এরশাদ হাসানের অনবদ্য একক অভিনয়
‘ভাসানে উজান’ নাটকের দৃশ্যে এরশাদ হাসান
দেবাশীষ ঘোষ
প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ১০:৩৫
ফিওদর দস্তয়েভস্কির ছোটগল্প ‘দ্য জেন্টাল স্পিরিট’ অবলম্বনে নির্মিত ‘ভাসানে উজান’ বাংলাদেশের সমকালীন থিয়েটারের এক নতুন সংযোজন। একক নাটক বলতে আমরা কেবল জেনেছি, শুধু নারীরাই অভিনয় করবে, কিন্তু সেই গতানুগতিক প্রথা ভেঙে এ সময়ে একক নাটকে পুরুষ অভিনেতার ভূমিকা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় বিবেকানন্দ থিয়েটারের ২৫তম প্রযোজনা হিসেবে নাটকটি মঞ্চে এসেছে এক গভীর মানবিকতা ও মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধানের নাট্যরূপে। অপূর্ব কুমার কুণ্ডুর নাট্যরূপ এবং শুভাশীষ দত্ত তন্ময়ের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম নির্দেশনায় এ নাটকটি মঞ্চে যেন নতুন ভাষা খুঁজে পেয়েছে, আর এ ভাষার প্রাণ হচ্ছে অভিনেতা মো. এরশাদ হাসান। অভিজ্ঞ এই নাট্যশিল্পী একাই যিনি বহন করেছেন চরিত্র, সময়, বেদনা, স্মৃতি, নীরবতা এবং উচ্চারণের সম্পূর্ণ নাট্যবহর।
গত ২১ নভেম্বর উদ্বোধনী প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের একক অভিনয়ের কিংবদন্তি ফেরদৌসী মজুমদারের উপস্থিতি নাটকের গুরুত্বকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। স্টুডিও থিয়েটারের ঘনিষ্ঠ পরিবেশে বিপুল দর্শক, গণমাধ্যম ও থিয়েটারপ্রেমীদের আগ্রহ এ নাটককে আরও আলাদা মর্যাদা দেয়। আসল বিস্ময়টি ছিল মঞ্চে, যেখানে প্রায় ১ ঘণ্টা ১০ মিনিট ধরে একা একজন অভিনেতা দশের অধিক বহুমাত্রিক চরিত্রের জীবন, অনুভূতি, স্মৃতি আর মানবিক দ্বন্দ্ব দর্শকের সামনে উন্মোচন করে যান; যার মাধ্যমে তিনি সবার জন্য যে কথাটা পরিষ্কারভাবে বোঝাতে চেয়েছেন সেটি হলো ‘ভালো হয়ে কি শেষ পর্যন্ত ভালো থাকা যায়!’
কেন্দ্রীয় চরিত্র আশরাফ বোয়ারী, যিনি একসময় নাট্যদল ‘ভাসানে উজান’-এর দলনেতা, বর্তমানে চা বাগানের এক বন্ধক ব্যবসায়ী। ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকা মৃত স্ত্রীর পাশে বসে তাঁর স্মৃতিচারণ, অপরাধবোধের নিঃসঙ্গতা, অভিমান, আত্মগ্লানি ও মানসিক উন্মোচনের প্রবাহতা এরশাদ হাসান এক অভূতপূর্ব লেয়ারে লেয়ারে মঞ্চে নির্মাণ করেছেন। তাঁর কণ্ঠ, শরীরী ভাষা, গতি, থেমে যাওয়া, দীর্ঘ নীরবতা সবকিছু মিলিয়ে নাটকের ভেতরের সময় ও ঘড়ির বাহ্যিক সময়ের এক অনন্য মিথস্ক্রিয়া তৈরি হয়েছে। দর্শক যেন শুধু নাটক দেখেননি; বরং সময়ের চিহ্নকে মঞ্চে পরিবর্তিত হতে দেখেছেন।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো স্বল্প সেটে একাধিক দৃশ্যায়নের জাদু। মাত্র কয়েকটি উপাদান ব্যবহার করেই পলাশ হেনড্রি সেনের হাতের জাদুকরি স্পর্শে লাইট ও সেটের মিশ্রণে অভিনেতা এরশাদ হাসান এমনভাবে দৃশ্যের রূপ পরিবর্তন ঘটিয়েছেন, যে মঞ্চে স্থান-কাল-পরিবেশ বারবার পাল্টে গেছে। কখনও স্মৃতির ঘর, কখনও বাগানের পথ, কখনও মৃত স্ত্রীর নীরবতা। এ রকম দৃশ্যবিন্যাসে আলো, ছায়া ও নান্দনিক গতিশীলতার মিলন নাটকটিকে করে তুলেছে সমকালীন থিয়েটারের এক আকর্ষণীয় উদাহরণ। তবে গল্পের স্থানিক পরিবর্তন মঞ্চে অধিকাংশ সময়ে কেন্দ্রে অভিনীত হয়েছে। নির্দেশক গল্পের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মঞ্চের ব্যবহার নিয়ে ভাবতে পারেন। বিভিন্ন চরিত্র রূপায়ণে অভিনেতার সাবলীল ভ্রমণ দর্শক-মনে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেন এরশাদ হাসান। শুধু তাই নয়, দস্তয়েভস্কির মনস্তাত্ত্বিক নির্মাণ এবং অপূর্ব কুমারের নাট্যরূপে দারুণ এক রসায়ন কাজ করেছে, যার সেতুবন্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছেন অভিনেতা এরশাদ হাসান। এনাম তারা সাকি পোশাকের ভিন্নতায় অভিনেতার চরিত্রকে যিনি নিখুঁতভাবে মঞ্চে ফুটিয়েছেন। দ্রব্যসামগ্রীর জোগান দিয়ে নান্দনিক রূপ দিয়েছেন ফজলে রাব্বি সুকর্ণ। হামিদুর রহমান পাপ্পু সংগীতের মূর্ছনায় দর্শকদের করেছেন বিমোহিত। ‘ভাসানে উজান’ নাটকে শুভাশীষ দত্ত তন্ময় সব নাট্যপরিকল্পককে যেভাবে তাদের অভিজ্ঞতার মূল্যায়নের মাধ্যমে নাটকে যুক্ত করে পূর্ণাঙ্গতা দিয়েছেন, তাতে বলাই যায়, তিনি একজন মেধাবী নাট্যনির্দেশক।
- বিষয় :
- থিয়েটার
