শ্রাবণসন্ধ্যায় ‘সুরের দয়াল রায়’
ভৈরবী গীতরঙ্গ দলের সাকিব সালেহীনের পরিবেশনা ছবি :: শাদাব শাহরোখ হাই
তরু শাহরিয়ার স্বর্গ
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৫০
| প্রিন্ট সংস্করণ
শ্রাবণের বৃষ্টিস্নাত এক সন্ধ্যায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার যেন রূপ নিয়েছিল এক আন্তরিক বৈঠকি সাংস্কৃতিক আসরে। ভৈরবী গীতরঙ্গ দলের পরিবেশনায় গীতিনকশা ‘সুরের দয়াল রায়’ শুধু একটি সংগীতানুষ্ঠান ছিল না–এটি ছিল বাংলা গানের অন্যতম পথিকৃৎ, কবি, নাট্যকার ও সুরকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের জীবন, দর্শন ও শিল্পভাবনাকে সমন্বিত শিল্পভাষায় নতুন প্রজন্মের সামনে উপস্থাপনের একটি আন্তরিক ও নান্দনিক প্রয়াস। ইলিয়াস নবী ফয়সালের রচনা, সম্পাদনা ও নির্দেশনায় নির্মিত প্রায় ঘণ্টাব্যাপী এ প্রযোজনায় সংগীত, কবিতা, নৃত্য, আবৃত্তি ও নাট্যভঙ্গিমার সৃজনশীল সমন্বয়ে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের জীবন ও কর্মকে একসূত্রে গাঁথা হয়েছে।
পঞ্চাশেরও বেশি শিল্পীর সম্মিলিত অংশগ্রহণে মঞ্চে সৃষ্টি হয় এক প্রাণময় সুরলোক, যা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দর্শককে নিবিষ্ট ও আবেগাপ্লুত করে রাখে। সমষ্টিগত পরিবেশনার শৃঙ্খলা, শিল্পীদের আন্তরিকতা এবং মঞ্চে পারস্পরিক বোঝাপড়া প্রযোজনাটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। প্রযোজনার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর সংগীত-বিন্যাস। বহুল পরিচিত দ্বিজেন্দ্রগীতিকে নতুন সংগীতায়োজনে উপস্থাপন করা হলেও মূল সুরের আবেগ, আবেদন ও ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে। কণ্ঠশিল্পীদের আন্তরিক পরিবেশনার পাশাপাশি বাদ্যযন্ত্রের সংযত অথচ নিরীক্ষাধর্মী ব্যবহার পরিবেশনাকে দিয়েছে স্বাতন্ত্র্য। ‘ধনধান্য পুষ্পভরা’, ‘বঙ্গ আমার’, ‘ঘন-তমসাবৃত অম্বর-ধরণী’ এবং ‘আমরা মলয় বাতাসে’–প্রতিটি গান নাট্য-আবহের সঙ্গে মিশে দ্বিজেন্দ্রলালের দেশপ্রেম, মানবিকতা, প্রকৃতিপ্রেম ও জীবনদর্শনকে নতুন ব্যাখ্যায় দর্শকের সামনে তুলে ধরেছে। গানের মধ্য দিয়ে সময়, ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক আবেগঘন সেতুবন্ধও নির্মিত হয়েছে। নির্দেশকের অন্যতম সাফল্য মঞ্চের বৈঠকি বিন্যাস। দর্শক ও শিল্পীর দূরত্ব কমিয়ে এনে তিনি পরিবেশনার সঙ্গে এক অন্তরঙ্গ সম্পর্ক তৈরি করেছেন। আলো, পোশাক ও মঞ্চসজ্জার সংযত এবং রুচিশীল ব্যবহার প্রযোজনার নান্দনিকতাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে ছোট ছোট নাট্যাংশ, আবৃত্তি ও নৃত্যের সংযোজনে জীবনীভিত্তিক উপস্থাপনা নিছক তথ্যবয়ানে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ মঞ্চ-অভিজ্ঞতায় রূপ নিয়েছে। দৃশ্যান্তরের স্বাভাবিক গতি এবং উপস্থাপনার ছন্দ দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে কিছু সীমাবদ্ধতাও চোখে পড়ে। বাংলা নাট্যসাহিত্যে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের নাট্যকার পরিচয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ঐতিহাসিক নাটক, নাট্যদর্শন, ভাষাশৈলী ও নাট্যচিন্তার অনুষঙ্গ যদি আরও বিস্তৃতভাবে উপস্থাপিত হতো, তাহলে প্রযোজনাটি আরও পরিপূর্ণ হয়ে উঠত। বিশেষ করে তাঁর নাট্যসৃষ্টির সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোকপাত থাকলে দর্শকের উপলব্ধি আরও সমৃদ্ধ হতে পারত। যদিও সংগীতের আবেগময় প্রবাহ সেই অপূর্ণতাকে অনেকাংশে আড়াল করেছে।
সব মিলিয়ে ‘সুরের দয়াল রায়’ প্রমাণ করেছে, জীবনীভিত্তিক সাংস্কৃতিক প্রযোজনাও শিল্পসম্মত পরিকল্পনা, সৃজনশীল নির্দেশনা এবং নিবেদিত পরিবেশনার মাধ্যমে সমকালীন দর্শকের কাছে গভীর আবেদন সৃষ্টি করতে পারে।
শ্রাবণের স্নিগ্ধ সন্ধ্যায় ভৈরবী গীতরঙ্গ দলের এই আয়োজন শুধু দ্বিজেন্দ্রলাল রায়কে স্মরণ করেনি; বরং তাঁর শিল্পভাবনা, সংগীতঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে নতুন প্রজন্মের কাছে পুনরায় প্রতিষ্ঠার এক সফল, মননশীল ও স্মরণীয় প্রয়াস।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক,
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
- বিষয় :
- বিনোদন