ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সিনেমাবিমুখ দর্শক

সিনেমাবিমুখ দর্শক
×

ছবি-সংগৃহীত

অনিন্দ্য মামুন

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৫ | ১১:২৫ | আপডেট: ০৯ অক্টোবর ২০২৫ | ১২:০০

ঢাকাই সিনেমা আজ উৎসবনির্ভর হয়ে পড়েছে–এ কথাটা বহুদিনের প্রচলিত বাস্তবতা। বছরের দুই ঈদ ছাড়া কোনো সিনেমাই দর্শক টানতে পারছে না। শুধু তাই নয়, ঈদের বাইরের সিনেমাগুলো আলোচনাতেও আসতে পারছে না। চলতি বছরে দুই ঈদ বাদে প্রায় ৩০টির মতো সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। দর্শকপ্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি কোনোটি। ফলাফল–সবাই ব্যর্থতার ললাট নিয়ে ফিরেছে। এই দর্শকবিমুখতার কারণ বিশ্লেষণ করেছেন অনিন্দ্য মামুন

ঢাকাই সিনেমা এখন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। যত উন্নতির বুলি উচ্চারিত হয়, বাস্তব চিত্র ততটাই হতাশাজনক। ঈদ ছাড়া সিনেমা হলে দর্শক আসেন না, বা যে সিনেমাগুলো মুক্তি পায়, সেগুলো দর্শকের মন ছুঁতে পারে না। ফলে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি এখন কার্যত ‘ঈদ মৌসুম ব্যবসা’য় পরিণত হয়েছে। বছরের সব প্রস্তুতি, প্রচারণা, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন শুধু ঈদ। ঈদের বাইরেও সিনেমা মুক্তি পায়। সেগুলো সাফল্য পায় না, কেবল সংখ্যা বাড়ায়। সে কারণে বছর শেষে বলা যায়, ‘অর্ধশত সিনেমার বছর’ হলেও সাফল্যের খাতায় থাকে শূন্যতা। চলতি বছরের দশ মাসের হিসাব টানলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। এই বছরে দুই ঈদে মুক্তি পেয়েছে ১২টি সিনেমা। বাকি আট মাসে প্রায় ৩০টি। ঈদ ছাড়া মুক্তি পাওয়া কোনো সিনেমা দর্শক টানতে পারেনি। অথচ, নতুন বছর শুরু হয়েছিল আশাবাদ নিয়ে। ২০২৫ হয়তো হবে ঢাকাই সিনেমার পুনর্জাগরণের বছর! কিন্তু বছরের শুরুতেই সেই স্বপ্নের ঘুড়ির সুতো কেটে পড়ে লুটিয়ে মাটিতে।

ঈদে আলাদা চিত্র

মার্চ মাস ছিল ঈদের মাস। এই মাসে সিনেমা মুক্তির হিড়িক পড়ে, যেন উৎসবের আমেজ সিনেমা হলে ছড়িয়ে পড়ে। ঈদ উপলক্ষে মুক্তি পায় একাধিক সিনেমা। এর মধ্যে শাকিব খান ও ইধিকা পাল অভিনীত ‘বরবাদ’ ছিল আলোচনার শীর্ষে। প্রযোজনা সংশ্লিষ্টদের দাবি–এটি ব্যবসায়িকভাবেও সফল। এম রাহিম পরিচালিত ‘জংলি’ও ঈদের অন্যতম আকর্ষণ ছিল। সিয়াম আহমেদ ও বুবলী অভিনীত এই সিনেমাটিও বাণিজ্যিকভাবে ভালো ফল করে। আফরান নিশো ও তমা মির্জা অভিনীত ‘দাগি’ দর্শকের আগ্রহ কোড়ায় এবং ব্যবসায়িক সাফল্যও পায়। শরাফ আহমেদ জীবন পরিচালিত ও মোশাররফ করিম অভিনীত ‘চক্কর ৩০২’ প্রশংসিত হয় অভিনয় ও উপস্থাপনায়। তবে সব সিনেমা সফলতার মুখ দেখেনি। আব্দুন নূর সজল ও নুসরাত ফারিয়া অভিনীত ‘জ্বীন-৩’ এবং শাকিব খান অভিনীত ‘অন্তরাত্মা’ প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়; ফ্লপ তকমা গায়ে লাগে তাদের।

