গল্পের সেই মেয়েটি
কেয়া পায়েল ছবি :: রফিকুল ইসলাম রাফ
অনিন্দ্য মামুন
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৫৫
আষাঢ় শেষ, বাংলার প্রকৃতিতে এখন শ্রাবণ মাস। বলা হয় বর্ষারই সহোদর শ্রাবণ। রোদের দেখা কম, শহরে হুট করেই নেমে আসছে মুষলধারে বৃষ্টি। এমন বৃষ্টির দিনে শুটিংয়ে ব্যস্ত কেয়া পায়েল। সদ্য মালদ্বীপ ভ্রমণ শেষে যুক্ত হয়েছেন আরিফিন শুভর সঙ্গে হ্যাপিলি ম্যারিডে। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন– অনিন্দ্য মামুন
বাংলা বারো মাসের মধ্যে শ্রাবণের আবেদন যেন একটু আলাদা। প্রকৃতির রং বদলে যায়, গাছপালা ধুয়ে-মুছে চকচকে হয়ে ওঠে। লতাপাতায় জমে ওঠে নতুন প্রাণ। বৃষ্টিপ্রেমীদের হৃদয়ে ফিরে আসে অন্যরকম এক অনুভূতি। এমনকি যারা বৃষ্টি খুব একটা ভালোবাসেন না, তারাও এই সময়ে কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন। কোথাও না কোথাও প্রেমিকের মন গেয়ে ওঠে রবীন্দ্রনাথের সেই অমর সৃষ্টি–‘আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে, জানি নে, জানি নে কিছুতে কেন যে মন লাগে না...।’
এমনই এক শ্রাবণের দিনে সামাজিক মাধ্যমে কেয়া পায়েলের পোস্টগুলোও যেন অন্যরকম আবহ তৈরি করছে। কখনও মালদ্বীপের নীল জলরাশির সামনে তোলা ছবি, কখনও ছোট ছোট ভিডিও, কখনও আবার জীবনকে উপভোগ করার আহ্বান। একটি পোস্টে তিনি লিখেছেন–‘মন যেটা চায়, সেটাই করো। জীবন তো একটাই।’
এসব পোস্ট দেখে অনেকেরই ধারণা হয়েছিল, হয়তো এখনও মালদ্বীপেই রয়েছেন অভিনেত্রী। বাস্তবতা ভিন্ন। কেয়া এখন দেশেই আছেন। ব্যস্ত সময় কাটছে ‘হ্যাপিলি ম্যারিড’-এর শুটিংয়ে। শুটিংয়ের ফাঁকেই ধীরে ধীরে ভাগ করে নিচ্ছেন মালদ্বীপ সফরের স্মৃতিগুলো। পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করছেন বধূ সাজের ছবি, নতুন নাটকের প্রচারণা এবং ভক্তদের সঙ্গে নানা মুহূর্ত। সম্প্রতি প্রকাশ পেয়েছে তাঁর অভিনীত নাটক ‘যত্নে থেকো’। সম্পর্কের গল্প নিয়ে নির্মিত নাটকটি প্রকাশের মাত্র এক দিনের মধ্যেই মিলিয়ন ভিউয়ের ঘরে পৌঁছে যায়। দর্শকের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাচ্ছেন পায়েল। নাটকটির প্রচারণাও করছেন নিয়মিত।
হ্যাপিলি ম্যারিডের রহস্য
কয়েকদিন আগে চিত্রনায়ক আরিফিন শুভ ও কেয়া পায়েল নিজেদের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একই ধরনের একটি ঘনিষ্ঠ ছবি প্রকাশ করেন। ছবিতে দেখা যায়, শুভ কেয়াকে আলিঙ্গন করে আছেন। শুভর পোস্টের ক্যাপশন ছিল–‘হ্যাপিলি ম্যারিড উইথ কেয়া পায়েল’। অন্যদিকে কেয়ার পোস্টে লেখা–‘হ্যাপিলি ম্যারিড উইথ আরিফিন শুভ’।
পোস্ট দুটি প্রকাশের পরপরই সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয় তুমুল জল্পনা। ব্যক্তিগত জীবনের নানা পরিবর্তনের পর অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, হয়তো সত্যিই নতুন করে সংসার শুরু করেছেন আরিফিন শুভ। কেউ কেউ আবার দুজনকে অভিনন্দন জানাতেও শুরু করেন। পরে জানা যায়, পুরো বিষয়টি ছিল তাদের নতুন চরকি অরিজিনাল ফিল্ম ‘হ্যাপিলি ম্যারিড’-এর প্রচারণার কৌশল! সমকালীন জীবনের জটিলতা, পারিবারিক সম্পর্কের চিরন্তন টানাপোড়েন এবং সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে চলচ্চিত্রটির গল্প। এতে উচ্চবিত্ত, আধুনিক শহুরে সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা তরুণী অনামিকা চরিত্রে অভিনয় করেছেন কেয়া পায়েল। সামাজিক মাধ্যমের মোহ, সেলিব্রিটি ফ্যান্টাসি এবং ভার্চুয়াল জগতের আকর্ষণকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে তাঁর চরিত্র। অন্যদিকে আরিফিন শুভ অভিনয় করেছেন আনিস চরিত্রে। এই কাজটি নিয়ে কেয়ার উচ্ছ্বাসেরও শেষ নেই। তিনি বলেন, ‘বেশ কিছু কারণে কাজটি আমার কাছে বিশেষ। প্রথমত, আমার সহশিল্পী আরিফিন শুভ ভাই। দ্বিতীয়ত, চরকির সঙ্গে এটি আমার প্রথম কাজ। তৃতীয়ত, পরিচালক জাহিদ প্রীতম। সবচেয়ে বড় কথা, আমার চরিত্রটিতে অভিনয়ের অনেকগুলো স্তর আছে। দর্শক আমাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করবেন বলেই বিশ্বাস করি।’
