ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ফুটবল বিশ্বকাপ মঞ্চে পারফর্ম করা আমার জন্য সম্মানের: সঞ্জয়

ফুটবল বিশ্বকাপ মঞ্চে পারফর্ম করা আমার জন্য সম্মানের: সঞ্জয়
×

ডিজে সঞ্জয়। ছবি: শিল্পীর সৌজন্যে

এমদাদুল হক মিল্টন

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ | ১৩:৫৯ | আপডেট: ১৯ মে ২০২৬ | ১৪:৪২

‘ফিফা ওয়ার্ল্ডকাপ ২০২৬’-এর উদ্বোধনী মঞ্চে পারফর্ম করতে যাচ্ছেন বাংলাদেশি-আমেরিকান ডিজে সঞ্জয়। আন্তর্জাতিক এই সংগীতশিল্পীর বিশ্বসংগীতের বড় বড় তারকাদের সঙ্গে একই মঞ্চ ভাগাভাগি করার কথা রয়েছে। ফুটবল বিশ্বকাপ মঞ্চ পারফর্ম, শৈশবের বাংলাদেশ, বর্তমান ব্যস্ততা ও অন্যান্য প্রসঙ্গে তাঁর  সঙ্গে- 

প্রথমেই অভিনন্দন। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী মঞ্চে পারফর্ম করার খবর প্রথম শুনে কেমন লেগেছিল?
সত্যি বলতে, অনুভূতিটা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। ১২ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসের পার্শ্ববর্তী সোফাই স্টেডিয়ামে পারফর্ম করতে যাচ্ছি ভেবে আমি ভীষণ উচ্ছ্বসিত ও আবেগাপ্লুত। ফুটবল বিশ্বকাপ মঞ্চে পারফর্ম করা আমার জন্য সম্মানের। প্রথমেই আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়েছিল, নিজের ঘরে বসে গান তৈরি করা আর বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে ওঠার স্বপ্ন দেখা। সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে, এটা সত্যিই অবিশ্বাস্য। একই সঙ্গে বাবা-মায়ের কথাও মনে হয়েছে। তারা আমার জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। এই অর্জন তাদেরও। 

বিশ্বখ্যাতশিল্পী কেটি পেরি ও ব্ল্যাক পিঙ্ক-এর লিসার মতো তারকারা একই মঞ্চে থাকবেন। বিষয়টি কতটা রোমাঞ্চকর?
বিষয়টি এখনও অবিশ্বাস্য মনে হয়। তারা এমন শিল্পী, যাদের কাজ আমি বহু বছর ধরে অনুসরণ করেছি। এখন তাদের সঙ্গে একই বৈশ্বিক আয়োজনে অংশ নেওয়া দারুণ অনুভূতির। সবচেয়ে বড় কথা, এটি প্রমাণ করে যে, সংগীতের কোনো সীমান্ত নেই। ভিন্ন সংস্কৃতি ও দেশের শিল্পীদের সঙ্গে একই মঞ্চে থাকা আমাকে ভীষণ অনুপ্রাণিত করে।

বিশ্বকাপের মঞ্চে কি বাংলাদেশি সংস্কৃতির কোনো ছোঁয়া থাকবে?
এখনই খুব বেশি কিছু বলতে পারছি না। তবে আমার শিকড় সবসময় আমার কাজের অংশ হয়ে থাকে। বাংলাদেশের প্রভাব আমার সুর, তাল ও সংগীতচিন্তায় স্বাভাবিকভাবেই থাকে। যদিও বিশ্বকাপের মতো আয়োজন একটি বড় আন্তর্জাতিক প্রযোজনা, যেখানে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সৃজনশীল দিকনির্দেশনা অনুসরণ করতে হয়। আমি সেখানে আমার নিজস্ব শিল্পীসত্তা ও শক্তি নিয়ে অংশ নিচ্ছি।