বছরের ষষ্ঠ মাসে অর্থাৎ ঈদুল আজহার সময় মুক্তি পায় ছয়টি সিনেমা। এর মধ্যে আলোচনায় ছিল শাকিব খান ও সাবিলা নূর অভিনীত ‘তাণ্ডব’। জয়া আহসানের উপস্থিতি সিনেমাটিকে বাড়তি মর্যাদা দিলেও সমালোচনাও কম হয়নি। তবে এই উৎসবে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘উৎসব’ সিনেমাটি নামের মতোই উৎসবমুখর ব্যবসা করে। তাসনিয়া ফারিণ ও শরিফুল রাজ অভিনীত ‘ইনসাফ’ আলোচনায় থাকলেও বাণিজ্যিক সাফল্যের স্পষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। আজমেরী হক বাঁধন অভিনীত ও সানী সানোয়ার পরিচালিত ‘এশা মার্ডার: কর্মফল’ ছিল আলোচিত আর্টিস্টিক ঘরানার কাজ। অন্যদিকে আরিফিন শুভ ও মন্দিরা অভিনীত মিঠু খানের ‘নীলচক্র’ বাণিজ্যিকভাবে ব্যর্থ হয়।

সিনেমার সংখ্যা বাড়ে, দর্শক বাড়ে না

চলতি বছরের হালখাতা খোলে তানভীর হাসান পরিচালিত ‘মধ্যবিত্ত’। অভিনয়ে ছিলেন শিশির সরদার ও এলিনা শাম্মি। বছরের শুরুতেই ব্যর্থতার গল্প লেখে এটি। এরপর অনন্য মামুনের ‘মেকআপ’ এবং আব্দুল হান্নানের ‘কিশোর গ্যাং’–দুটিই বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে। মাসের শেষে মুক্তি পাওয়া অমিতাভ রেজা চৌধুরীর ‘রিকশা গার্ল’ও দর্শক টানতে ব্যর্থ হয়; আলোচনাতেও জায়গা করে নিতে পারেনি।

ফেব্রুয়ারিতে নাসির উদ্দিন খান অভিনীত ‘বলী’ ও সাইমন সাদিকের ‘দায়মুক্তি’ মুক্তি পেলেও দুটিই ফ্লপ হয়। যদিও বলী কিছুটা আলোচনায় আসে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নেওয়ার কারণে। ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে রাফিয়াথ রশীদ মিথিলা ও এফ এস নাঈম অভিনীত ‘জলে জ্বলে তারা’ অল্প সময়ের জন্য খবরের শিরোনাম হয়, কিন্তু ব্যবসায়িক সাফল্য পায়নি। রাজ রিপা ও কায়েস আরজু অভিনীত ‘ময়না’ পড়ে দর্শক-অবহেলার মুখে।

মার্চে ঈদুল ফিতর ঘিরে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাগুলো কিছুটা উচ্ছ্বাস ফিরিয়ে আনে। তার পরেই নিস্তব্ধতা। এপ্রিল মাসে মুক্তি পায়নি কোনো নতুন সিনেমা। মে মাসে আসে জয়া আহসান অভিনীত ‘জয়া অ্যান্ড শারমিন’। করোনাকালীন প্রেক্ষাপটে নির্মিত হলেও এটি দর্শক টানতে পারেনি। একই সপ্তাহে নীরবে মুক্তি পায় ‘আন্তঃনগর’, প্রচারণাহীন ও অখ্যাত শিল্পীদের সিনেমা। ফলে মুখ থুবড়ে পড়ে সেটিও।

জুলাইয়ে মুক্তি পায় ‘আলী’ ও ‘অন্যদিক’। আগস্টে ‘উড়াল’ ও ‘জল ও জলরঙ’, আর সেপ্টেম্বরে ‘আমার শেষ কথা’–সবই ব্যর্থতার খাতায়। সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরের শুরু পর্যন্ত মোট দশটি সিনেমা মুক্তি পায়। এর মধ্যে ছিল বড়ুয়া সুনন্দা কাঁকনের ‘ডট’, মোহাম্মদ ইসলামের ‘আমার শেষ কথা’, সোয়াইবুর রহমান রাসেলের ‘নন্দিনী’, মুর্তজা অতাশ জমজমের ‘ফেরেশতে’, লিসা গাজীর ‘বাড়ির নাম শাহানা’, মোস্তাফিজুর রহমান মানিকের ‘স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা’, মাকসুদ হোসেনের ‘সাবা’, শফিউল আযম শফিকের ‘উদীয়মান সূর্য’, সুজন বড়ুয়ার ‘বান্ধব’ এবং নাসিম সাহনিকের ‘ব্যাচেলর ইন ট্রিপ’। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই সিনেমাগুলোর কোনোটি বাণিজ্যিকভাবে সাফল্যের মুখ দেখেনি, এমনকি আলোচনাতেও আসতে পারেনি।

