রাজনীতির অনিশ্চিত গন্তব্য
বিভুরঞ্জন সরকার
প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:২৮
চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোছলেম উদ্দিন আহমেদ
প্রায় ৭০ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ৮৭ হাজার ২৪৬
ভোট। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্ব্বী বিএনপির আবু সুফিয়ান পেয়েছেন ১৭ হাজার
৯৩৫ ভোট। ভোটের ফলাফল যা হওয়ার ছিল তা-ই হয়েছে। ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি
ছিল কম। মাত্র ২২ দশমিক ৯৪ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন। বিএনপির পক্ষ থেকে
যথারীতি অভিযোগ করা হয়েছে, তাদের ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া
হয়েছে এবং এজেন্টদেরও কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। আবু সুফিয়ান এ
নির্বাচনকে প্রহসন ও তামাশা বলে উল্লেখ করেছেন।
বাংলাদেশ জাসদের কার্যকরী সভাপতি মইনউদ্দীন খান বাদলের মৃত্যুতে এ আসনে
উপনির্বাচন হলো। এ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করবে- এমন আশা কেউ করেছেন বলে
মনে হয় না। বিএনপির ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়ার অভিযোগও খুব
বাস্তবসম্মত নয়। প্রত্যেক ভোটারকে আলাদা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে চিহ্নিত
করা খুব সহজ কাজ নয়। বরং এটাই সত্য যে, ফলাফল যেহেতু তাদের অনুকূলে যাওয়ার
মতো পরিবেশ-পরিস্থিতি ছিল না, সেহেতু বিএনপির ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার
আগ্রহ বোধ করেনি। বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে নৌকা প্রতীকের সমর্থকদের তুলনায়
ধানের শীষ প্রতীকের সমর্থকদের উপস্থিতি ছিল কম। নির্বাচনের পরিবেশ ছিল
সরকারদলীয় প্রার্থীর অনুকূলে। সরকারপক্ষ থেকে বাড়াবাড়ি ছিল না- এমন কথাও
বলা যাবে না। বিজয় নিশ্চিত করতে যা যা করার দরকার, তার সবই আওয়ামী লীগ
করেছে। প্রশাসন যে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল এবং ক্ষেত্রবিশেষে তাদের
সহায়তা করেছে, তা নিয়েও বিতর্ক করা অর্থহীন।
ভোট নিয়ে আগে মানুষের মধ্যে যে আগ্রহ দেখা যেত, এখন আর তা নেই। আগে থেকেই
মানুষ ফলাফল কী হবে, জানে বলে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার গরজ বোধ করে না।
নূ্যনপক্ষে কত শতাংশ মানুষ ভোট দিলে একজন জনপ্রতিনিধি বৈধতা পাবেন, তা
যেহেতু নির্ধারণ করে দেওয়া নেই, সেহেতু ভোট কম পড়লেও কোনো সমস্যা নেই।
গণতন্ত্র যদি সংখ্যাধিক্যের শাসন হয়, তাহলে একজন জনপ্রতিনিধির নিল্ফেম্ন ৫১
শতাংশ ভোট পাওয়া উচিত। কিন্তু চট্টগ্রাম-৮ আসনে প্রায় ৭৭ শতাংশ ভোটারই
ভোটদানে বিরত থেকেছেন। এ অবস্থায় যিনি নির্বাচিত হলেন তাকে কীভাবে
সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রতিনিধি বলা যায়? সংখ্যালঘিষ্ঠ মানুষের সমর্থন নিয়ে
সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ওপর খবরদারি করার গণতন্ত্রই বর্তমানে চলছে।
নির্বাচন নিয়ে যখন মানুষের মধ্যে অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে, ভোটকেন্দ্রে মানুষের
উপস্থিতির হার যখন আশঙ্কাজনকভাবে কমছে, তখন নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে, ভোট
নিয়ে আমাদের কি কিছু চিন্তাভাবনা করা দরকার নয়? আমরা অবশ্য নতুন চিন্তায়
খুব একটা পারদর্শী নই। কলহে আমাদের যত উৎসাহ; সম্মিলনে তত নয়। পুরোনো
রেষারেষির ছক থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা আমাদের কম। আমরা গণতন্ত্রের কথা বলি,
কিন্তু সত্যিকার গণতান্ত্রিক চেতনায় নিজেদের সমৃদ্ধ করি না। অনৈক্য বা
বিভেদ আমাদের জাতীয় বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজে যে দোষে দুষ্ট, সেই দোষে
অন্যকে অভিযুক্ত করে আমরা এক ধরনের বিমল আনন্দ উপভোগ করি। বড় স্বার্থের
কাছে ছোট স্বার্থকে বলি দেওয়ার উদারতা না দেখিয়ে ছোট স্বার্থের কাছে বড়
