যত বিপ্লবীর রক্তে রাঙা সিনেমা
কোলাজ
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৫ | ১১:৩১
ইতিহাসের পাতাজুড়ে যে লড়াইগুলো হয়েছে স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার আর সমতার জন্য– সেগুলোরই জীবন্ত দলিল হয়ে উঠেছে অনেক চলচ্চিত্র। কখনও উপনিবেশবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রাম, কখনও ভোটাধিকার বা নারী অধিকারের আন্দোলন, কখনও রাষ্ট্রের দমননীতির বিরুদ্ধে নাগরিক বিদ্রোহ– প্রতিটি গল্পে রয়েছে বিসর্জন, রক্ত আর অদম্য স্বপ্নের ছাপ। সিনেমার পর্দায় সেই ইতিহাস ফিরে আসে নানা রূপে। আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গণতন্ত্র ও অধিকার কখনও অর্পিত নয়, অর্জিত। এ প্রতিবেদনে থাকছে এমন কিছু চলচ্চিত্রের আলোচনা; যেগুলো নির্মিত হয়েছে বিপ্লবীদের রক্ত, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগকে কেন্দ্র করে। আলজেরিয়ার মুক্তিযুদ্ধ থেকে মার্কিন ভোটাধিকার আন্দোলন, ব্রিটিশবিরোধী ভারত, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশ থেকে আরব বসন্ত– বিভিন্ন দেশ ও সময়ের প্রেক্ষাপটে তৈরি এ সিনেমাগুলো একদিকে যেমন অনুপ্রেরণা জোগায়, অন্যদিকে স্মরণ করিয়ে দেয় স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্য।
দ্য ব্যাটল অব আলজিয়ার্স
১৯৬৬ সালে মুক্তি পাওয়া এ সিনেমায় আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়কে (১৯৫৪-৫৭) তুলে ধরা হয়েছে। ফরাসি শাসনের বিরুদ্ধে তখন বিদ্রোহ গড়ে তুলেছে রাজনৈতিক দল ফ্রঁ দো লিবারাসিয় নাসিওনাল (এফএলএন)। যাদের দমনে উঠেপড়ে লাগে ফ্রান্স। মূল চরিত্র কর্নেল ম্যাথিউকে বিদ্রোহ দমনের দায়িত্ব দেয় ফরাসি সরকার। ম্যাথিউয়ের নেতৃত্বাধীন সেনাদের বিরুদ্ধে এফএলএনের লড়াই সংগ্রামের গল্প বলা হয়েছে সিনেমাটিতে। চলচ্চিত্রটি দেখায়, ঔপনিবেশিক উপায়ে; যেমন– সামরিক শক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের মাধ্যমে জনমতের বিরোধিতা করলে এর প্রভাব কতটা মারাত্মক হতে পারে। সাদা-কালো হলেও বাস্তবধর্মী ইফেক্টস ও মেকআপ সিনেমাটিকে এমন রূপ দিয়েছে, মনে হয় যেন আসল যুদ্ধ নিয়ে তৈরি একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখছি।
সেলমা
১৯৬৪ সালের নাগরিক অধিকার আইনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে বর্ণবৈষম্য কিছুটা প্রশমিত হলেও অনেক এলাকায় তা বহাল ছিল; যা কৃষ্ণাঙ্গদের ভোট দেওয়ার অধিকারকে কঠিন করে তোলে। ফলাফল ১৯৬৫ সালে আলাবামা অঙ্গরাজ্যের একটি শহরে ভোটের অধিকারের দাবিতে সংগ্রাম শুরু হয়। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের অধিকারকর্মী মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র এক ঐতিহাসিক পদযাত্রা শুরু করেন। আফ্রো-আমেরিকানদের ভোটাধিকারের দাবিতে লুথারের অনুসারীরা প্রায় ৫৪ কিলোমিটার (সেলমা থেকে মন্টগোমেরি) পদযাত্রা করেন। যেটির চূড়ান্ত ফলাফল ১৯৬৫ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভোটাধিকার আইনে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন। এ ঘটনা নিয়েই ২০১৪ সালে প্রকাশ পায় সেলমা নামের চলচ্চিত্রটি।
দ্য গেট অব হেভেনলি পিস