যে কারণে দর্শক খরা

ঈদ ছাড়া অন্য সময়ের সিনেমাগুলো দর্শক টানতে পারছে না কেন–এ প্রশ্ন রাখা হয়েছিল ঢাকাই সিনেমার একাধিক পরিচালক, প্রযোজক ও প্রদর্শকের কাছে। সবার মতেই মূল কারণ–দায়সাড়া নির্মাণ আর দর্শকের রুচি বোঝার ব্যর্থতা। অনেকেই সিনেমা বানাচ্ছেন শুধুই আন্তর্জাতিক উৎসবের কথা ভেবে; দেশে মুক্তি যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতা। দর্শক এলো কিনা, সেটি তাদের ভাবনার বিষয় নয়। চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সাবেক সভাপতি ও মধুমিতা সিনেমা হলের কর্ণধার ইফতেখার নওশাদ বলেন, ‘ঈদ ছাড়া যেসব সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে, তার অধিকাংশকে সিনেমা বলারই যোগ্য নয়। টেলিফিল্মকেও এখন হলে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। দর্শক টাকা দিয়ে এসব দেখতে যাবেন কেন? দর্শকের রুচি বুঝে সিনেমা বানাতে হবে।’ প্রদর্শক সমিতির মিয়া আলাউদ্দীন মনে করেন, ‘ঈদ ছাড়া মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিগুলো যেন কেবল সিনেপ্লেক্সের দর্শকদের জন্য বানানো হচ্ছে। সেখানেও দর্শক পাচ্ছে না। দর্শক ফিরিয়ে আনতে হলে ঈদের বাইরেও বড় আয়োজন ও প্রচারণা দরকার।’ অন্যদিকে ‘মনপুরা’খ্যাত পরিচালক গিয়াসউদ্দীন সেলিম বললেন ভিন্ন কথা, ‘বাংলাদেশের বাইরে দেখলে বুঝবেন সিনেমা হল মানে কী পরিবেশ! আমাদের দেশে মানসম্পন্ন হলের সংখ্যা হাতে গোনা। দর্শক ফেরাতে হলে যেমন ভালো গল্প দরকার, তেমনি দরকার ভালো প্রেক্ষাগৃহ ও পরিবেশ।’

প্রচারণায় কৃপণতা

নব্বইয়ের দশকে সিনেমা মুক্তি মানেই ছিল উৎসব–শহরজুড়ে মাইকিং, রিকশা-ট্রাক র‍্যালি, ব্যান্ড পার্টি, বিশাল ফেস্টুন–সবই সাধারণ দর্শকের কাছে সিনেমার খবর পৌঁছে দিত। এখন সেই দিন অতীত। ডিজিটাল যুগে প্রচারণা সংকুচিত হয়ে পড়েছে সামাজিক মাধ্যমে। এর প্রভাব কতটা বিস্তৃত–তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। মফস্বল এলাকার দর্শক অনেক সময় জানেনই না কোন সিনেমা চলছে। ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাগুলোর ক্ষেত্রে কিছুটা প্রচারণা দেখা গেলেও ঈদ ছাড়া সিনেমায় প্রচারণা প্রায় অনুপস্থিত। প্রযোজনা সংস্থা আলফা আইয়ের কর্ণধার শাহরিয়ার শাকিল বলেন, ‘ভালো গল্প আর আধুনিক প্রযুক্তি যত জরুরি, ঠিক ততটাই জরুরি সঠিক মার্কেটিং। প্রচারণা ছাড়া ভালো সিনেমাও দর্শকের কাছে পৌঁছায় না।’ তাঁর কথার সঙ্গে একমত প্রেক্ষাগৃহ মালিকরাও। তাদের মতে, দর্শক প্রেক্ষাগৃহে আসেন সিনেমা দেখতে, কিন্তু নতুন সিনেমা সম্পর্কে জানেন না বলেই আসেন না। ফলে প্রযোজক ও প্রদর্শক–দুই পক্ষই লোকসানে পড়ছেন। চলচ্চিত্র প্রযোজক ও প্রদর্শক মিয়া আলাউদ্দীন বলেন, ‘একসময় একটি সিনেমা সফল করতে অভিনব প্রচারণা আর নানা কৌশল নেওয়া হতো। এখন প্রচারণায় কৃপণতা দেখা যায়, ফলে সিনেমা হল খালি পড়ে থাকে।’ পুরো চিত্রটা স্পষ্ট–ঈদের বাইরের মাসগুলোতে সিনেমা মুক্তি মানেই এখন ঝুঁকির নামান্তর। গল্প, নির্মাণ, প্রেক্ষাগৃহ ও প্রচারণা–এই চার স্তম্ভের মধ্যে যেকোনো একটিতে ঘাটতি দর্শক খরা কাটবে না।

আরও পড়ুন

×