স্বার্থকে বলি দেওয়ার সংকীর্ণতা আমাদের পেয়ে বসেছে।
আমাদের
দেশের রাজনীতি একেবারেই কলহপ্রিয়। মোটা দাগে রাজনীতির আকাশ দুই ভাগে
বিভক্ত। এক ভাগে আওয়ামী লীগ, অন্যভাগে আওয়ামী লীগবিরোধীরা। আওয়ামী লীগ
ধারার নেতৃত্ব আওয়ামী লীগের হাতে। আর আওয়ামী লীগবিরোধী ধারার নেতৃত্বে এখন
আছে বিএনপি। বিএনপিতে আপাতত নানা সংকট চললেও এবং বাহ্যত বিএনপিকে অসংগঠিত ও
দুর্বল মনে হলেও কার্যত অবস্থা নাজুক নয়। আওয়ামী লীগ সরকারে আছে। সব দেশেই
ক্ষমতাসীন দলের জনপ্রিয়তার পারদ ওঠানামা করে। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও
ব্যতিক্রম নয়। তারপরও আওয়ামী লীগ টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় আছে এবং বিরোধীরা
অনেক কৌশল করেও হালে পানি পাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ জোরজবরদস্তি করে ক্ষমতায়
আছে বলে অনেকেই অভিযোগ করেন। কিন্তু শুধু জবরদস্তি করে কি এত লম্বা সময়
ক্ষমতায় থাকা যায়? আওয়ামী লীগবিরোধীদের এই প্রশ্নের জবাব খোঁজা উচিত।
মানুষের মধ্যে যে আওয়ামী লীগের শিকড় আছে এবং দেশের স্বাধীনতা ও
উন্নয়নযাত্রায় যে এই দলের অবদান আছে- সেটা স্বীকার না করলে আওয়ামী
লীগবিরোধীরা আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করতে চাইলেও সফল হতে পারবেন না।
প্রসঙ্গত নোবেলবিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের একটি অতি সাম্প্রতিক
বক্তব্য উদ্ধৃত করছি। একটি স্মারক বক্তৃতায় তিনি বলেছেন, "বিরোধিতা মানে
কলহ নয়। বরং যুক্তিপূর্ণ বিরোধিতার দ্বান্দ্ব্বিক চরিত্র থেকেই বেরিয়ে আসে
উদ্ভাবন আর সৃষ্টির নতুন পথ। কিন্তু বিরোধিতাকে সেই সৃষ্টিশীল ভূমিকায়
উপনীত হতে গেলে, যে বিষয়ে বিরোধিতা, সে সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান ও সমঝদারি
থাকা দরকার। আর সেটা যদি থাকে, বিরোধিতা যদি ন্যায্য হয়, তাহলে তথাকথিত
'বিরোধী ঐক্য' থাক বা না থাক, বিরোধিতা ও প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়া উচিত।"
রাজনীতি দর্শনচিন্তার বাইরের কোনো বিষয় নয়। হৃদয়াবেগ দিয়ে রাজনীতির পথ তৈরি
হয় না। মস্তিস্কহীন রাজনীতি পরিচিত চালের বাইরে যেতে পারে না। আমাদের
দেশের রাজনীতি মূলত বিরোধিতার জন্য বিরোধিতার ধারায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কোনখানে
বিরোধিতা, কোন প্রশ্নে বিরোধিতা; তা পরিস্কার না করেও বিরোধিতা করা হয় বলে
সেটা মানুষের সমর্থন পায় না। আওয়ামী লীগ 'দুঃশাসন' চালাচ্ছে- শুধু এটুকু
বলে কি মানুষকে সরকারবিরোধী করে তোলা যাবে? যাচ্ছে না কিন্তু। কারণ এখানে
বিরোধিতায় ঘাটতি আছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে কারা ক্ষমতায় আসবে?
তাদের দিয়ে যে সুশাসন নিশ্চিত হবে- তার গ্যারান্টি কী?
দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি-লুটপাট-চাঁদাবাজি কি শুধু আওয়ামী লীগ শাসনামলেই হয়?
অতীতের ক্ষমতাসীনরা কী করেছে? সাধারণ মানুষের জীবনে সুখ-স্বস্তি কোন আমলে
বেশি হয়েছে? দেশের উন্নয়ন দৃশ্যমান হয়েছে কোন আমলে বেশি? এই বিষয়গুলো
বিবেচনায় না নিয়ে কেবল বিরোধিতা করলে হাততালি পাওয়া গেলেও মানুষকে রাস্তায়
নামানো যাবে না। বিরোধিতায় যদি ঘাটতি থাকে, তাহলে গর্জন হবে; বর্ষণ হবে না।
এই রাজনৈতিক বাস্তবতায় আগামী ৩০ জানুয়ারি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের
নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচনী প্রচার জমে উঠেছে। এখানেও কিন্তু
মানুষ মনে করছে- ফলাফল নির্ধারিত। আওয়ামী লীগ করছে জয়ের জন্য নির্বাচন আর
বিএনপির লক্ষ্য সরকারকে অভিযুক্ত করা। তাই সিটি নির্বাচন দেশের রাজনীতির
যাত্রাপথে নতুন কোনো মাত্রা যোগ করতে পারবে বলে মনে করার কোনো সঙ্গত কারণ
এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্নেষক
- বিষয় :
- সমকালীন প্রসঙ্গ
- বিভুরঞ্জন সরকার