সাল ১৯৮৯। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের দাবিতে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে আন্দোলনে নামে একদল শিক্ষার্থী। যেখানে অনেক হতাহত ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে। এর বিভিন্ন সময়ের দৃশ্য নিয়ে ১৯৯৫ সালে প্রকাশ পায় তথ্যচিত্রটি। যেখানে ১৯৮৯ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ছয় সপ্তাহের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাময় দিন, বীরত্ব ও ট্র্যাজেডির গল্প বলা হয়েছে। দেখানো হয়েছে কীভাবে সরকার বিক্ষোভকারীদের (ছাত্র, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী) মধ্যে থাকা মধ্যপন্থিদের কোণঠাসা করে। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীদের কর্মকাণ্ড দ্বারা সরকারের ভেতরকার মধ্যপন্থিদের অবস্থান দুর্বল হওয়ার বিষয়টিও ফুটে উঠেছে। চরমপন্থা ও আবেগপ্রবণতার কারণে মধ্যপন্থি কণ্ঠগুলো কীভাবে ভীত ও একসময় স্তব্ধ হয়ে যায়– সেটি দেখাতে বেশ মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন পরিচালক রিচার্ড গর্ডন ও কারমা হিন্টন।
সাফ্রাজেট
শুধু কথায় নয়, কাজের মাধ্যমে জাতিকে জাগ্রত করার লক্ষ্যে ১৯০৩ সালে একটি ইউনিয়ন গড়ে তোলেন যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারের কয়েকজন নারী। এর নাম দেওয়া হয় ‘উইমেন্স সোশ্যাল অ্যান্ড পলিটিক্যাল ইউনিয়ন’। যে সংগঠন পরে ব্রিটেনে নারীদের ভোটাধিকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। বলা হয়ে থাকে বিশ শতকের ব্রিটেনে সাফ্রাজেট আন্দোলন কর্মজীবী নারীদের জীবন পুরোপুরি বদলে দেয়। এ ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত একই নামের সিনেমাটিতে এমমেলিন প্যাঙ্কহার্স্টের (আন্দোলনকারী নারী) ভূমিকায় অভিনয় করেছেন মেরিল স্ট্রিপ। সিনেমাটি মুক্তি পায় ২০১৫ সালে।
দ্য আপরাইজিং
পিটার স্নোডনের এই ডকুমেন্টারি মূলত আরব বসন্তের সময় বিভিন্ন দেশের (মিসর, তিউনিসিয়া, লিবিয়া, সিরিয়া) নাগরিকদের ধারণ করা ভিডিও দিয়ে বানানো। এতে কোনো বাহুল্য ভয়েসওভার নেই। বিপ্লব যে শুধু রাজপথে নয়, দৃশ্যের (ছড়িয়ে পড়া ভিডিও) পরিসরে ঘটে সেটি দেখিয়েছে এই তথ্যচিত্র। শিল্পরূপের জায়গায় দ্য আপরাইজিং (২০১৩) বয়ানের চেয়ে প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ভিড়ের দৃশ্য ও সামরিক সহিংসতা একই রকম মনে হয়। তবে এগুলোর মধ্যে বিক্ষোভকারীদের ক্লোজ শট নিয়ে পরিচালক আবেগের শক্তি তুলে ধরেছেন। তথ্যচিত্রটি দেখায় খাদ্য ও কাজের মতো মৌলিক মানবিক চাহিদাই একসময় বিক্ষোভের জ্বালানি হয়।
দ্য লেজেন্ড অব ভগত সিং
‘আমি আনন্দের সঙ্গে ফাঁসির মঞ্চে উঠব এবং সারাবিশ্বকে দেখাব যে লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিপ্লবীরা কতটা সাহসের সঙ্গে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে পারে।’ উক্তিটি ভারতের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা ভগত সিংয়ের; যার জীবনীভিত্তিক সিনেমাটি মুক্তি পায় ২০০২ সালে। ভগতের শৈশবে দেখা জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড থেকে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত সময়কে এ সিনেমা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন অজয় দেবগন। দেখানো হয়েছে ভগত সিংয়ের বিপ্লবী কর্মকাণ্ড, মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে আদর্শের দ্বন্দ্ব এবং হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনে রাখা ভূমিকা। গল্পের গাঁথুনির জন্য যদিও সিনেমাটিতে নাটকীয়তার ছোঁয়া আছে, তবুও ঐতিহাসিক ঘটনা ও চরিত্রের একটি শক্তিশালী উপস্থাপনা চলা যায় সিনেমাটিকে।
