা নেই তাদের পরিবারে। কিন্তু এসব ধন-দৌলত নূর ভাইকে টানতে পারে না। তিনি অতৃপ্ত। তিনি আকুল থাকেন ভিন্নতর একটি জীবনের প্রত্যাশায়। কাহিনির অন্য প্রান্তে ছিলাম আমি ও আমাদের পরিবার। আমার চরিত্রটিও অবিবাহিত। আমাদের পিতাও গত হয়েছেন বেশ ক'বছর। মা রওশন আরা হোসেন ও অবিবাহিত বোন রুমুকে নিয়ে আমাদের টানাপোড়েনের সংসার। নুন আনতে পান্তা ফুরায়। বাড়ির টিনের ছাউনি মেরামত হয় না দীর্ঘদিন। বর্ষা এলেই জরাজীর্ণ টিনের ছিদ্র দিয়ে পানি পড়ে আমাদের বিছানায়।
এই রকম একটি অবস্থায় কাহিনির প্রথম পক্ষ আসাদুজ্জামান নূর কাউকে না জানিয়ে একদিন ছোট্ট একটি হাতব্যাগ নিয়ে এসে পড়েন আমাদের ময়মনসিংহের বাড়িতে। আচমকা নূর ভাইকে দেখে আমাদের পুরো পরিবার বিস্মিত! সবাইকে আরও অবাক করে দিয়ে নূর ভাই আমাকে বলেন, 'আমি তোমার সঙ্গে জীবন বদল করতে এসেছি। এখন থেকে তোমার মা এবং বোনকে নিয়ে আমি বসবাস করব এখানে, আর তুমি চলে যাও ঢাকায়। ওখানে আমার মা এবং আমাদের সবকিছু হয়ে গেল তোমার। এসো, এভাবেই আমরা জীবন বদল করি। এর ভেতরেই আমি ভিন্ন এক জীবনের স্বাদ পেতে চাই। সঙ্গত কারণেই আমি (আমার চরিত্রটি) বাদ সাধি। এ তো হয় না, হতে পারে না। কিন্তু কে শোনে কার কথা! নূর ভাই অনড়। তিনি আমার সঙ্গে জীবন বদল করবেনই।
নূর ভাইয়ের মা (ফেরদৌসী মজুমদার) পাগলের মতো তার সন্তানকে খুঁজতে খুঁজতে একদিন জানতে পারেন, তার সন্তান আমাদের বাড়িতেই আছেন এবং আমার সঙ্গে জীবন বদল করতে চান। কোনো একদিন ভরদুপুরে, ঢাউস সাইজের দুটি টাকাভর্তি ব্যাগ নিয়ে চলে আসেন তিনি আমাদের বাড়িতে। ব্যাগ থেকে কয়েকটা পাঁচশ' টাকার নোটের বান্ডিল বের করে আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেন- জানি, টাকার লোভেই তোমরা আমার ছেলের মগজ ধোলাই করেছ। এই নাও টাকা, দুটি ব্যাগে অনেক আছে। যত ইচ্ছা নাও; কিন্তু আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দাও। বাড়ির উঠোনে দাঁড়ানো আমাদের পরিবারের সবাই তখন হতবাক। ফেরদৌসী মজুমদারের বাড়িয়ে দেওয়া টাকার বান্ডিল ক'টা আমি হাতে নিয়ে আমার মায়ের (রওশন আরা হোসেন) কাছে গিয়ে বলি- এই নাও মা; সেই টাকা, যা তুমি চেয়েছিলে আমাদের দারিদ্র্য মোচনের জন্য (প্রকৃত সংলাপ এতদিনে মনে নেই আর)! আমার চোখে তখন জলের ধারা। নাটকের গল্পটি এখানেই শেষ। কিন্তু আমি যে গল্পটি বলার জন্য পূর্বাপর ঘটনার জের টানছি, সেটা আর একটু পরে।

'৮৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে দেওয়ার পরও আমি কিন্তু টিএসসির মায়া ছাড়তে পারিনি দীর্ঘদিন। প্রায়ই যাওয়া হতো টিএসসিতে, তরুণ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার জন্য। তখন বৃহস্পতিবারে সাপ্তাহিক নাটক প্রচার হতো টেলিভিশনে। আলোচিত এই নাটকটি (যাহা পাই তাহা চাই না) প্রচারের পরদিন শুক্রবার আমি যথারীতি টিএসসিতে গিয়ে আড্ডা দিই বেলা ১১টা থেকে। আড্ডা শেষে দুপুর দেড়টার দিকে একটি রিকশা নিয়ে বাসায় ফিরছিলাম। আমি তখন এলিফ্যান্ট রোডে থাকি। রিকশাটি টিএসসি থেকে নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ি পর্যন্ত গিয়ে ডাইনে টার্ন নিয়ে এলিফ্যান্ট রোডে যাবে। কিন্তু এর মাঝে রিকশাচালক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টিচার্স ক্লাবের সামনে (মুহসীন হল মাঠের উল্টোদিক) এসে রিকশার গতি কমিয়ে দেয়। তার কোমরটি একটু বাঁকা করে আমাকে বিড়বিড় করে কী যেন বলল। আমি ওকে রিকশা থামাতে বলি। বলি, রিকশা থামিয়ে বলেন যা বলতে চান। রিকশা থামিয়ে একেবারে নেমে গেল সে। একটু বিনয়ের সঙ্গে রিকশাচালক বলল- 'স্যার, গত রাতে কাম'ডা কি ঠিক করলেন?' আমি বলি, কোন কাম'ডা? রিকশাচালক :'অই যে, নাটকে টাকা নিয়া আমনের বন্ধুরে ছাইরা দিলেন; কাম'ডা কি ঠিক অইল? স্যার, আমরা গরিব অইতে পারি। কিন্তু ছোডলোক না। টাকা নিয়া নিজেরে বেচি না।' রিকশাচালকের কথা শুনে আমি বজ্রাহত মানুষের মতো স্থির হয়ে যাই।
