ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অন্ধ দেয়ালের কবি

অন্ধ দেয়ালের কবি
×

‘সোনার বাংলা সার্কাস’ ব্যান্ডের সদস্যরা

রাসেল আজাদ বিদ্যুৎ 

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১২

| প্রিন্ট সংস্করণ

সময়কে নানাভাবে চিহ্নিত করা যায়। তবু ব্যান্ড সোনার বাংলা সার্কাস তাদের কালকে চিহ্নিত করে রাখতে কাব্যকথা আর সুরকেই বেছে নিয়েছে। মননে ছাপ ফেলে যাওয়ার প্রয়াসে রচনা করেছে সুরের ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্যপট; যার শিরোনাম ‘মহাশ্মশান’। লিখেছেন রাসেল আজাদ বিদ্যুৎ 

কাব্যের সঙ্গে সুরের মিশেল–এ এক সংগীতের রসায়ন; যা ধ্বনিত হয় কখনও আর্তচিৎকারে; কখনও আবার তা হয়ে ওঠে সুরমিশ্রিত হাহাকার, প্রতিবাদী স্বর, মধুর সংলাপ, কল্পলোকে ভ্রমণের বয়ান কিংবা আনকোরা কোনো এক গল্প। অনেকের কাছে এ কেবলই গান। তবু সুরে মোড়ানো সেই শব্দগুলোই কিছু মানুষের কাছে হয়ে উঠেছে সোনার বাংলা সার্কাসের স্মারক চিহ্ন। সে কারণে সোনার বাংলা সার্কাস আজ শুধু এক ব্যান্ড নয়, সংগীতের এক গবেষণাগারে রূপ নিতে চলেছে। আজ থেকে ছয় বছর আগে, সেই ২০২০ সালে যখন তাদের প্রথম অ্যালবাম ‘হায়েনা এক্সপ্রেস’ প্রকাশ পায়, তখনই বিস্ময় ঘিরে ধরেছিল কিছু মানুষকে। ‘মৃত্যু উৎপাদন কারখানা’, ‘সূর্যের অন্ধকার’, ‘হায়েনা এক্সপ্রেস’, ‘আমার নাম অসুখ’, ‘অন্ধ দেয়াল’, ‘আত্মহত্যার গান’, ‘ক্রমশ’, ‘এপিটাফ’, ‘পারফিউমের ফেলে দেওয়া বোতল’ এই গানগুলো শুনতে শুনতে হয়তো অস্ফুটভাবেই মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছিল এই বাক্য–‘এমনও গান হয়, হতে পারে!’ এ নিয়ে সোনার বাংলা সার্কাসের প্রথম অ্যালবাম নানা মুখে নানা রকম আলোচনা এবং কিছুটা সমালোচনাও শোনা গেছে। যার রেশ ছিল দীর্ঘ সময়। সে কারণে ছয় বছর পর যখন শোনা গেল, এই ব্যান্ড আরেকটি অ্যালবাম প্রকাশ করছে, তখন তা নিয়ে সংগীতপ্রেমীদের কৌতূহল তৈরি হতে খুব সময় লাগেনি। এরপর যখন সবাইকে চমকে দিয়ে প্রকাশ পেল ‘মহাশ্মশান’ নামে ডাবল অ্যালবাম, তখন তো রীতিমতো হইচই শুরু হয়ে গেল। যারা সোনার বাংলা সার্কাসের গানের সঙ্গে পরিচিত, মনে হয় না তাদের এই অ্যালবামের গানগুলো শোনার জন্য এক মুহূর্ত দেরি করেছেন। করলে হয়তো এত অল্প সময়ে অ্যালবাম নিয়ে এতটা সাড়া পড়ত না। মূলত সেটি দেখেই আমরা জানার চেষ্টা করেছিলাম ‘মহাশ্মশান’ অ্যালবামের গানগুলোয় আদৌ কী তারা চিরচেনা সোনার বাংলা সার্কাসকে খুঁজে পেয়েছেন? এর উত্তরে সিংহ ভাগ শ্রোতা স্বীকার করেছেন, এই ব্যান্ডের সদস্যরা তাদের সৃষ্টিতে নিজস্ব স্বাক্ষর তুলে ধরতে সফল হয়েছেন। একই সঙ্গে বাড়তি পাওয়া হিসেবে ১৭টি গানের এই ডাবল অ্যালবামে আছে আরও কিছু নতুন সংযোজন, যা কেবল কান আর হৃদয় দিয়ে পরখ করা সম্ভব। সংগীত অনুরাগীদের কথার পরিপ্রেক্ষিতে যে প্রশ্ন সবার আগে চলে আসে, তা হলো নিজস্বয়তা গড়ে নেওয়ার বিষয়টি। এ নিয়ে জানতে চাইলে সোনার বাংলা সার্কাসের কণ্ঠশিল্পী ও গিটারিস্ট প্রবর রিপন বলেন, ‘আমরা অন্য সবার চেয়ে আলাদা হব–এই ভাবনা নিয়ে কখনও গান করিনি। চারপাশে কে কী করছে, সেদিকে নজর না দিয়ে নিজেদের মতো গান তৈরি করে গেছি। এখন কারও যদি মনে হয়, আমাদের সৃষ্টি অন্য সবার চেয়ে আলাদা–তাহলে হয়তো তাই। এ নিয়ে কী আর বলার আছে।’ যাকে সোনার বাংলার সার্কাসের ‘সিগনেচার’ বলা হচ্ছে, সেটি নিশ্চয় হঠাৎ করেই তৈরি হয়ে যায়নি? এ জবাবে প্রবর রিপন বলেন, ‘পূর্ব পরিকল্পনা’ শব্দ জোড়া আমাদের কাজের বেলায় ব্যবহার করা যাবে না। কারণ, আমরা যখন একসঙ্গে বাজাই, তখন কিছু না কিছু উঠে আসে, যেটা প্রায় সময় আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। ‘মহাশ্মশান’ অ্যালবামের কথাই বলি, এর কাজ যখন শুরু হয়, তখন পুরোপুরি সংগীতের নেশায় বুঁদ হয়ে ছিলাম। এতে দেখা গেল, মাত্র ২২ দিনে ৩০টি গানের ডেমো তৈরি হয়ে গেছে। এত গান নিয়ে কী করা যায়? এই প্রশ্ন নিয়ে আমরা যখন আলোচনা শুরু করলাম, তখনও ব্যান্ডের সবার মতের পরিপ্রেক্ষিতে শুরু হলো ডাবল অ্যালবামের পরিকল্পনা। অনেক বাছ-বিচারের পর ১৭টি গান নিয়ে সাজানো হলো ‘মহাশ্মশান’ অ্যালবামটি। যদিও কয়েক লাইনে একটা অ্যালবাম বানানোর পুরো গল্প বলা যায় না, তবু সারসংক্ষেপ বলতে গেলে এটাই। অনেক শ্রোতা বলেন, সোনার বাংলা সার্কাসের গানে বিষয় বৈচিত্র্য আর বিমূর্ত শব্দের মধ্য দিয়ে কাব্য বুনে চলার প্রভাব চোখে পড়ে। আসলেই কী তাই? কথা একেবারে অমূলক নয়, স্বীকার করে প্রবর রিপন বলেন, ‘কবিতা লেখা থেকে গানে আসা। এই দুটি বিষয়কে কখনও আলাদাভাবে দেখিও না। হয়তো এ কারণে শ্রোতারা আমাদের গানগুলোর বিষয় বৈচিত্র্যের আর কাব্যের মিশেল খুঁজে পান এবং সেটি যে নেই, এই কথাও আমরা জোর দিয়ে বলছি না। এই ‘মহাশ্মশান’ অ্যালবাম নিয়ে আলোচনা, তা নিয়ে আমরা আগেই বলেছি, প্রথম অ্যালবাম ‘হায়েনা এক্সপ্রেস’-এ যে চরিত্রটি মারা গিয়েছিল ‘এপিটাফ’ গানের ভেতর দিয়ে, ‘মহাশ্মশান’ হলো তার পুনরুত্থান। এবার আমাদের চরিত্রের নাম দ্রোহ। এই অ্যালবামেও সে মারা যায়, কিন্তু সে আবার হয়তো পুনর্জন্ম নেবে এরপরের অ্যালবামে। দ্রোহ এবার বিদ্রোহ ঘোষণা করে মানুষের বিরুদ্ধে। মানুষের প্রতি এই প্রতিশোধেরই গল্প এটা। পুরো গল্পটা বুঝতে হলে ১ ঘণ্টা ৫২ মিনিটের অ্যালবামটি এক টানা শুনতে হবে। এই বিষয়গুলো মাথায় নিয়ে যখন অ্যালবাম শোনা শুরু হবে, তখন এটি একটি আখ্যান বলেই মনে হবে। প্রবর রিপনের এই কথার সঙ্গে একমত পোষণ করেন ব্যান্ডের বাকি তিন সদস্য সেত পানডুরঙ্গা ব্লুমবার্গ, শাকিল হক ও সাদ চৌধুরী। গান ও অ্যালবামের পাশাপাশি তারা আরেকটি সুখবর জানান, তা হলো আগামী এপ্রিল মাসে তাদের ‘মহাশ্মশান যাত্রা’ শিরোনামে সিরিজ কনসার্টের পরিকল্পনা করছেন। এ ছাড়াও সিডি ও ভাইনাল রেকর্ড আকারে প্রকাশ করতে যাচ্ছেন ‘মহাশ্মশান’ জোড়া অ্যালবামটি; যাতে করে অ্যালবাম সংগ্রাহকদের প্রত্যাশা পূরণ হয়। 

আরও পড়ুন

×