ডিজে সঞ্জয়। ছবি: শিল্পীর সৌজন্যে

এবার ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে আসা যাক। কীভাবে গানের জগতে জড়িয়ে পড়লেন? একটু বলবেন?
আমার জন্ম বাংলাদেশের চট্টগ্রামে, তবে বড় হয়েছি ক্যালিফোর্নিয়ায়। তিন বছর বয়স থেকেই ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত শেখা শুরু করি। ১১ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাই। খেলাধুলা বা অন্য কোনো বিষয়ে খুব একটা জড়াইনি। সংগীতই ছিল আমার একমাত্র আশ্রয়। কখনো ভাবিনি সংগীতই আমার জীবনের পথ হয়ে উঠবে। ছোটবেলা থেকেই মাথায় নানা সুর আসত, আর সেগুলো গান আকারে সাজানোর চেষ্টা করতাম। ১৩তম জন্মদিনে একটি ল্যাপটপ উপহার পাই। তখনই ‘রিজন’ নামের সংগীত তৈরির সফটওয়্যার আবিষ্কার করি। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত সংগীত তৈরি থামাইনি।

আপনার শৈশব কেটেছে বাংলাদেশে। সেই স্মৃতিগুলো আপনার সংগীতে কতটা প্রভাব ফেলেছে?
অনেক বেশি প্রভাব ফেলেছে। ছোটবেলায় আমি হাবিব ওয়াহিদ ও ফুয়াদ আল মুক্তাদিরের মতো শিল্পীদের গান শুনে বড় হয়েছি। বাংলা গানের সুর, আবেগ এবং ঐতিহ্যবাহী ও আধুনিক ধারার মিশ্রণ আমার সংগীতচিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। আজও যখন আমি ক্লাব মিউজিক তৈরি করি, তখন সেই শৈশবের সংগীত স্মৃতি আমার কাজে প্রভাব ফেলে।

আপনার সংগীতজীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা কি আপনার মা?
অবশ্যই। আমার মা-ই আমাকে খুব ছোটবেলায় সংগীতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি আমাকে তবলা শেখার জন্য ভর্তি করিয়েছিলেন। সেখান থেকেই তাল-লয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। তিনি সবসময় আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন এবং আমার স্বপ্নে বিশ্বাস রেখেছেন। একজন শিল্পী হিসেবে আমি যা হয়েছি, তার শুরুটা মায়ের কাছ থেকেই। আর অনেক শিল্পীর কাছ থেকেই অনুপ্রেরণা পাই। যেমন ইয়ান্নি, হ্যান্স জিমার, এ আর রহমান, স্ক্রিলেক্স, ডেডমাউস, ক্যালভিন হ্যারিসসহ আরও অনেকে। তবে শুধু শিল্পীরাই নন, আমার বহু-সংস্কৃতির বেড়ে ওঠাও আমার সংগীত ও ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলেছে। আমি যে সুর, বাদ্যযন্ত্র ও সংগীতের ধরণ ব্যবহার করি, তার মধ্যে ছোটবেলায় শোনা সংগীতের প্রভাব রয়েছে। আমার সংগীতে প্রাচ্যের একটা ছোঁয়া আছে, আর এই সাংস্কৃতিক প্রভাবই আমার সংগীতকে আলাদা করেছে। 

যুক্তরাষ্ট্রে সংগীতকে পেশা হিসেবে নেওয়া কতটা কঠিন ছিল?
সহজ ছিল না। সংগীত অনেক পরে আমার পূর্ণকালীন পেশা হয়েছে। এই ইন্ডাস্ট্রিতে সফল হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট পথ নেই, নিজের পথ নিজেকেই তৈরি করতে হয়। একজন অভিবাসী হিসেবে অনেক সময় সাংস্কৃতিক প্রত্যাশা আর নিজের স্বপ্নের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়। অনিশ্চয়তা ছিল, চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে প্রতিদিন শিখে যাওয়ার এবং এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দক্ষিণ এশীয় শিল্পীদের অবস্থান এখন কীভাবে দেখছেন?
আমার মনে হয়, দক্ষিণ এশীয় শিল্পীদের জন্য এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ  সময় চলছে। আগে আমাদের সংগীতকে অনেক সময় নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে দেখা হতো, কিন্তু এখন আমরা বৈশ্বিক সংগীতের মূলধারার অংশ হয়ে উঠছি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শ্রোতারা দক্ষিণ এশিয়ার সুর, গল্প ও সংস্কৃতিকে গ্রহণ করছে। আমি বিশ্বাস করি, এটি কেবল শুরু। ভবিষ্যতে আমাদের সংগীত আরও বড় পরিসরে পৌঁছাবে, আর সেই পরিবর্তনের অংশ হতে পেরে আমি গর্বিত। 