এবার ওটিটিতে
অনেকেই জানেন না কেয়া পায়েলের অভিনয়জীবনের শুরুটা হয়েছিল সিনেমা দিয়ে। ২০১৮ সালের শেষ দিকে আনিসুর রহমান মিলনের বিপরীতে ‘ইন্দুবালা’ সিনেমায় নামভূমিকায় অভিনয়ের মধ্য দিয়েই শোবিজে তাঁর যাত্রা শুরু। সেই সময় মিডিয়ার নানা দিক সম্পর্কে খুব বেশি ধারণা ছিল না তাঁর। সিনেমাটির পর আর বড়পর্দায় দেখা না গেলেও ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে নেন তিনি। ২০২০ সাল থেকে নিয়মিত নাটকে অভিনয় শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই হয়ে ওঠেন ছোটপর্দার অন্যতম ব্যস্ত ও জনপ্রিয় অভিনেত্রী। ইতোমধ্যে পাঁচ শতাধিক নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি। গত বছর কেয়া ঘোষণা দিয়েছিলেন, নাটকে অভিনয়ের সংখ্যা কমিয়ে আনবেন। তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো অভিনয় থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। বছর ঘুরতেই জানা গেল সেই সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ। তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ওটিটির জন্য। নাটকে সফল যাত্রার পর এবার ‘হ্যাপিলি ম্যারিড’ দিয়ে ওটিটিতে অভিষেক হচ্ছে তাঁর। কেয়া বলেন, ‘ওটিটিতে এটি আমার প্রথম কাজ, তবে শেষ নয়। নাটকে দর্শকদের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছি, ওটিটিতেও পাব বলে আমার বিশ্বাস।’
নতুন উদ্যোক্তা
শুধু অভিনয়েই নয়, উদ্যোক্তা হিসেবেও নিজের পরিচয় তৈরি করেছেন কেয়া পায়েল। কয়েক বছর আগে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘পার্ল বাই পায়েল মেকওভার অ্যান্ড স্যালন’। অভিনেত্রীর ভাষ্য, নতুন কিছু করার আগ্রহ থেকেই এই উদ্যোগ। অভিনয়ের পাশাপাশি এটি তাঁর ভালোবাসার আরেকটি জায়গা। সময় পেলেই ছুটে যান সেখানে। তিনি বলেন, ‘খুব পরিকল্পনা করে ব্যবসায় আসিনি। অভিনয় করতে করতেই একসময় মনে হলো, নিজের একটি উদ্যোগ থাকা দরকার। আলহামদুলিল্লাহ, সবকিছু ভালোভাবেই চলছে।’ তবে উদ্যোক্তা হওয়ার কারণে অভিনয়ে সময় কম দিচ্ছেন কিনা–এমন প্রশ্নের উত্তরে তাঁর উত্তর ছিল সহজ। ‘অভিনয় কমিয়ে দিইনি। তবে আগের তুলনায় কাজের সংখ্যা কমিয়েছি। ভালো গল্প, ভালো চরিত্র আর নিজের সন্তুষ্টি–এই তিনটি বিষয় এখন আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
সিনেমা নিয়ে ভাবনা
যার অভিনয়জীবনের শুরু সিনেমা দিয়ে, তিনি কি আর বড়পর্দায় ফিরবেন না–হেসেই উত্তর দেন কেয়া পায়েল। ‘সিনেমার প্রস্তাব আসে। কিন্তু সব কাজ করা হয় না। আপাতত নাটক করছি, ওটিটি শুরু করলাম। সিনেমা নিয়ে এখনই তাড়াহুড়া করছি না। তবে যদি ভালো গল্প পাই, চরিত্র ভালো লাগে, সবকিছু মিলে যায়–অবশ্যই সিনেমা করব। বলতে পারেন, ভালো গল্পের অপেক্ষায় আছি।’
ব্যক্তিগত জীবন
ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও বেশ সচেতন এই অভিনেত্রী। তাঁর বিশ্বাস, একজন শিল্পীর কাজই হওয়া উচিত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, ব্যক্তিগত জীবন নয়। কেয়া বলেন, ‘সম্পর্ক কিংবা আমার পরিবার–এগুলো একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়। এগুলোর সঙ্গে আমার কাজের কোনো সম্পর্ক নেই। মিডিয়া আমার কাজের জায়গা। তাই ব্যক্তিগত বিষয় কখনও কাজের সঙ্গে মিশিয়ে দেখতে চাই না।’ তিনি আরও বলেন, ‘যারা আমার কাজ দেখেন, তারা কাজ নিয়েই কথা বলেন। কেউ যদি আমাকে ভালোবাসেন, সেটি আমার অভিনয়ের জন্যই। আমি সেভাবেই চলতে চাই। যারা কাজ করেন, তাদের কাজ নিয়েই মূল্যায়ন হওয়া উচিত।’ অভিনেত্রীর ভাষায়, ‘শুধু মিডিয়া নয়, জীবনের যে কোনো জায়গাতেই যদি কেউ কাজের বাইরে অন্য কিছু দিয়ে আলোচনায় আসতে চান, মানুষ সেটিই বেশি বলবে। তাই আমি সবসময় বিশ্বাস করি, ভালো কাজই একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় পরিচয়।’
- বিষয় :
- বিনোদন