আজ এত বছর পরে বিষয়টি যখন নির্মোহভাবে বিশ্নেষণের চেষ্টা করি, তখন কয়েকটি উপাত্ত সামনে এসে পড়ে। এক. নাটকে আমার চরিত্রটিকে সেই রিকশাচালক নিজের শ্রেণিচরিত্রের প্রতিনিধি বানিয়ে ফেলেছে। যার ফলে টাকার কাছে আমার (নাটকের) শ্রেণিচরিত্রের মান স্খলন (টাকা নেওয়া) রিকশাচালকের শ্রেণিচরিত্রকে আহত করেছে। তার খেটে খাওয়া জীবনের অহমিকায় আঘাত লেগেছে। ক্ষুণ্ণ হয়েছে তার আত্মসম্মান। যে কারণে সে বলে, 'স্যার, আমরা গরিব অইতে পারি। কিন্তু ছোডলোক না। টাকা নিয়া নিজেরে বেচি না।' দুই. এর আগের রাতে দেখা নাটকের খলনায়ককে (তার দৃষ্টিতে) সে যখন তার রিকশায় আরোহী হিসেবে পেয়ে যায়, তখন সে তার জ্বালাটি সেই অভিনেতারূপী মানুষটির সঙ্গে শেয়ার করতে চায় সততার সঙ্গে। সে তার সম্মান হারানোর বেদনার ভাগ দিতে চায় অভিনেতাকে। সে সাহসী। মানুষ হিসেবে এই রিকশাচালকের অবস্থান অনেক ওপরে। তিন. এই রিকশাচালক একজন খাঁটি টিভি দর্শক, যে টিভি নাটককে ওউন করে। এরাই (নাটকের দর্শক) আসলে নাটকের মূল মালিক। এদের মতামত, ভালো লাগা, মন্দ লাগাকে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। চার. মাধ্যম হিসেবে টেলিভিশন অত্যন্ত শক্তিশালী একটি মারণাস্ত্র। টেলিভিশনই পারে তথাকথিত নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে জাগিয়ে তুলতে। দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি আছে, এমন মানুষকে টেলিভিশন যে কোনো অনুষ্ঠান দিয়েই প্রভাবিত, উজ্জীবিত করতে সক্ষম।
২৫ ডিসেম্বর, ২০১৯। এই দিনে 'ঢাকা টিভি' যাত্রা শুরু করেছিল ডিআইটির সেই ছোট্ট স্টুডিওতে। মাঝখানে পার হয়েছে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধ-পূর্ববর্তী লগ্নে এই টেলিভিশনের ভূমিকা অনেক ইতিবাচক। স্বাধীনতার পরে 'ঢাকা টিভি' হয়েছে 'বাংলাদেশ টেলিভিশন'। এর মাঝেই গত হয়েছে ৫৫টি বছর। বাংলাদেশ টেলিভিশনের পাশাপাশি দেশে এখন ৩০টির মতো প্রাইভেট টেলিভিশন নিয়মিত অনুষ্ঠান প্রচার করে চলেছে। দর্শকদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে টিভি অনুষ্ঠানের মান নিয়ে অনেক কথা শোনা যায়।
প্রাইভেট টেলিভিশনগুলো 'ইঁদুর দৌড়' দৌড়াতে থাক! তারা বাণিজ্য করুক। তবে বাংলাদেশ টেলিভিশনের কাছে দর্শকের প্রত্যাশা কিন্তু অনেক। সেই সৎ-সাহসী রিকশাচালকের সংখ্যা কিন্তু এখন আরও বেড়েছে। বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ প্রাইভেট টিভি চ্যানেলগুলোর কাছে তাদের প্রত্যাশা কিন্তু কম নয়। পাশাপাশি আমাদের মতো মানুষ, যাদের দ্বিতীয় জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশ টেলিভিশনে। এখনও দু'চারজন মানুষ যারা আমাদের মুখ চেনেন, তারা সেই বাংলাদেশ টেলিভিশনের কল্যাণেই চেনেন। দর্শকের কাছে এই প্রতিষ্ঠানটির দায় ও দায়িত্ব অনেক বেশি। সেগুলোর প্রতি মনোযোগী হওয়া অনেক জরুরি। পরিশেষে বিনীত আবেদন, আমাদের টেলিভিশনগুলো তাদের অনুষ্ঠানের মূল মালিকের (দর্শক) প্রতি একটু সুদৃষ্টি দিক, আমরা খুশি হবো। টিভি নাটক, টিভির সব অনুষ্ঠান 'আরও দর্শকমুখী' হোক- এটাই কামনা। সবশেষে, সেই সৎ-সাহসী রিকশাচালকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।
প্রামাণ্য চিত্রনির্মাতা ও অভিনেতা
- বিষয় :
- সংস্কৃতি
- কাওসার চৌধুরী