ডিজে সঞ্জয়। ছবি: শিল্পীর সৌজন্যে

বাংলাদেশি চলচ্চিত্র বা শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা আছে?
অবশ্যই আছে। বাংলাদেশ সবসময়ই আমার হৃদয়ের খুব কাছের। আমি বাংলাদেশের শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করতে চাই এবং চলচ্চিত্রেও সংগীত করতে আগ্রহী। এখানে অসাধারণ প্রতিভাবান মানুষ রয়েছেন, যাদের কাজ স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক – দুই পর্যায়েই সাড়া ফেলতে পারে।

নতুন শিল্পী ও সংগীত পরিচালকের জন্য আপনার বার্তা কী?
নিজের পরিস্থিতির চেয়েও বড় স্বপ্ন দেখো। তুমি কোথা থেকে শুরু করছ, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের স্বপ্নে বিশ্বাস রাখা, ধারাবাহিকভাবে কাজ করা এবং শেখার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। হৃদয় আর আত্মা দিয়ে সংগীত তৈরি করতে হবে। সীমা ভেঙে নতুন কিছু করার চেষ্টা করতে হবে, তবে সেটি যেন বাস্তব অনুভূতির হয়। এমনভাবে গান তৈরি করতে হবে, যাতে শ্রোতা বারবার ফিরে এসে নতুন কিছু খুঁজে পায়। জোর করে সংগীত তৈরি করলে সেটা কৃত্রিম শোনায়। তাই অনুপ্রেরণা থেকেই কাজ করা উচিত। যত বেশি সম্ভব মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করতে হবে এবং এমন ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলতে হবে, যাতে মানুষ আপনাকে মনে রাখে। একটি ভালো দল ও সহায়ক পরিবেশও খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর আমি যদি কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি, অবশ্যই যোগাযোগ করতে পারেন। 

যারা এখনো আপনার সংগীতের সঙ্গে পরিচিত নয়, তাদের জন্য কোন গানগুলো শুনতে বলবেন?
‘হোয়াই ইউ রান’, ‘ব্যারিয়ার্স’, ‘লাইটস’, ‘লস্ট ইন মাই ওন ওয়ার্ল্ড’ এবং ‘সেট মি ফ্রি’—এই গানগুলো শুনতে বলব। এছাড়া ‘জয়কাস্ট’ মিক্সগুলোও শুনতে পারেন। এগুলো ৩০ মিনিটের মিশ্র সংগীত, যেখানে আমার পছন্দের গানগুলো থাকে। আমি সেগুলো লাইভ রেকর্ড করি, যাতে মানুষ বুঝতে পারে আমি কীভাবে পরিবেশন করি।

এই সময়ের ব্যস্ততা কী নিয়ে? 
বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেকে ভিন্নরূপে উপস্থাপন করতে চাই। এ কারণে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিয়েই বেশি ব্যস্ত। পাশাপাশি নতুন অনেক গান নিয়েও কাজ করছি। আমার মনে হচ্ছে, এটি আমার সংগীতজীবনের নতুন একটি অধ্যায়ের শুরু। সামনে বেশ কিছু নতুন গান ও নতুন কিছু প্রজেক্ট আসছে, যেগুলো নিয়ে আমি ভীষণ উচ্ছ্বসিত।

আরও পড়ুন

×