নো ওয়ান কিল্ড জেসিকা
ভারতে ১৯৯৯ সালের এপ্রিলে একটি রেস্তোরাঁয় খুন হন মডেল জেসিকা লাল। যেখানে গুলি করার অভিযোগ ওঠে সাবেক এক মন্ত্রীর ছেলের বিরুদ্ধে। কেউ সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়ায় হত্যা মামলাটি একসময় বন্ধের উপক্রম হয়। বিচারব্যবস্থার ওপর প্রভাবশালীদের প্রভাব ও জেসিকা হত্যার বিচার দাবিতে এক সময় ভারতের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন শুরু হয়। এ ঘটনা নিয়ে ২০১১ সালে মুক্তি পায় ‘নো ওয়ান কিল্ড জেসিকা’ নামের সিনেমাটি। এটির বেশকিছু দৃশ্য প্রশাসনিক ও বিচারব্যবস্থার অসংখ্য ত্রুটি নিয়ে দর্শকমনে রাগ, দুঃখ, হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। কিন্তু হাজারো মানুষের প্রতিবাদ এক সময় আশা ও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।
পাডা
কামাল কেএমের রাজনৈতিক থ্রিলারটি ১৯৯৬ সালের একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে। ভারতের কেরালার একটি জেলার কালেক্টরকে নিজ দপ্তরে জিম্মি করেন চার অধিকারকর্মী; যারা আদিবাসীদের ভূমির অধিকার বাস্তবায়নের দাবি জানান। দীর্ঘদিন বসবাসের মাধ্যমে জমির দখল, রাজনীতি বনাম সাংবিধানিক উপায়ে প্রতিকারের একটি চিত্র ফুটে উঠেছে এ সিনেমায়। ‘হোস্টেজ ড্রামা’ হয়েও সিনেমাটি কোনো হিরোইজমের চিত্রায়ণ নয়। বরং তথ্য, যুক্তি আর নৈতিক লড়াইয়ের ওপর জোর দিয়েছে। যেটি শেষমেশ প্রশ্ন তোলে– আইনের ভাষা বদলালে কি ইতিহাসও বদলায়?
আগুনের পরশমণি
বাংলাদেশের মূলধারার সিনেমায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে এ সিনেমার অবদান গুরুত্বপূর্ণ। রণাঙ্গনের বাইরে ঢাকার একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের যুদ্ধদিনের গল্প বলেছে সিনেমাটি। যেখানে মানবিকতা, ভয় ও সাহসকে এক সুতায় গেঁথেছেন হুমায়ূন আহমেদ। ঢাকায় গেরিলা বাহিনীর প্রতিরোধ যুদ্ধ, তাদের আশ্রয়দাতাদের সাহসী ভূমিকা ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা এ সিনেমার উপজীব্য। ১৯৯৪ সালে মুক্তি পাওয়া এ সিনেমা হুমায়ূন আহমেদের প্রথম নির্মাণ।
আবার তোরা মানুষ হ
খান আতাউর রহমানের পরিচালনায় সিনেমাটি মুক্তি পায় ১৯৭৩ সালে। বলা হয়ে থাকে, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের অন্যতম আলোচিত ও সমালোচিত সিনেমা এটি। যেখানে পরিচালক স্বাধীনতা অর্জনের পর একটি দেশের নানা অস্থিরতার গল্প বলতে চেয়েছেন। লাখো মানুষের জীবনের বিনিময়ে মুক্তি আসার পর দেশে দেখা দেয় সামাজিক অবক্ষয়, ঘুষ, দুর্নীতি, অনাচার। যাতে জড়িয়ে পড়েন কিছু মুক্তিযোদ্ধা; যা মেনে নিতে পারেন না সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রের সাত মুক্তিযোদ্ধা।
যে অস্ত্র নিয়ে মুক্তি সংগ্রাম করেছেন, সে অস্ত্র নিয়ে আবার অনাচারের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন। অনাচারে জড়িতদের আহ্বান জানান আবার মানুষ হওয়ার।
